দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করেছে দাবি করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সংস্থাটির দাবি, চলমান জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ক্রমশ কমে আসছে আক্রান্ত, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, কিছু ক্ষেত্রে কিছুটা কমলেও হামের সংক্রমণ ও হামের ভয় এখনো সারা দেশে রয়ে গেছে। হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০ উপজেলা ও পৌরসভায় হামের টিকা দেওয়া শুরু করে ৫ এপ্রিল। দ্বিতীয় ধাপে ৮ এপ্রিল চারটি সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং তৃতীয় ধাপে ২০ এপ্রিল সারা দেশে টিকা দেওয়া শুরু হয়।
অনেকেরই আশা ছিল, প্রায় দুই মাস আগে শুরু এ কর্মসূচির প্রভাবে হাম কমবে, নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে, সিটি করপোরেশন এলাকা ছাড়াও জেলা-উপজেলাগুলোতে এখনো হামে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। ১৫ মার্চ থেকে গত ৮০ দিনে মৃত্যু ছুঁইছুঁই ৬০০ জনে আর হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজারেরও বেশি।
হচ্ছে না টিকার সফলতা পরীক্ষাও: জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, হামের টিকা নেওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে টিকা গ্রহণকারীর শরীরে হামের প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে। ৩০টি উপজেলার শিশুরা টিকা পেতে শুরু করেছে আট সপ্তাহ আগে থেকে। এসব শিশুর শরীরে হামের প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠছে কি না, তা কেউ পরীক্ষা করে দেখছেন না। দেখা বা জানার কোনো সরকারি উদ্যোগ নেই।
জনস্বাস্থ্যবিদ এবং সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ বলেন, হামের সমস্যা আরো দীর্ঘায়িত হয়েছে। যে উদ্দেশ্যে জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইন করা হলো, তার সফলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সবখানে ৯৫ শতাংশ কাভারেজ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। টিকার কাভারেজ ৯৫ শতাংশ না হলে হার্ড ইমিউনিটি (গণ–রোগ প্রতিরোধশক্তি) হবে না। তাতে সমস্যা আরো দীর্ঘায়িত হবে। বরগুনার সিভিল সার্জন মো. আবুল ফাত্তাহের মতে, ‘হার্ড ইমিউনিটি’ হতে আরো সময় লাগবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশীদ বলেন, টিকা গ্রহণকারীদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হচ্ছে কি না, তা দেখা হচ্ছে না। ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, হামের সংক্রমণ কমে এসেছে। আগামী ২০–২৫ দিনে আরো কমে আসবে। হাম একেবারে নিয়ন্ত্রণে কবে আসবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা কেউ বলতে পারবেন না।
থামছে না মৃত্যুর মিছিল: সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে মারা যাওয়া ছয়জনসহ রোগটিতে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত ৫৯৪ জন শিশুর মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পরিসংখ্যান বলছে, মৃত শিশুদের মধ্যে হামের উপসর্গ ছিল ৫০৪ জন শিশুর শরীরে আর নিশ্চিত হামে মারা গেছে বাকি ৯০ জন।
অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত সোমবার সকাল আটটা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত আর নতুন করে নিশ্চিত হামরোগে আক্রান্ত হয়েছে ৪২ জন শিশু। আর ভাইরাসজনিত রোগটির উপসর্গ দেখা দিয়েছে এক হাজার ২৯২ জন শিশুর শরীরে, যাদের মধ্যে এক হাজার ২০৪ জনই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
ওই একদিনে হামের উপসর্গে মারা যাওয়া ছয়জন শিশুর মধ্যে ঢাকা বিভাগের চারজন এবং রাজশাহী ও সিলেট বিভাগে একজন করে রয়েছে। জেলা হিসেবে ঢাকা ও ফরিদপুরে সবচেয়ে বেশি দুজন করে শিশু মারা গেছে। অন্যদিকে, বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুসারে, ওই একদিনে সবচেয়ে বেশি ৫২৭ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে।
এরপর চট্টগ্রামে ২৬৮ জন, বরিশালে ১৪৪ জন, রাজশাহীতে ৯৭ জন, খুলনায় ৮৩ জন, ময়মনসিংহে ৭১ জন, সিলেটে ৬৭ জন এবং রংপুরে ৩৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া এক হাজার ৯০ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে।
এ নিয়ে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৩৬২ জনে, যাদের মধ্যে নয় হাজার ১৩৬ জন শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগের হাম ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৫৮ জন ও আক্রান্ত ৪০ হাজার ৮৭৮ জন। সারাদেশে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক ও হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৫৯ হাজার ৯০২ জন, যাদের ৫৪ হাজার ৮১২ জন শিশু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।
টিকায়ও কমছে না সংক্রমণ: ৫ এপ্রিল টিকা দেওয়া শুরু হয় বরগুনা সদর, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ, চাঁদপুর সদর ও হাইমচর, কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামু, ঢাকার নবাবগঞ্জ, গাজীপুর সদর, যশোর সদর, ঝালকাঠির নলছিটি, মাদারীপুর সদর, মুন্সীগঞ্জ সদর, লৌহজং ও শ্রীনগর, ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল ও ফুলপুর, নাটোর সদর, নেত্রকোনার আটপাড়া, নওগাঁর পোরশা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট, পাবনা সদর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও বেড়া, রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায়। ওই ৩০টির মধ্যে পাঁচটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামের সংক্রমণ থামেনি। এর মধ্যে বরগুনা সদর, মাদারীপুর সদর, নওগাঁর পোরশা, যশোর সদর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় নিয়মিতভাবে রোগী ভর্তি হচ্ছে।
পাবনার পাঁচটি উপজেলা-পৌরসভার পর এই জেলার বাকি জনপদে টিকা দেওয়া শুরু হয় ২০ এপ্রিল। কিন্তু এখনো হামে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। তারপরও পাবনার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত হামের ৬২ জন রোগী ভর্তি ছিল। ফলে, শিশুদের টিকা দেওয়ার পরও এই জেলায় হাম থামেনি। ৩০টি উপজেলার একটি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে অবশ্য গত ১০–১২ দিনে কোনো রোগী ভর্তি হয়নি। দ্বিতীয় ধাপে ৮ এপ্রিল টিকা দেওয়া শুরু হয় ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ এবং বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায়। ২০ এপ্রিল সারা দেশে টিকা দেওয়া শুরু হয়। সরকারের লক্ষ্য ছিল, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার। তবে টিকা দেওয়া হয়েছে ১০০ শতাংশের বেশি। পাঁচ বছরের বেশি বয়সী কিছু শিশুও টিকা পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তারা।
বরগুনা সদর হাসপাতালে সর্বশেষ আট দিনেই ৪০ জন শিশু হাম নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এই জেলায় ৬২ জন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে ৬৫৯ জনের। মারা গেছে দুজন। সিভিল সার্জন মো. আবুল ফাত্তাহ বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী আসছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় পাঁচজন এসেছে। দুজন ছুটি পেয়েছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মাদারীপুর জেনারেল হাসপাতালেও ৪২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে। ২৮ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত ৬৩ জন এসেছে। এই জেলায় হামে একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
নওগাঁর পোরশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালেও এখনো ১০ জন হামের রোগী ভর্তি রয়েছে। এই উপজেলায় এ পর্যন্ত ৮০ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে তিনজন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় জেলা সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে তিনজন রোগী ভর্তি হয়েছে। এখনো রোগী ভর্তি আছে ২২ জন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন এ কে এম শাহাব উদ্দিন বলেন, জেলায় হামের সংক্রমণ কমলেও থামেনি। গত ১০ দিনে ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল ২৭৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। জেনারেল হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মাহফুজ রায়হান বলেন, এখন দুই মাস থেকে এক বছর বয়সী শিশুরাই বেশি ভর্তি হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









