## ২৫ কোটির মাইলফলকের সামনে দেশের ওষুধ রপ্তানি
তৈরি পোশাকের পর বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার চূড়ান্ত আভাস দিচ্ছে দেশের ওষুধ শিল্প। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল মাসে একক মাস হিসেবে এই খাতে রেকর্ড ১০০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মে ও জুনের বাকি দিনগুলোতে এই ধারা বজায় থাকলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২৫ কোটি (২৫০ মিলিয়ন) ডলারের ওষুধ রপ্তানির নতুন মাইলফলক স্পর্শ করবে বাংলাদেশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেড় দশকের ব্যবধানে দেশের ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। এক অর্থবছর ছাড়া প্রতিবারই এই খাতের গ্রাফ ছিল ঊর্ধ্বমুখী।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে (প্রথম ১০ মাসে) ওষুধ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই সময়ে আয় ছিল ১৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। সবচেয়ে বড় চমক দেখা গেছে গত এপ্রিল মাসে। একক মাসের হিসেবে এপ্রিলে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ১০০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এই এক মাসেই ২ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের এপ্রিলে ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। খাত সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, অর্থবছরের বাকি দুই মাসে (মে ও জুন) এপ্রিলের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে মোট রপ্তানি আয় ২৫ কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকবে।
দেড় দশকে ৫ গুণ বৃদ্ধি: বাংলাদেশ থেকে ওষুধ রপ্তানি শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। তবে গত ১৫ বছরে এই খাত এক অভূতপূর্ব রূপান্তর প্রত্যক্ষ করেছে।
২০১০-১১ অর্থবছর: ওষুধ রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার।
২০২৪-২৫ অর্থবছর: ১৫ বছরের ব্যবধানে তা ৫ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ২১ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজার ডলারে। এই দীর্ঘ সময়ে কেবল ২০২২-২৩ অর্থবছর ছাড়া (৭% হ্রাস) প্রতিবারই ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো এই খাত ২০ কোটি ডলারের গণ্ডি পেরিয়েছিল।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ওষুধের রাজত্ব: স্বল্পোন্নত ৪৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যা ওষুধ উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। বর্তমানে দেশের তৈরি ১ হাজার ২০০টি ওষুধপণ্য বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
বাংলাদেশের ১০টি শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর মানদণ্ডের অনুমোদন পেয়েছে। বর্তমানে রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসছে বেক্সিমকো, ইনসেপ্টা ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে। শীর্ষ দশে আরও রয়েছে রেনাটা, একমি, অ্যারিস্টোফার্মা, এসকেএফ, জেনারেল, বিকন ও ওরিয়ন ফার্মা।
বড় বাধা ৯৫ শতাংশ কাঁচামালই আমদানিনির্ভর: ওষুধ রপ্তানিতে এমন চোখধাঁধানো সাফল্য থাকলেও এর ভেতরে রয়ে গেছে একটি বড় দুর্বলতা। দেশের ভেতরের চাহিদার ৯৫ শতাংশ ওষুধ স্থানীয়ভাবে তৈরি হলেও, এর মূল উপাদান বা কাঁচামাল এপিআই এর প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয় চীন ও ভারত থেকে। ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, প্রতিবছর অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের এপিআই আমদানি করতে হয়, যা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ঝুঁকির মুখে ২০২৬ সালের নভেম্বর: ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করবে। এরপরই আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এপিআই আমদানি এবং স্থানীয়ভাবে পেটেন্ট ওষুধের উৎপাদন ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৭ বছরেও পূর্ণতা পায়নি এপিআই পার্ক: মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ওষুধের কাঁচামাল দেশেই উৎপাদনের উদ্দেশ্যে ১৭ বছর আগে ‘এপিআই শিল্প নগরী’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতির কারণে ৪১টি প্লটের মধ্যে মাত্র ২টি প্রতিষ্ঠান সেখানে উৎপাদন শুরু করতে পেরেছে। বাকি ২৩টি প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ করা জমি এখনো ফাঁকা পড়ে আছে।
‘৫ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার সম্ভব’: বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদির অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ দ্রুত ভালোমানের ও কম দামের জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। দেশে ওষুধের কাঁচামাল (অচও) তৈরির ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ করা গেলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।’
তিনি আরো যোগ করেন, তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশকে ৩০-৩৫টি দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, কিন্তু ওষুধের কাঁচামালের ক্ষেত্রে প্রতিযোগী শুধু চীন ও ভারতের মতো ২-৩টি দেশ। ফলে এখানে সম্ভাবনা ব্যাপক।
সরকারের কাছে ব্যবসায়ীদের দাবি: বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএআইএমএ) সভাপতি এস এম সাইফুর রহমান বলেন, গত আট বছরে স্থানীয়ভাবে ৪০টির বেশি এপিআই তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। তবে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ভারত বা চীনের মতো সরকারি প্রণোদনা ও আর্থিক নিরাপত্তা প্রয়োজন।
তিনি আসন্ন বাজেটে ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে বিশেষ কর রেয়াত ও প্রণোদনা ঘোষণার পাশাপাশি দেশের এপিআই শিল্পের তদারকির জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স বা কমিশন গঠনের দাবি জানান। ওষুধ শিল্পের রপ্তানি গ্রাফ প্রমাণ করে যে, সঠিক নীতি সহায়তা, গজারিয়ার এপিআই পার্কের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সরকারি প্রণোদনা পেলে তৈরি পোশাক খাতের পর ওষুধ শিল্পই হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান স্তম্ভ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









