‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শিরোনামে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থাপিত এ বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ এবং নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম। বিগত সরকারের আমলের অর্থনৈতিক বিপর্যয়, দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের ধ্বংসস্তূপ থেকে সামষ্টিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের বাজারব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
নতুন অর্থবছরে আয়-ব্যয়ের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণ, বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতই ভরসা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর। উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া চেনা সংকটের সঙ্গে অস্থির বিশ্ব বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির ঝুঁকি মাথায় রেখে অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে চান। এ ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন ডলার করতে তুলে ধরেছেন সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ।
সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে নতুন অর্থনৈতিক নীতির সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাজেট পেশের পর এটিকে সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বাজেট ঘোষণা নিয়ে রাজনৈতিক মহল, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, অর্থনীতিবিদ এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ, কর্মসংস্থান এবং উন্নয়ন ব্যয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে বাজেটের সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিশ্লেষণ ও প্রত্যাশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের দেওয়া বাজেটের আকার ছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সংশোধিত বাজেটের ৬.১৮ শতাংশ বেশি এবং জিডিপির ১২.৬৫ শতাংশের সমান। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার বিকালে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তার আগে মন্ত্রিসভা ওই প্রস্তাব অনুমোদন করে। অন্তর্বর্তী সরকার উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে এনে রুটিন দায়িত্ব সারতে যে বাজেট গত অর্থবছরে দিয়েছিল, তাতে ইতিহাসে প্রথমবারের মত প্রস্তাবিত ব্যয়ের অংক ছিল আগের অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের চেয়ে কম। সেই সরকারের সময় মূল্যস্ফীতির যে চাপ জনগণের মাথার ওপর ছিল, নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চার মাসে তা খুব একটা লাঘব হয়নি। রাজস্ব আদায়ে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটেনি, গতি ফেরেনি ব্যবসা বাণিজ্যেও। অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক ভালো চেহারায় না থাকলেও সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা পূরণে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুরনো ছকেই জনতুষ্টির বিশাল বাজেট দিলেন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেট দিতে গিয়ে ‘টেকসই উন্নয়নের পরিক্রমায় স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তবে সেই বাজেট বাস্তবায়নের সুযোগ তার সরকার পায়নি। বাজেট কার্যকরের এক মাসের মাথায় ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। সরকার পতনের সেই আন্দোলনে সহিংসতা, কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে পুলিশ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খায়। থমকে যায় ব্যবসা-বাণিজ্যের চাকা। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এক দিকে দুই অংকের ঘরে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে হয়েছে, অন্যদিকে অর্থনীতির ক্ষত সারাতে নানামুখী পদক্ষেপ নিতে হয়েছে, যদিও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানো যায়নি। ব্যবসায়ী আর বিনিয়োগকারীরা তাই নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিলেন। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে দেশে স্থিতিশলীতা ফেরার পাশাপাশি আস্থার সংকট মিটবে বলে তারা আশায় ছিলেন।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠন করার পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলেও ইরান যুদ্ধের জেরে পশ্চিম এশিয়ার নতুন সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও নতুন অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরেনি, বিনিয়োগে স্থবিরতাও কাটেনি। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও সাহসী হতে চাইছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ আর অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর চেষ্টায় উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর পথেই তিনি হাঁটছেন।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেওয়া হয়েছে ১০টি বিশেষ উদ্যোগ। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার বাজেট বক্তৃতায় জানান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে সহায়তায় স্টার্টআপ মূলধন, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য রাখা হয়েছে বরাদ্দ। তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে বাজেটে ‘স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স’তৈরি করা হয়েছে, যেখানে নতুন উদ্যোক্তারা ৯ বছরের কর অবকাশ এবং শূন্য শতাংশ টার্নওভার কর সুবিধা পাবেন। ব্লু ইকোনমি সম্পদ আহরণে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে গবেষণা তহবিল।
উৎসগুলোয় ব্লু ইকোনমির বিস্তারিত বর্ণনা না থাকলেও সরকারের মূল লক্ষ্য সমুদ্র সম্পদের বিজ্ঞানসম্মত ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন। এই গবেষণা তহবিল মূলত ব্যবহৃত হবে সামুদ্রিক মৎস্য, খনিজ সম্পদ এবং পর্যটন খাতের সম্ভাব্যতা যাচাই ও টেকসই ব্যবস্থাপনার কাজে। সমন্বিত স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান গবেষণা তহবিল করা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ও নতুন রোগের চিকিৎসা উদ্ভাবনে এই তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে স্বাস্থ্য খাতে। বাজেটে জনকল্যাণমূলক ১১টি স্বাস্থ্য সংস্থাকে কর রেয়াত সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, এই গবেষণা তহবিল তা আরো শক্তিশালী করবে।
স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলা তহবিল বরাদ্দ হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকা। সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বাজেটে কিডনি ডায়ালাইসিস এবং হার্টের রিংয়ের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে। এই তহবিলটি মূলত মহামারি বা জরুরি স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা এবং গরিব রোগীদের দোরগোড়ায় আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তা দেবে। ১০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা তহবিল। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকার জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ কর হার প্রস্তাব করেছে। পরিচালন ঋণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। এটি ব্যবহৃত হয় সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রকল্পের দৈনন্দিন ব্যয় এবং জরুরি আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে।
বাজেটে বিনিয়োগ-উৎপাদন চক্র গতিশীল রাখার যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, এই পরিচালন ঋণ তা বাস্তবায়নে পালন করবে সহায়ক ভূমিকা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে আর্থিক সহায়তার জন্য রাখা হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকা। এসএমই খাতের বিকাশে ৫০-৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখা হয়েছে। এই সহায়তামূলক তহবিল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে নিশ্চিত করবে কারিগরি সহায়তা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন তহবিল করা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ খাতের যন্ত্রপাতিতে শুল্ক ছাড় এবং গ্রাহক পর্যায়ে কর রেয়াতের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই তহবিল মূলত বিকল্প জ্বালানি উৎসের প্রসার এবং গ্রিন এনার্জি প্রজেক্টের উদ্ভাবনী কাজে ব্যয় হবে। ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে গিটার, পিয়ানো বা ভায়োলিনের মতো বাদ্যযন্ত্র এবং সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরার যন্ত্রাংশের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
এই টাকা ব্যবহৃত হবে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও শিল্পীদের দক্ষতা উন্নয়নে। প্রবাসী বাংলাদেশি জনশক্তির সুরক্ষা ও প্রবাসী কর্মীদের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিতে একটি বিশেষ ‘প্রবাসী কার্ড’প্রবর্তন করছে সরকার। প্রবাসী কল্যাণ সেবা, বীমা, ব্যাংকিং সুবিধা এবং জরুরি সহায়তার সঙ্গে সংযুক্ত হবে কার্ডটি। বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে রাশিয়া, পর্তুগাল, রোমানিয়া, ব্রাজিল, গ্রিস, সার্বিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে এরই মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যয় নির্বাহ করবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলার প্রত্যয়কে কেন্দ্রে রেখেই আমরা এবারের বাজেটে-স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি, সামষ্টিক কৌশল নির্ধারণ করেছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সাথে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে জনমিতিক লভ্যাংশ ও দীর্ঘজীবিতা লভ্যাংশর সুযোগ কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক লভ্যাংশও অর্জন করবে। তার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৪৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা, যা ইতোমধ্যে অনুমোদন করা হয়েছে।
উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ মোট বাজেটের ২৭.২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার এবং পরিচালন ব্যয় ৭২.৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এবার পরিচালন ব্যয় (খাদ্য হিসাব, ঋণ ও অগ্রিম, অভ্যান্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং কাঠামোগত সমন্বয় বাদে) ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে ৬.৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা যাবে সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের ২১ শতাংশের বেশি। অনুন্নয়ন ব্যয়ের আরও প্রায় ১৪.৭৫ শতাংশ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হয়ে, যার পরিমাণ অন্তত ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
মহামারীর ধাক্কা সামলে ২০২১ সালে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হতে শুরু করলে বেড়ে যায় আমদানি। তাতে সরকারের জমানো ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়। রপ্তানি বাড়লেও আমদানির মত অতটা না বাড়ায় এবং রেমিটেন্সের গতি ধীর হয়ে আসায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। এর মধ্যে ২০২২ সালে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য আর জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করে। মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় ডলার বাঁচাতে সরকার বিলাস পণ্য আমদানিতে লাগাম দেওয়ার পাশাপাশি কৃচ্ছ্রের পথে হাঁটতে শুরু করে। তাতেও কাজ না হওয়ায় ডলারের যোগান বাড়াতে আওয়ামী লীগ সরকারকে আইএমএফ এর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়। অন্তর্বর্তী সরকার সেই ঋণ চুক্তি অব্যাহত রাখে। এখন বিএনপি সরকার আরো বেশি বিদেশি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
রাজস্ব আহরণে এনবিআর বিদায়ী অর্থবছরের লক্ষ্যের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের ৭৪ শতাংশ তিনি রাজস্ব খাত থেকে পাবেন। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ১৮ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ২০ শতাংশের বেশি। টাকার ওই অংক মোট বাজেটের ৬৪ শতাংশের বেশি।
গতবারের মত এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩.৮৫ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। সংশোধনে তা কমিয়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৮২১ কোটি টাকা করা হয়। আয়কর ও মুনাফার উপর কর থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৮ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৬১ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৮২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৯৯ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ৩ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া বিদেশি অনুদান থেকে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, সংশোধনে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়, যদিও এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৪ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, “বিভিন্ন বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও আমাদের রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। রাজস্ব আহরণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রধান উদ্দেশ্য হলেও দেশে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসার ক্ষেত্র বৃদ্ধি, দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও প্রতিরক্ষণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্টকরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভূমিকা অগ্রগণ্য।”
তিনি বলেন, “সরকারের লক্ষ্য মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। এজন্য প্রয়োজন একটি ন্যায্য, প্রযুক্তিনির্ভর, সর্বজনীন ও পূর্বানুমানযোগ্য রাজস্ব কাঠামো, যা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করবে এবং বিনিয়োগ-উৎপাদন-কর্মসংস্থান-ভোগ-কর চক্রকে আরও গতিশীল করবে।”
২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধনে তা ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। নতুন অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন, তাতে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩.৬ শতাংশের সমান। ঘাটতির এই অনুপাত গতবারের সমান।
সাধারণত ঘাটতির পরিমাণ ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা হয়। তবে টাকা যোগানোর চাপ থাকায় আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পর থেকে প্রতিবারই ঘাটতি ৪ দশমিক ৯ শতাংশের বেশি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ তা ৪ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনেন। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও সেই ধারা বজায় রাখলেন। বরাবরের মতোই বাজেট ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রীকে নির্ভর করতে হবে অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশি ঋণের ওপর। তবে চড়া সুদে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ কমাতে আমির খসরু জোর বিদেশি উৎস থেকে গতবারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছেন।
তিনি আশা করছেন, বিদেশ থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি তিনি মেটাবেন। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে।
বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সেই লক্ষ্যেও পৌঁছানো যায়নি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হবে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ১০ মাস মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি ছিল।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কৌশলে তা এক অংকের ঘরে নামানো গেলেও এখনো তা ৯ শতাংশের বেশি। সবশেষ মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, তার নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে আটকে রেখেই ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হবে।
নতুন অর্থবছরে আয়-ব্যয়ের ঘাটতি মেটাতে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্য ঠিক করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যে পরিকল্পনা ধরে তিনি বাজেট সাজিয়েছেন, তাতে নিট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে গত অর্থবছরে পাওয়া নিট বিদেশি ঋণের প্রায় দ্বিগুণ। বাজেটের ব্যয়ের মধ্যে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব বাবদে আয় করা যাবে বলে অর্থমন্ত্রী আশা করছেন। সে হিসাবে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩.৬ শতাংশের সমান। এই ঘাটতি মেটাতে তিনি বিদেশ থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ করবেন, যা জিডিপির ২ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ সংকটের এই সময়ে মোট ঘাটতির ৬৪ দশমিক ১৩ শতাংশই বিদেশি ঋণ দিয়ে পূরণের আশা করছে নতুন সরকার। এর মধ্যে ৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে আগে নেওয়া ঋণের কিস্তি আর সুদ পরিশোধে। তাতে নিট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত নিট বিদেশি ঋণের চেয়ে ৮৯.৪ শতাংশ বেশি।
বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে বৈদেশিক ঋণ খাতে ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধনের পর যা কমে দাঁড়ায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর কিস্তি ও সুদ মিটিয়ে নিট বিদেশি ঋণ ছিল ৫৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেট বক্তৃতার ভূমিকাতে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মানকে প্রাধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে রেখে বাজেট বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে জনগণের আর্থিক পুনরুদ্ধার ও কল্যাণ নিশ্চিত করে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই এই বাজেটের মূল দর্শন। মধ্যমেয়াদে রাজস্ব আদায়ে গতি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজেট ঘাটতিকে সহনীয় পর্যায়ে রেখে ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে মাঝারি ঝুঁকি থেকে নিম্ন ঝুঁকির ক্রেডিট রেটিংয়ে ফিরিয়ে আনা হবে। ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে সরে এসে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বেসরকারি বিনিয়োগ-কেন্দ্রিক একটি অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এবার বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে; যা ঋণ ঝুঁকি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সহায়ক হবে। অর্থমন্ত্রী এবার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ধার করে বাকি ঘাটতি পূরণের লক্ষ্য ঠিক করেছেন। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে সরকার নিতে চায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এছাড়া সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধন করে তা বাড়িয়ে ধরা হয় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়, যা সংশোধনের পর বেড়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা।
নতুন অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে চায় সরকার, যা জিডিপির ১ দশমিক ৬৪শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে মূল বাজেটে এ খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে তা বেড়ে ১ লাখ ১৮ হাজার হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গতবারের মূল বাজেটের চেয়ে এবার ব্যাংক থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছে সরকার। তবে সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৬ হাজার কোটি টাকা কম ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এই ব্যয়ের মধ্যে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব বাবদে আয় করা যাবে বলে তিনি আশা করছেন। সে হিসাবে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩.৬ শতাংশের সমান।
ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়াও সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধন করে তা বাড়িয়ে ধরা হয় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এবার ঘাটতি পূরণে সরকার বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নিতে চায়, যা জিডিপির ২ দশমিক ২৮ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে বৈদেশিক ঋণ খাতে ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধনের পর যা কমে দাঁড়ায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনা ও সরকারি অর্থ খরচ কমিয়ে আনতে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দেয়। তবে শেষের দিকে এসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে মোট ১ লাখ ১৪ হাজার ১৬১ কোটি টাকা ঋণ নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য বলছে, বিদায়ী আর্থিক বছরের ১১ মাসে, অর্থাৎ জুলাই-মে সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার ২৩ কোটি টাকা নিয়েছে সরকার।
অর্থনীতিবিদরা বলে থাকেন, ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ বেশি নিলে বেসরকারি খাতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা ঋণ কম পান। তাতে দেশের উৎপাদন কমে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে একেবারে তলানিতে, ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে; যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরের নবম মাস মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫৪৩ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ১৯ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা।
এদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়িয়ে বেসরকারি ঋণে লাগাম দিলেও তার সুফল মেলেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, গত মে মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি বা মাসভিত্তিক) দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার মানে হলো ব্যবসা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কমে যাবে। সেই সঙ্গে কমবে নতুন শিল্প স্থাপন বা শিল্প সম্প্রসারণের গতি। অবধারিতভাবে তার প্রভাব পড়বে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে।
প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ একলাফে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট জিডিপির ২ শতাংশ। এই খাতের প্রধান চমকগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক একটি তৃতীয় ভাষা (যেমন- জাপানিজ, কোরিয়ান, চীনা, আরবি ইত্যাদি) অন্তর্ভুক্ত করা। এই ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষায় যেতে চাইলে সরকার ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেবে। এ ছাড়া নারী শিক্ষার প্রসারে মেয়েদের জন্য স্নাতক (অনার্স) পর্যন্ত শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়েছে। স্কুলগুলোয় প্রযুক্তিভিত্তিক ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং পুষ্টির জন্য মিড-ডে মিল চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ও চিকিৎসার খরচ কমাতে এবার বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছাতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে স্থাপন করা হবে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে দেওয়া হবে একটি করে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণে অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক এবং দেশব্যাপী ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই থাকবেন নারী।
পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের বড় চার জায়গা থেকেই উন্নয়ন বরাদ্দ কমিয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, নৌ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন বরাদ্দ কমানো হয়েছে। তবে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় শোনা গেছে যোগাযোগ খাতের বড় বড় প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ফুলঝুরি। যোগাযোগের চার খাত মিলিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেটে উন্নয়ন বাবদ বরাদ্দ ছিল ৫৩ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট বরাদ্দ কমেছে ৯ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে বরাদ্দ কমেছে প্রায় ১৭.২ শতাংশ। এবার সবচেয়ে বড় কাটছাঁট হয়েছে সেতু বিভাগে। এই খাতে উন্নয়ন বরাদ্দ কমেছে ৩ হাজার ১১৪ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ৫১.৮ শতাংশ। রেল এবং নৌ—উভয় খাতেই বরাদ্দ কমেছে ২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা করে। দুই ক্ষেত্রেই কমার হার প্রায় ২৯.৫ শতাংশ। সড়ক খাতে বরাদ্দ কমেছে ১ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ৪.৯ শতাংশ। চার খাতের মধ্যে এটিই সবচেয়ে কম হারে কাটছাঁট হয়েছে।
গত অর্থবছরে সড়কের উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল ৩২ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এবার তা কমে নেমে এসেছে ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকায়। রেলের বরাদ্দ ৭ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে ৫ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। নৌ খাতে উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল ৭ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা। সেখান থেকে কমে হয়েছে ৫ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। আর সেতু বিভাগে ৬ হাজার ১২ কোটি টাকা থেকে উন্নয়ন বরাদ্দ কমে নেমেছে ২ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকায়। যদিও অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন ৬টি মেট্রোরেল, দ্বিতীয় যমুনা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যুৎচালিত বাসসহ স্মার্ট পরিবহন ব্যবস্থার সম্প্রসারণের কথা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশের সমন্বিত যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং সেতু বিভাগের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয় বাজেট বক্তৃতায়।
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক ও সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। সিগারেটের সর্বনিম্ন স্তরের প্রতি ১০ শলাকার মূল্য ৬২ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরের মূল্য ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া নিকোটিন পাউচের ওপর ৪০ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকোর ওপর আরোপ করা হয়েছে ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক। পাশাপাশি ভ্যাটের আওতা বাড়াতে এখন থেকে যেকোনো ধরনের ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ‘মূসক বা ভ্যাট নিবন্ধন’ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর প্রস্তাব আনা হয়েছে। উচ্চ মূল্যের হিমায়িত মাছ এবং সুগন্ধি বৃক্ষ নির্যাসের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাবও করা হয়েছে। তবে মেট্রোরেল সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।
বিশ্ব অর্থনীতিতে যেকোনো দেশের সক্ষমতা পরিমাপের ক্ষেত্রে জাতীয় বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একটি দেশের সরকার বছরে কত অর্থ ব্যয় করবে, কীভাবে রাজস্ব আদায় করবে, কী পরিমাণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে এবং জনগণকে কত ধরনের সেবা দেবে-তার একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায় বাজেট থেকে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ডলারের বিনিময় হার অনুযায়ী এই বাজেটের আন্তর্জাতিক মূল্যমান দাঁড়ায় প্রায় ৭৭ বিলিয়ন ডলার বা ৭৬ দশমিক ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এদিকে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশের বাজেটের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। বাজেটের আকার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ধনী দেশ কাতারের বার্ষিক বাজেটের চেয়েও বাংলাদেশের বাজেট বড়। কাতার বিশ্বের সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোর একটি হলেও দেশটির জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে কাতারের সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ বাংলাদেশের চেয়ে কম। একইভাবে তেলসমৃদ্ধ কুয়েতের বাজেটও বাংলাদেশের তুলনায় ছোট। ওমানের বাজেটের চেয়েও বাংলাদেশের বাজেট উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে বড়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









