উইলিয়াম শেকসপিয়ারের দারুন একটি উক্তি আছে-- "রাজা যেমন রাজনীতিকে বদলে দিতে পারে, রাজনীতিও রাজাকে বদলাতে পারে'। তার এই উক্তিটি সাধারনভাবে খুব সাদামাটা মনে হবে। কিন্তু এর গভীরতা, এর প্রতীকি তাৎপর্য সীমাহীন। তিনি তার নাটক ' কিং হেনরি ফোর' এ একজন রাজার বা শাসকের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, দৃঢ়তা, ধৈর্য, সাহস, দূরদর্শীতা এবং সরলতার চিত্রায়ন করেছেন তা যুগে যুগে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দর্শন ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে।
নাটকে তিনি একজন শাসকের 'গুডমিকচার' বৈশিষ্ট্যকে ভিন্নভাবে চিত্রায়ন করেছেন। এটি এমন একটি বৈশিষ্ট্য যা একজন শাসককে ব্যতিক্রমী এবং বহুমাত্রিক চিত্তদর্শে রুপান্তরিত করে। অর্থাৎ এই গুণ যার মধ্যে আছে তিনি সবার সাথে মিশতে পারে কিন্তু ব্যক্তিত্বে তিনি থাকেন উচ্চমার্গীয়। এককথায় একজন রাজা তার অবস্থানে অবিচল থেকে আমলা থেকে কামলা সবার সাথে যখন মিশে যেতে পারেন সেটাই হল গুডমিকচার। মার্টিন লুথার কিং একটি জাতিকে একটি বাক্যে উজ্জীবিত করেছিলেন এবং একটি রাজনৈতিক দর্শনকে বদলে দিয়েছিলেন। তার বাক্যটি ছিল-- আই হ্যাভ আ ড্রিম। আমার একটি স্বপ্ন আছে। তিনি সেই স্বপ্নে অবিচল থেকে একটি জাতিকে, একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইতিহাসে নাম লিখিয়েছিলেন।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান নির্বাচনের আগে বলেছিলেন-- ' আই হ্যাভ আ প্লান'। প্লান শব্দটির আগে তিনি একটি আর্টিকেল ব্যবহার করেছেন। আপাতত মনে হতে পারে যে তিনি শুধু একটি পরিকল্পনার কথাই বলেছেন। কিন্তু একটু গভীরে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে অনেকগুলি স্বপ্নকে তিনি একটি সুতোয় গেঁথে একমাত্রিক করে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। সমালোচক এবং বিরোধী রাজনৈতিক শিবির থেকে তার প্লানটি কি সেটা সুনির্দিষ্ট করে জানতে চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তার প্লানকে এখনো সুপ্ত এবং রহস্যময় করে রেখেছেন। হয়তো কাজে প্রমাণ করে সমালোচকদের সমালোচনার জবাব দিয়ে দিবেন।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর হাতে অনেক ক্ষমতা। তিনি ইচ্ছা করলে তার প্লানগুলি সহজেই বাস্তবায়ন করতে পারেন। যাহোক জন মিল্টনের একটি প্রবাদবাক্য আছে-- মর্নিং শোজ দ্যা ডে। সকালই বলে দেয় দিনটি কেমন যাবে। অর্থাৎ কাজের শুরুটা একটি ফ্যাক্টর। এই সরকারের বয়স চার মাস হতে চললো। ইতোমধ্যে সরকারের নেয়া নানা পদক্ষেপ নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ চলছে। আমি সেদিকে যাবো না। আমি প্রধানমন্ত্রীর কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করবো যেটা গুডমিকচারকে প্রতিনিধিত্ব করে। প্রথমেই যেটা বলবো সেটা হল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন স্বল্পভাষী শাসক। তিনি কথা খুব মেপে বলেন। প্রয়োজনের বাইরে কথা বলেন না। তার মাতাও এমনটি ছিলেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এমন গুণ অবশ্যই সবার নজর কাড়ে। স্বল্পভাষী মানুষের স্লিপ অব টাঙ্ক হয় না বললেই চলে। রাষ্ট্রপ্রধানের মুখের একটি বেফাঁস কথা বা বক্তব্য অনেক বড় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে যেটা আমরা জুলাই আন্দোলনের আগে দেখেছি।
প্রধানমন্ত্রীর যে ধরনের প্রটোকল আমরা এর আগে দেখেছি সেটার কিছুটা বৈচিত্র্য আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি। সব রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে প্রধানমন্ত্রীর চলাচল করার যে প্রচলিত রেওয়াজ আমরা দেখেছি সেটা এখন অনেকটাই কমে গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাধারন জীবন যাপনে অভ্যস্ত বলে মনে হচ্ছে। সাধারনের সাথে মিশে যাবার একটি প্রবনতা তার মাঝে দেখা যায়। পোশাকেও খুব সিমপ্লিসিটি দৃশ্যমান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুপুরের খাবার এবং নাস্তায় যে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে সেটা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এটাকে সবাই ভাল চোখে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই ধরনের সাশ্রয়ী ও মিতব্যয়িতার মানসিকতা অবশ্যই সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রভাব বিস্তার করবে। আগে যেখানে বিলাসবহুল খাবারের পসরা সাজিয়ে রাখা হত এবং সীমাহীন অপচয় হত সেটার লাগাম টেনে ধরে প্রধানমন্ত্রী ১০০-১৫০ টাকার মধ্যে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী একটা লম্বা সময় লন্ডনে থেকেছেন। সেখানকার পরিবেশ নিশ্চয়ই তাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি নিজের দেশের রাজধানীকেও হয়তো উন্নত দেশের রাজধানীর আদলে তৈরি করতে চান।
ঢাকার জ্যামজট দূরীকরনে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থা সুদৃঢ় করনে সড়কে এ আই প্রযুক্তি বসানোর নির্দেশনা দিয়েছেন যেটার সুফল ইতোমধ্যে রাজধানীবাসী পেতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন কাজের মধ্যে নতুনত্ব ও উদ্ভাবনী আমেজের ছাপ দৃশ্যমান। রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করা ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশনা দিয়েছেন। এটা একটি চরম চ্যালেঞ্জিং কাজ ঢাকা সিটিতে আর সেই চ্যালেঞ্জটি প্রধানমন্ত্রী গ্রহন করেছেন। এটাতে যখন পূর্ণ সফলতা আসবে তখন নগরবাসী এক নতুন ঢাকা উপহার পাবেন। নগরের পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কড়া নজরদারি রয়েছে যেটা এর আগে কখনই আমরা দেখিনি। তিনি নিজে বের হয়ে গাড়ি চালিয়ে নগরের ময়লা আবর্জনার কি অবস্থা সেটা দেখেছেন এবং তাৎক্ষনিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। ঈদ পরবর্তী পরিচ্ছন্নতাকে কেন্দ্র করে দুজন কর্মকর্তার দায়িত্বে গাফিলতির জন্য তাদেরকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন।
সরকারী কর্মকর্তাদের এবং প্রশাসকদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমনে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেন নি। রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করে এ ধরনের ভ্রমনকে নিরুৎসাহিত করে প্রধানমন্ত্রী তার পরিচ্ছন্ন নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন নীতির এক মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন। চট্টগ্রাম ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও কর্মকর্তাদের অহেতুক বিদেশ ভ্রমনের ফাইল তিনি অনুমোদন করেন নি। এটা তার বিচক্ষনতা ও দূরদর্শীতার প্রমাণ।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আরও কিছু নতুনত্ব আমরা দেখেছি। নির্বাচনের পরেই তিনি বিরোধীদলীয় নেতাদের বাসায় গিয়েছেন যেটা একটি গঠনমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করে। রামিসা হত্যার বিচার নিয়ে দেশ যখন উত্তাল তখন তিনি রামিসার বাবার কাছে ছুটে গিয়েছেন। তিনিতো তার নিজ কার্যালয়ে রামিসার বাবাকে ডাকতে পারতেন। কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসাবে তিনি সেটা করেন নি। বিপদে রাজনৈতিক নেতাদের মানুষের কাছে যে ছুটে যেতে হয় তিনি সেটা প্রমাণ করেছেন। রামিসা হত্যার বিচার দ্রুত করতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র সংস্কার ও উন্নয়নে বড় বড় কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছেন। সরকারি চাকুরিজীবিদের নবম পে - স্কেল দীর্ঘ দিনের দাবি ছিলো। তিনি সেই দাবি পূরুণ করে চাকুরিজীবিদের মুখে হাসি ফুটাতে বদ্ধপরিকর। রাষ্ট্রের সব স্তরের জনগণের কথা চিন্তা করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড সহ নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন। সংসদের এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবার যে অনভিপ্রেত প্রতিযোগিতা ছিলো সেটা তিনি বন্ধ করেছেন। এক্ষেত্রে বিরোধীদলগুলিরও ইতিবাচক ভূমিকাও ছিল। মন্ত্রী এমপিদের কাজের নজরদারি প্রধানমন্ত্রী নিজে করছেন। তিনি তাদের স্কিল খেয়াল রাখছেন। কোন মন্ত্রালয় নিয়ে যৌক্তিক কোন অভিযোগ উঠলে নিজে খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ নিচ্ছেন। পদ্মা ব্যারেজের মত একটি মেগা ও সাহসী প্রকল্প তিনি হাতে নিয়েছেন।
এটা বড় একটি চ্যালেঞ্জের কাজ। তরুন উদ্যোগতাদের উৎসাহিত করতে প্রধানমন্ত্রী জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের জন্য খাল খনন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। দুর্নীতির লাগাম টানে প্রধানমন্ত্রী বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে। ১৭ বছর বিদেশ থেকেছেন। ভিন দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নিবিড়ভাবে দেখেছেন। গতানুগতিক বস্তাপচা রাজনীতি হয়তো তিনি এড়িয়ে গিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করতে যাচ্ছেন। প্রতিহিংসার রাজনীতি আমাদেরকে পিছিয়ে দিচ্ছিলো দিন দিন। প্রধানমন্ত্রী প্রতিহিংসার কোন রাজনীতির পথে হাটবেন না এটা কাজ দেখে বুঝা যাচ্ছে। বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে তার বাবার নামে ( যেটা আগে ছিলো) করার দাবি উঠে। কিন্তু তিনি সেদিকে কর্ণপাত করেন নি। রাষ্ট্রের অপচয় রোধ এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি বাদ দিয়ে তিনি রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক উন্নয়নে নজর দিচ্ছেন। রাষ্ট্রের সৃষ্টিশীল কাজ ও সৃষ্টিশীল মানুষগুলিকে তিনি অনুপ্রেরনা দিয়ে তাদের কাজকে আরো গতিশীল করছেন।
প্রধানমন্ত্রী অনেক ভাল কাজ করে চলেছেন যেগুলি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তবে একটি বিষয়ে তাকে অবশ্যই নজর দিতে হবে। আর সেটা হল জুলাই সনদ ও গণভোট। জেন জি কি চায়, তাদের রাজনৈতিক দর্শনকে প্রধানমন্ত্রী মূল্যায়ন করবেন এটাই সবার চাওয়া। জুলাই অভ্যুত্থান না হলে তিনি হয়তো প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না। তাই জুলাইকে নিয়ে তিনি ভাববেন এবং জুলাই যোদ্ধাদের মূল্যায়ন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে জনগণের আরেকটি প্রত্যাশা আছে। আর সেটি হল খাদ্যে ভেজাল কঠোর হস্তে দমন করা। একই সাথে চাঁদাবাজি বন্ধ করা। আমরা এমন একজন প্রধানমন্ত্রী দেখতে চাই যিনি শুধু অফিসিয়ালি প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি হয়ে উঠবেন সবার প্রাণের নেতা। সমালোচনা সহ্য করার মত ধৈর্যশীল একজন নেতা ও রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে উঠবেন তিনি এটাই সবার চাওয়া।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









