টানা পাঁচদিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে বানের পানি ঢুকে নিম্নাঞ্চলের শত শত গ্রাম প্লাবিত হয়ে দেশজুড়ে অন্তত ১৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা। চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে সাত লাখ। কক্সবাজারের শতাধিক গ্রামের তিন লক্ষাধিক পানিবন্দি ছাড়াও বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে দুই শিশু ও মৌলভীবাজারের রাজনগরে মারা গেছেন একজন বৃদ্ধ।
এ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানিতে ডুবে মৃত্যু বেড়ে দাাঁড়িয়েছে ১৩ জনে, যাদের ১০ জনই চট্টগ্রাম জেলার। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গা জেলার চরাঞ্চল ও নিচু এলাকাসহ বান্দরবান ও খাগড়াছড়িসহ চট্টগ্রাম বিভাগের অন্য জেলাগুলোতেও অনেক এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুরসহ দেশের ছয়টি বিভাগের কিছু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় সব মিলিয়ে ১৮টি জেলায় ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আবার চট্টগ্রামের চার জেলায় পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে, তিস্তার পানি নেমে বিপৎসীমার নিচে থাকায় উত্তরের কয়েকটি জেলায় বন্যার শঙ্কা কমেছে।
চট্টগ্রামে সাড়ে সাত লাখে মানুষ বন্যাকবলিত
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর অনেক জায়গা প্লাবিত হয়ে সাড়ে সাত লাখেরও বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় থেকে জানানো হয়, গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবারের সাত লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন লোক বন্যা আক্রান্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ১০ জন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়েছে।
গত রবিবার শুরু হয়ে এ পর্যন্ত জেলায় এক হাজার ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
সাতকানিয়া: সবচেয়ে বেশি প্লাবিত সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রত্যেকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান।
বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাতকানিয়া উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি নির্ভর করে পাহাড়ে বৃষ্টির উপর ভিত্তি করে। সাঙ্গু নদী, ডলু ও হাঙ্গর খালের মাধ্যমে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে উজানের দিকে। বান্দরবানের দিকে বৃষ্টি হলে তার প্রভাব পড়বে সাতকানিয়া অঞ্চলে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ তথ্য মতে, শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সাঙ্গু নদীর দোহাজারি অংশে পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পৌরসভা ও রামপুর এলাকায় ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করায় এ পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের বুড়ির দোকান এলাকায় সড়কে পানি উঠে চট্টগ্রামের সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ তৃতীয় দিনের মত বন্ধ আছে। কেউচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সাংবাদিক মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়কে পানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। তেমুহুনি, ঢেমশা, নলুয়া ও সাতকানিয়া সদর এলাকায় মানুষের চলাচলের অন্যতম বাহন হয়ে উঠেছে নৌকা। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও পাওয়া যাচ্ছে না।
বাঁশখালী: বাঁশখালীতে পাহাড়িঢলে ভেসে গিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নিহত শিশুরা হলো বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামের মেহের আলী বাড়ির প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে মোহাম্মদ আশিক (৭) ও একই ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার মোহাম্মদ মিরাজ (৩)।
স্থানীয়রা জানান, বৃষ্টি ও পাহাড়িঢলে কয়েক দিন ধরে উপজেলার বেশ কিছু এলাকা ডুবে আছে। এর মধ্যেই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির প্রবল স্রোতে বাহারছড়া ইউনিয়নে বাড়ির উঠানে থাকা দুই শিশু ভেসে যায়। পরে পরিবার ও স্থানীয় লোকজন তাদের মরদেহ উদ্ধার করেন।
গতকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত অন্তত ৫৫ হাজার লোক উপজেলাটিতে পানিবন্দি হয়েছেন বলে জানান সহকারী কমিশনার (ভূমি) আঁকন। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতের বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় আবার পানি বেড়েছে। যার কারণে অনেকেই আবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে দিয়ে পানি সরানো হচ্ছে। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের কম-বেশি সবগুলোর লোকজন পানিবন্দি রয়েছেন। বাহারছড়া, সরল, শেখের খিল, বৈলছড়ি ও কাথারিয়া ইউনিয়নের অবস্থাই বেশি খারাপ। উপজেলা সহকারী কমিশনার ওমর সানি আঁকন বলেন, এদিকে দুর্যোগ মোকবেলিয়া ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য দিয়েছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়।
কক্সবাজারে পানিবন্দি ৩ লাখ মানুষ
কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। টানা পাঁচদিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে শতাধিক গ্রাম তলিয়ে যাওয়ায় এসব উপজেলায় তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে থাকায় চকরিয়ার বরইতলী, বমুবিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, চিরিঙ্গা ও হারবাং ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে রয়েছে। মাতামুহুরীর পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে পেকুয়ার উজানটিয়া, মগনামা, বারবাকিয়া, মেহেরনামা এবং পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। সড়ক, কৃষিজমি ও চিংড়ির ঘের ডুবে যাওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, বাঁকখালী নদীর পানি পাঁচ দশমিক ৮৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ছয় দশমিক ৫৪ মিটারে পৌঁছেছে, যা বিপৎসীমার চেয়ে বেশি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান জানান, ‘জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোলরুম চালু করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে কন্ট্রোল রুমের ০১৮৭২৬১৫১৩২-এ সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, পাঁচ দিনে জেলায় প্রায় ৭০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে, বন্যার পানিতে ডুবে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা হচ্ছে, চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের মাইজকাকারা এলাকার সোলতান আহমদের দুই বছরের ছেলে মোহাম্মদ ওয়াকিম ও মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকার আরিফুল ইসলামের তিন বছরের ছেলে পুষ্প। চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার জানান, বন্যায় মারা যাওয়া দুই শিশুর পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করায় জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর স্লুইসগেট খুলে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
খাগড়াছড়িতে ২০ গ্রাম প্লাবিত
টানা বর্ষণের পর বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও নিম্নাঞ্চল হওয়ায় মেরুং ইউনিয়নের ২০ গ্রাম প্লাবিত রয়েছে। জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এখনো যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। দীঘিনালা–লংগদু ও খাগড়াছড়ি–রাঙামাটি সড়কে টানা তৃতীয় দিনের মতো যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়া মহালছড়ি উপজেলায় একটি সেতু তলিয়ে যাওয়ায় মুবাছড়ি এলাকার সঙ্গে উপজেলা সদরের সরাসরি যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তবে দীঘিনালা-সাজেক সড়কের কবাখালী এলাকার পানি সরে যাওয়ায় গতকাল শুক্রবার থেকে বাঘাইহাট–মাচালং–সাজেক সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। সাজেক থেকে ফিরেছেন আটকে পড়া পর্যটকরা। বৃহস্পতিবার রাত থেকে পানি কমতে শুরু করায় কবাখালী সড়ক থেকে পানি নেমে গেছে। উপজেলার মাইনী নদীর পানিও কমছে।
জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানান, জেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় মোট ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া লোকজন এবং পানিবন্দি পারিবারগুলোকে খিচুড়ি, পানি, প্রয়োজনীয় ঔষধ ও শুকনো খাবার দেওয়া হচ্ছে। দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিল পারভেজ জানান, উপজেলায় ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে সাত হাজারের বেশি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তাঁদের জন্য খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেরুং ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, ‘আমাদের ঘর-বাড়ি ডুবে গেছে। সড়কও বন্ধ। খুব ভোগান্তিতে আছি। কবে পানি নামবে সেটিও বলা যাচ্ছে না।’
এদিকে চেঙ্গী নদীতে পানি কমলেও খাগড়াছড়ি শহরের নিচের বাজার ও গঞ্জপাড়া এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা রয়েছে। টানা বৃষ্টিতে জেলায় বন্যার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। এরই মধ্যে মহালছড়ি–গুইমারা সড়কের সিন্দুকছড়ি এবং খাগড়াছড়ি শহরের শালবন, কুমিল্লাটিলা ও হরিনাথপাড়া গ্যাপ এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
কুশিয়ারার পানিতে ডুবছে সুনামগঞ্জ
সিলেটে নদ-নদীর পানি কোথাও কমছে আবার কোথাও বাড়ছে। পাউবো সিলেট কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি কমলেও সিলেট পয়েন্ট পানি বাড়ছে। কুশিয়ারা নদীর আমলশিদ ও শেওলা পয়েন্টে শূন্য দশমিক ৪ সেন্টিমিটার, ফেঞ্চুগঞ্জ ও শেরপুর পয়েন্টে শূন্য দশমিক ৬ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। এ ছাড়া সারিগোয়াইন, পিয়াইন, লোভাছড়া এবং ধলা নদীর পানি কমছে।
উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিপাতে সুনামগঞ্জ জেলার প্রধান নদীগুলোর পানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। জেলার পাঁচটি পানি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে চারটিতেই পানি বেড়েছে। এর মধ্যে শাল্লা উপজেলার মারকুলি স্টেশনে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বাড়ছে নরজুর ও মাগুরা নদীর পানিও। ফলে ওই অঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সুরমা নদীর পানি বাড়লেও সীমান্তঘেঁষা যাদুকাটা নদীর পানি লাউড়েরগড় স্টেশনে ৪২ সেন্টিমিটার কমেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর-২) এমদাদুল হক বলেন, ভারতের চেরাপুঞ্জি ও দেশের অভ্যন্তরে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে কুশিয়ারা নদীর পানি শাল্লার মারকুলি পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। জেলার বাকি প্রধান নদীগুলোর পানি বাড়লেও তা এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে সেসব নদীর পানিও দ্রুত বাড়তে পারে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সীমান্ত এলাকা লাউড়েরগড়ে সর্বোচ্চ ১০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ ছাড়া জেলা সদরে ৭৭ মিলিমিটার, দিরাইয়ে ২০ মিলিমিটার এবং ছাতকে ১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
তাহিরপুরেও বাড়ছে নদী ও হাওরের পানি। তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের শক্তিয়ারখলা ১০০ মিটার, দুর্গাপুর মাজার এলাকা ও আনোয়ারপুর সড়কে পানি উঠছে। পাহাড়ি ছড়া ও যাদুকাটা, পাটলাই, বৌলাইসহ অন্যান্য নদীর তীরবর্তী বসতবাড়ি স্রোতের তোড়ে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ছড়া দিয়ে নেমে আসা পানিতে সীমান্ত এলাকা বেশকিছু বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত ও শুল্ক বন্দরের ডিপোতে থাকা কয়লা ও চুনাপাথর পানির স্রোতে ভেসে গেছে।
টাংগুয়ার হাওর পাড়ে বাসিন্দা জহির মিয়া জানান, বৃষ্টি কমলেও হাওর ও নদীতে পানি বাড়ছে। তাহিরপুর সীমান্তের চারাগাও গ্রামে বাসিন্দা এইচ এম আব্দুল হামিদ জানান, ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ছড়া দিয়ে প্রবল স্রোতে বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাঙনের মুখে পড়েছে। বড়ছড়া কয়লা চুনাপাথর আমদানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সবুজ আলম জানান, পাহাড়ি ঢলের পানিতে বেশকিছু ব্যবসায়ীর শুল্ক বন্দর এলাকায় ডিপুতে স্তূপ করে রাখা কয়লা ও চুনাপাথর স্রোতে পানিতে ভেসে গিয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান মানিক জানান, পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া আশ্রয় কেন্দ্রগুলো খোলা হয়েছে। বৃষ্টির পরিমাণ অনেক কমেছে তবে নদী ও হাওরে পানি বেড়েছে। তাহিরপুর সুনামগঞ্জ সড়ক যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
জগন্নাথপুর উপজেলার কুশিয়া নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যেও বন্যা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী উপজেলার আশারকান্দি, পাইলগাঁও ও রানীগঞ্জ ইউনিয়নের বাজারসহ সংলগ্ন নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত পাইলগাঁও ইউনিয়নের পূর্ব জালালপুর গ্রামে বেড়িবাঁধ ভেঙে কুশিয়ারা নদীর পানি প্রবেশ করছে। খানপুর, জালালপুর ও পুরনো আলাগদি বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। পাইলগাঁও ও রানীগঞ্জ ইউনিয়নের রানীগঞ্জ বাজার, রানীনগরসহ বেড়িবাঁধের বাইরের শতাধিক বসতবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার মানুষের বিগত ২২ ও ২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনো তারা রোমন্থন করে।
পূর্বজালালপুর গ্রামের শিপন আহমদ বলেন, ‘আমাদের গ্রামের বেড়িবাঁধের একটি অংশ ভেঙে কুশিয়ারা নদীর পানি প্রবেশ করছে। গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত পানি প্রবেশ করেছে। এভাবে পানি প্রবেশ করতে থাকলে বাড়িঘরে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’ রানীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আমাদের বাজারের প্রধান গলিতে ও দোকানে কুশিয়ারা নদীর পানি প্রবেশ করে হাঁটুপানি পর্যন্ত হয়ে গেছে। এতে বাজারে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা দুর্ভোগের শিকার।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন জানান, কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
খোয়াইয়ে প্লাবিত হবিগঞ্জ
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এতে অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানির প্রবল স্রোতে নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলিজমি তলিয়ে গেছে। হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, অনেক পরিবারের ঘরে কোমরসমান পানি উঠেছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ায় নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা গবাদিপশু, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড় ও মূল্যবান জিনিসপত্র ও গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন। আবার অনেকে স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবস্থান নিয়েছেন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন বন্যা পরিস্থিতির সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করেছে এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
মৌলভীবাজারে পানিবন্দি প্রায় ৩০ হাজার মানুষ
টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়িঢলে মৌলভীবাজার জেলার প্রধান দুই নদী মনু ও ধলাইয়ের একাধিক স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উজানে ধলাই নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চল এবং মনু নদীর অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হচ্ছে। সদর, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার অন্তত ১৭টি ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার পরিবারের অন্তত ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে অসংখ্য বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও গ্রামীণ সড়ক। আউশ ধানের ক্ষেত, শীতকালীন সবজি এবং ফিশারির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোয় বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার ও গোখাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। তারাপাশা-টেংরা সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এদিকে বন্যার পানিতে ডুবে রাজনগর উপজেলায় বৃদ্ধ মো. আশরফ মিয়ার মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে নিজ বসতঘর থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করেন স্বজনেরা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই উপজেলাটি। মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর, হরিপাশা, ইব্রাহীমপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম এবং ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে আরো প্রায় ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে টেংরা ও কামারচাক ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। এদিকে ধলাই নদীর বাঁধে বড় ভাঙন দেখা দেওয়ায় ইসলামপুর, আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের প্রায় ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তিনটি প্রাথমিক ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। উজানে পানি কমলেও উপজেলার নিম্নাঞ্চল শমশেরনগর, পতনউষার ও মুন্সিবাজার ইউনিয়নে পানি বাড়ছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের বেশকিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
ইতিমধ্যে ৯৫টি পরিবারকে মাইজগাঁও দাখিল মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কুলাউড়ার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের রাজাপুর ও শিকড়া গ্রামের বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শিকড়া, আলিনগর, ধামুলিসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ২০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত। মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ভাঙন এলাকা দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরের পানিও ক্রমাগত বাড়ছে।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, গত দুই দিনে ১৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং আগামী ২-৩ দিন একই ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে বলে জানা গেছে।
এদিকে বন্যা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, জেলার ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পানিবন্দি মানুষের জন্য শুকনো খাবার বিতরণ শুরু হয়েছে এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় দুর্গতদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলমান রয়েছে। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের আরো ৪-৫টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মীরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে জেলার সবকটি আশ্রয়কেন্দ্র সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রাখা হয়েছে।
বিপৎসীমার নিচে তিস্তার পানি, কমেছে বন্যার শঙ্কা
টানা ভারি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বৃদ্ধি পাওয়া তিস্তা নদীর পানি কমে নীলফামারীর ডিমলার ডালিয়া পয়েন্টে এখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমে যাওয়ায় তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে বন্যা ও প্লাবনের তাৎক্ষণিক শঙ্কা কেটে গেছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। গতকাল শুক্রবার ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি কমতে শুরু করলে প্লাবিত এলাকার পানি ধীরে ধীরে নামছে।
চুয়াডাঙ্গার নিচু এলাকা প্লাবিত
অতিবৃষ্টিতে চুয়াডাঙ্গার নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলা শহরের চাঁদমারি মাঠ, আরামপাড়া, দক্ষিণহাসপাতাল পাড়া, গুলশানপাড়াসহ নিচু সব এলাকায় পানি জমে গেছে। অনেক সড়কেও দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। শহরের আরামপাড়ার ব্যবসায়ী মুরাদ হোসেন জানান, আরামপাড়ার অনেকের বাড়িতে পানি ঢুকে গেছে। রাস্তায় জমে আছে পানি। পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষ। শহরের গুলশানপাড়ার আসমত আলী বলেন, গুলশানপাড়া থেকে দক্ষিণ হাসপাতাল পাড়া পর্যন্ত এলাকাটি অনেকটাই নিচু। এসব এলাকায় পানি জমে গেছে। পাড়া-মহল্লার রাস্তাগুলোর পানির নিচে।
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ জামিনুর রহমান জানান, শুক্রবার ভোর তিনটা ৪০ মিনিট থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত টানা বৃষ্টিপাতে ১৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সকালের দিকে কিছুটা বিরতির পর দুপুরে আবারও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









