নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থের উৎস, সরকারের অর্থায়ন সক্ষমতা এবং এর সামষ্টিক অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় সরকারের রাজস্ব আহরণের কৌশল, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বাজেট ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক ঋণ পরিকল্পনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থায়ন নিয়েও আলোচনা করবে সংস্থাটি।
এ লক্ষ্যে আগামীকাল রবিবার ১৬ জুলাই আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সফরের প্রথম দিন অর্থ বিভাগের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম বৈঠকে রাজস্বনীতি, বাজেট, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। দ্বিতীয় বৈঠকের পুরোটা জুড়ে থাকবে নবম জাতীয় পে-স্কেল, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং এ খাতে চলতি অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চলতি বাজেটে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। জুলাই থেকেই এটি কার্যকর হয়েছে। অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আইএমএফের সঙ্গে বৈঠকে সরকারের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং নবম পে-স্কেলের অর্থায়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। সরকারের আশা, এসব আলোচনার ভিত্তিতে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে। এ অর্থ বাজেটের অপ্রত্যাশিত ব্যয় খাতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গভাবে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। আগামী অর্থবছরের মধ্যে ধাপে ধাপে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফ জানতে চাইছে, রাজস্ব আদায়ের বর্তমান ধারা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সরকার কীভাবে অতিরিক্ত এই ব্যয়ের অর্থায়ন করবে এবং এর ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর কী ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রাজস্ব আহরণ। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার দীর্ঘদিন ধরেই কম। অন্যদিকে সরকারি ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে পে-স্কেলের মতো বড় ব্যয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে অর্থায়নের টেকসই উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে বাজেট ঘাটতি বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
আইএমএফের পর্যবেক্ষণেও রয়েছে যে, কয়েক বছর ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। একই সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে, বিনিয়োগে গতি কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন ব্যয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অধিক দক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি।
এমন বাস্তবতায় আইএমএফ জানতে চাইছে, রাজস্ব আদায়ের বর্তমান ধারা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি ও কমে যাওয়া প্রবৃদ্ধির মধ্যে অতিরিক্ত এই ব্যয় অর্থনীতির ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করবে এবং সরকার তা কীভাবে মোকাবিলা করবে। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রাজস্ব আহরণ। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার অনেক কম। অন্যদিকে সরকারি ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে পে-স্কেলের মতো বড় ব্যয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়ে যাবে।
চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং ই-হেলথ কার্ড কর্মসূচি চালুর ঘোষণাও আইএমএফের আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। সরকারি বেতন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে একযোগে ব্যয় বাড়লে তার সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়েও সরকারের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইবে প্রতিনিধি দল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন ঋণ কর্মসূচি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার উদ্যোগ নয়; বরং রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, জ্বালানি নিরাপত্তা, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কারকে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত কর্মসূচি হিসেবে এটি বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও এর সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সরকারের ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজস্ব বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকলেই আইএমএফের আস্থা অর্জন সহজ হবে।
নীতিনির্ধারণী মহলের অভিমত, নতুন ঋণ পাওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে আইএমএফের প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়ন। কারণ রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এবং নতুন ঋণ কর্মসূচির সফলতা।
উল্লেখ্য, বিদ্যমান ঋণচুক্তি থেকে সরে এসে বর্তমান সরকার আইএমএফের কাছে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি নতুন ঋণ কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় অর্থনৈতিক সংস্কার, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, রাজস্ব সংস্কার এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানোর পর ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। এখন ঢাকা সফরে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনার ফলাফলই নির্ধারণ করবে নতুন ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী অগ্রগতি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









