দেশজুড়ে টানা ভারি বর্ষণ, জলাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর কিংবা জেলা-উপজেলার কাঁচাবাজারগুলোতে শাকসবজি, কাঁচামরিচ, মাছ, ডিমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। উৎপাদন এলাকা থেকে সময়মতো পণ্য সংগ্রহ ও বাজারে সরবরাহ করতে না পারা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পচনশীল পণ্যের ক্ষতির আশঙ্কাকে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, বৃষ্টির অজুহাতে পাইকারি ও খুচরা বাজারে অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়ানো হচ্ছে। ফলে দৈনন্দিন বাজার খরচ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় আরো ঘাটতি দেখা দেবে। নিত্যপণ্যের বাজারে দামবৃদ্ধির প্রবণতা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন এই খাতসংশ্লিষ্টরা।
চড়া ঢাকার সবজি-কাঁচামরিচ ও ব্রয়লারের দাম
রাজধানীতে টানা দুদিনের অবিরাম বৃষ্টিতে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। আর এই বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে বাজারেও। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে খাদ্যপণ্যের বাজারে। দুদিনের ব্যবধানে কাঁচাবাজারে সবজির দাম কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সেই সঙ্গে কাঁচামরিচের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ টাকা। এ ছাড়া চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ব্রয়লারও। গতকাল সোমবার রাজধানীর কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে নিত্যপণ্যের দামের এই ঊর্ধ্বমুখী চিত্র দেখা গেছে। যদিও বৃষ্টির কারণে বাজারে ক্রেতার সংখ্যা ছিল কম, আবার অনেক দোকান বন্ধও রয়েছে। কিছু দোকানের মধ্যে পানি উঠতে দেখা গেছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, কেজি দরে করলা ৬০ থেকে ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৫০ থেকে ৬০ টাকা, পটল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, কচুরমুখী ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, বেগুন প্রকারভেদে ৮০ থেকে ১২০ টাকা, কচুর লতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, হাইব্রিড ধুন্দল ৬০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। টমেটো প্রকারভেদে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২২০ টাকা, প্রতি পিস ফুলকপি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, বাঁধাকপি ৬০ টাকা এবং লাউ ৬০ থেকে ৮০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এর বাইরে কাঁচামরিচ প্রতি কেজি ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া পেঁপে ৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, দেশি শসা ১০০ টাকা এবং হাইব্রিড শসা ৬০ টাকা, আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এক হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকায়। দেশি ধনে পাতা ২৫০ টাকা এবং হাইব্রিড ধনেপাতা ১৮০ কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, কাঁচা কলা হালি বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়, চাল কুমড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা পিস দরে বিক্রি হচ্ছে। আঁটি প্রতি লালশাক ১৫ থেকে ২০ টাকা, লাউশাক ৪০ টাকা, পুঁইশাক ৪০ টাকা এবং দুই আঁটি ডাঁটাশাক ও কলমিশাক ৩০ ও ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত সপ্তাহের মতোই সোনালি কক মুরগি ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা এবং সোনালি হাইব্রিড মুরগি ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১৩০০ টাকা কেজি দরে। স্বস্তি নেই মাছের বাজারেও। বিক্রেতাদের দাবি, সরবরাহ কমে যাওয়ায় গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় সব ধরনের মাছের দাম বেড়েছে। বাজারে সরবরাহ ঘাটতি থাকায় প্রতি কেজিতে মাছের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বড় তেলাপিয়া ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, ছোট তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২২০ টাকা, রুই সাইজ ভেদে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, পাঙাশ ২০০ টাকা, কৈ মাছ ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া অন্যান্য মাছের মধ্যে টেংরা ও শিং ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, পোয়া মাছ ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং পাবদা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। বোয়াল মাছ প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, বড় কাতল ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, চিংড়ি আকারভেদে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ মাছ কেজি দরে ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ মাছ কেজি দরে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে অল্পসংখ্যক ক্রেতা এসেছেন বাজারে। বুলবুল নামে এক ক্রেতা বলেন, বাসায় মাছ-মুরগি নেই। তাই বৃষ্টির মধ্যে বাজারে এসেছি। গত সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগি কিনেছি ১৭০ টাকা কেজিতে কিন্তু আজ ১৯০ টাকা কেজি দরে নিতে হয়েছে। মাছের দামও কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা করে বেড়েছে। মাছ বিক্রেতা মোহাম্মদ আলী বলেন, বৃষ্টির কারণে মাছের সরবরাহ কম। এ কারণে দাম বেড়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় প্রতি কেজি মাছ প্রকারভেদে ৩০ থেকে ৫০ টাকা করে বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। মালিবাগ বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঢাকায় একটু বৃষ্টি হলেই বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দেয়। দুদিন আগে যে পেঁপে ৪০ টাকায় কিনেছি, আজ চাচ্ছে ৬০ টাকা। আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টানা বর্ষণে নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ, বাড়ছে জনভোগান্তি
দেশজুড়ে টানা ভারি বর্ষণের প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরের কাঁচাবাজারে শাকসবজি, কাঁচামরিচ, মাছ, ডিম এবং কয়েকটি কৃষিপণ্যের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অতিবৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন এলাকা থেকে পাইকারি বাজারে পণ্য পৌঁছাতে সময় বেশি লাগছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হওয়ায় পাইকারি বাজারে দর বেড়েছে এবং সেই প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়ছে।
অন্যদিকে ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, প্রতিদিন একই পরিমাণ বাজার করতে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্ষাকালে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে মূল্যবৃদ্ধি হওয়া অস্বাভাবিক নয়, তবে দীর্ঘসময় ধরে এমন অবস্থা চললে বাজারে আরো অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। রাজধানীর বেসরকারি চাকরিজীবী মামুন ইসলাম জানান, “মোহাম্মদপুরে ভাড়া বাসায় থাকি, অফিস ঢাকার তেজগাঁওতে গত কয়েকদিনের ভারি বর্ষণে রাস্তার এমন পরিস্থিথিতি যে বাস , রিকশা , সিনএনজিসহ যে কোনো যানবাহনে সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারছি না। পাবলিক বাস ও যানজট এড়াতে সিনএনজি বা রিকশার কথা চিন্তা করলে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে যাতায়াত সম্ভব হয় না। একে তো সীমিত আয় তার ওপর আবার নিত্যপণ্যের দাম বেশি সব মিলিয়ে সংসার চালানো মুশকিল হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকা কঠিন হয়ে যাবে।’
ঢাকার কাঁচাবাজারে মূল্যবৃদ্ধির স্পষ্ট চিত্র
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজার, হেমায়েতপুর, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মালিবাগ, খিলগাঁও এবং উত্তরার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ কাঁচা পণ্যের সরবরাহ আগের তুলনায় কম। ভোরে যেসব ট্রাক কৃষিপণ্য নিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করে, সেগুলোর অনেকগুলোই বিলম্বে পৌঁছাচ্ছে। ফলে পাইকারি বাজারে লেনদেনের গতি কমে যাচ্ছে এবং দামও বাড়ছে। মোহাম্মদপুর নবোদয় হাউজিং বাজারের খুচরা সবজি বিক্রেতা খোকন হোসেন বলেন, ‘প্রতিদিন নতুন দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। একদিন আগে যে পণ্য নির্দিষ্ট দামে কিনেছি, পরদিন সেটির পাইকারি দামই বেড়ে যাচ্ছে। এতে বাধ্য হয়ে খুচরা মূল্যও সমন্বয় করতে হচ্ছে। আমরা বাধ্য হচ্ছি পণ্যের দাম বৃদ্ধি করতে। এতে ক্রেতাদের সাথে বাকবতিণ্ডাও হচ্ছে কিন্তু আমরা নিরুপাই হাঁটুপানির মধ্যে দিনভর বৃষ্টিতে ভিজে কষ্ট করছি, কিন্তু যখন ক্রেতারা খারাপ ব্যবহার করে তখন খুব খারাপ লাগে। আমরা গরিব মানুষ সরকার সাধারণ জনগণ যদি আমাদের দিকে না দেখে আমরা কিভাবে জীবন যাপন করব। বাজারে আসা ক্রেতা ছানাউল্লাহ বলেন, মাসিক আয় একই থাকলেও বাজারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সংসারের বাজেট বৃদ্ধি করতে হচ্ছে। মাছ বা মাংসের পরিবর্তে কম দামের খাদ্যপণ্য বেছে নিচ্ছি। সবজি কেনার পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছি। আগে ভ্যানগাড়ি থেকে বাজার করতাম এখন বৃষ্টির কারণে তাদের পাই না। স্থায়ী বাজারে আসলে দাম স্বাভাবিকের থেকে বেশি, যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য অনেক ভোগান্তির ব্যাপার।
উৎপাদন এলাকা থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে সৃষ্টি হয়েছে চাপ
দেশের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান অঞ্চলে টানা বর্ষণের কারণে কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও পরিবহনে সমস্যা দেখা দিয়েছে। অনেক জমিতে পানি জমে থাকায় শ্রমিকরা সময়মতো সবজি তুলতে পারছেন না। আবার কোথাও অতিরিক্ত আর্দ্রতায় শাকসবজি দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। ফলে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ না হলেও বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্ষাকালে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মাঠ থেকে আড়ত পর্যন্ত পণ্য নিরাপদে ও দ্রুত পৌঁছে দেওয়া। এই শৃঙ্খলের যে কোনো একটি ধাপে সমস্যা দেখা দিলেই তার প্রভাব বাজারে পড়ে।
বর্তমানে ঠিক সেই পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। বগুড়ার কৃষক ও বিভিন্ন নিত্যপণ্যের ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান জানান, ‘উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি ফসলের ক্ষতির ঝুঁকিও বেড়েছে। এতে একদিকে আমাদের মতো কৃষকের লাভ কমছে, অন্যদিকে ভোক্তাকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। বর্ষণের কারণে দেশের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়েছে। কোথাও পানি জমে যানজট সৃষ্টি হয়েছে, আবার কোথাও রাস্তার ক্ষতির কারণে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর ফলে পরিবহন খাতেও বেড়েছে খরচের পরিমাণ। একই দূরত্বে পণ্য পৌঁছাতে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে। জ্বালানি ব্যয়ও বেড়েছে। পচনশীল কৃষিপণ্য দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো না গেলে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। সেই ঝুঁকি বিবেচনায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। আর অতিরিক্ত এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত বাজারদরের সঙ্গে যুক্ত হয়। উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ সংকট—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ দ্রুত বাড়ে। এভাবে এলোমেলো হচ্ছে দেশের পুরো অর্থনীতির ভিত্তি।
বিভাগীয় ও জেলা শহরের বাজারেও একই চিত্র
রাজধানীর বাইরে বিভাগীয় ও জেলা শহরের বাজারগুলোতেও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন কাঁচাবাজারে শাকসবজি, কাঁচামরিচ, মাছ ও ডিমের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। উৎপাদন এলাকা থেকে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং পরিবহন বিলম্বিত হওয়ার কারণে পাইকারি বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য আসছে না। বিশেষ করে যেসব জেলার সঙ্গে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের যোগাযোগ তুলনামূলক দীর্ঘ, সেসব এলাকায় পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে। অনেক ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্ষাকালে এমন পরিস্থিতি মাঝেমধ্যে তৈরি হলেও টানা বৃষ্টিপাত দীর্ঘ হলে বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কিছুটা সময় লাগে।
বিভিন্ন মৌসুমি সবজি চাষি মো. ইসমাইল বলেন , অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে শুধু বর্তমান ফসলই নয়, ভবিষ্যৎ উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিভিন্ন এলাকায় জমিতে দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় সবজির গাছ নষ্ট হওয়া, পচন ধরা এবং রোগবালাই বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন। ফলে উৎপাদন কমে গেলে বা ফসল নষ্ট হলে তাদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বেড়ে যায়। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এখন কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং আবহাওয়াভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা আরো জোরদার করা প্রয়োজন।
পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমে বেড়েছে দাম, সীমিত আয়ের মানুষের বেড়েছে কষ্ট
নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। সীমিত আয়ের মানুষ প্রতিদিনের বাজারে এসে আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক পরিবার ব্যয় কমাতে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনছে। কেউ মাছ কেনার পরিবর্তে ডিম কিনছেন, আবার কেউ বিভিন্ন ধরনের সবজি কম পরিমাণে কিনে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। বাজারে আসা অনেক ক্রেতার মতে, আয়ের তুলনায় বাজারের ব্যয় দ্রুত বাড়লে পারিবারিক বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গার্মেন্টস কর্মী মমতাজ বেগম বলেন, ‘আমি একটি গার্মেন্টসে কাজ করি। মাসে যে বেতন পাই, তা দিয়ে বাসা ভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা আর সংসারের সব খরচ চালাতে হয়। কিন্তু কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর বাজারে এসে দেখি প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বিশেষ করে শাকসবজি, কাঁচামরিচ, ডিম আর মাছের দাম অনেক বেশি। আগে এক হাজার টাকায় কয়েক দিনের বাজার হয়ে যেত, এখন সেই টাকায় দুই-তিন দিনের বেশি চলে না। বাধ্য হয়ে অনেক জিনিস কম কিনতে হচ্ছে। মাছ-মাংস তো আগেই কম খেতাম, এখন ডিম কিনতেও দুবার ভাবতে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে নিয়মিত কাজে যেতেও কষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় ভিজে কারখানায় যেতে হয়, আবার যানজটের কারণে বাড়ি ফিরতেও দেরি হয়। কিন্তু আয় তো বাড়েনি, বরং খরচই বেড়ে গেছে। আমাদের মতো গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই বাজারে যেন নিয়মিত নজরদারি থাকে, যাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিত্যপণ্যের দাম চলে না যায়।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









