লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামাল দীর্ঘ ১৮ বছরের এক অবিশ্বাস্য কাকতালীয় বৃত্ত পূরণ করে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে একে অপরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। আজ রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বসেরার মুকুটের লড়াইয়ে নামবে মেসির আর্জেন্টিনা ও ইয়ামালের স্পেন।
২০০৭ সালে বার্সেলোনার এক চ্যারিটি ক্যালেন্ডারের ফটোশুটে মাত্র ৬ মাস বয়সী শিশু ইয়ামালকে কোলে নিয়ে গোসল করিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী তরুণ মেসি। সেই ভাইরাল ছবির প্রায় দুই দশক পর ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় মঞ্চে এই দুই প্রজন্মের তারকার লড়াইকে ফুটবল বিশ্ব দেখছে এক ‘ব্যাটন বদল’ বা ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে। ৩৯ বছর বয়সী ফুটবল কিংবদন্তি মেসি যেখানে নিজের শেষ বিশ্বকাপে ব্যাক-টু-ব্যাক শিরোপা নিশ্চিত করতে লড়ছেন, সেখানে সদ্য ১৯ বছরে পা দেওয়া বার্সেলোনা তারকা ইয়ামাল স্পেনের হয়ে নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায়।
সেই ছবির ১৮ বছর পর...
ফাইনালের আগে আলোচনায় দেড় যুগের আগের এক ছবি। যেখানে আট মাস বয়সী লামিন ইয়ামালকে গোসল করাচ্ছেন লিওনেল মেসি। সময়ের পরিক্রমায় এবারের বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ দিয়ে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হবেন তারা দুজন! অনেকের কাছে এটা ভাগ্য। আবার কারো চোখে এটা যেন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে ফুটবলের উত্তরাধিকার হস্তান্তরের মুহূর্ত। কোনো ফুটবল ম্যাচে এই প্রথম দেখা হবে লা মাজিয়ার জাদুকর মেসি এবং ছোট্ট জাদুকর ইয়ামালের।
মেসির মহাতারকা হয়ে ওঠার শুরুটা বার্সেলোনায়। অসংখ্য রেকর্ড, কীর্তি গড়া আর্জেন্টিনা অধিনায়কই স্পেনের এই ক্লাবের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়। তার ১০ নম্বর জার্সি এখন পরেন ইয়ামাল। অনেকেই স্প্যানিশ তারকার মাঝে দেখেন মেসির ছায়া। বার্সেলোনার হয়ে লা লিগায় তিনটি শিরোপা জিতেছেন ইয়ামাল। স্পেনের হয়ে জিতেছেন ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। এই বয়সেই ক্লাব ও দেশের আক্রমণের প্রাণ তিনি।
ফিনালিস্সিমায় দেখা হতে পারত মেসি ও ইয়ামালের। ইরান যুদ্ধের জন্য কাতারে সেই ম্যাচ শেষ পর্যন্ত আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। কিছু দিন আগে ডিএজেডএনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই ছবির প্রসঙ্গে ধরে মেসির বিপক্ষে ফাইনালে খেলার সম্ভাবনা নিয়ে বলেন ইয়ামাল। তাঁর ভাষায়, ‘আমি কিছুটা বড় হয়েছি, লিওরও বয়স বেড়েছে। যেহেতু ফিনালিস্সিমা হয়নি, আশা করি ফাইনালে লিওনেল মেসির বিপক্ষে খেলতে পারব।’ সেই চাওয়া পূরণ হচ্ছে লামিনের। কেবল তিনি একাই নন বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাজিয়ায় বেড়ে ওঠা স্পেন দলের অন্য সতীর্থরাও ফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হতে চেয়েছিলেন।
২০০৮ সালে বার্সেলোনার চ্যারিটি ক্যালেন্ডারে ছাপা হয় ওই ছবি। বিস্মৃতির আড়ালে চাপা পড়া ছবি সামনে আনেন ইয়ামালের বাবা। তিনি ইনস্টাগ্রামে আপলোড করার পর কেউ কেউ ভেবেছিলেন, এআই দিয়ে তৈরি! পরে সামনে আসে পেছনের ঘটনা। ফিফার একটি অনুষ্ঠানে ওই ছবি নিয়ে বলেন মেসি। তাঁর ভাষায়, ‘সত্যি বলতে, ওই ছবিটা পাগলাটে, কারণ জীবন এমনই। ওই ছবি তোলার সময় সে ছিল শিশু, আর এখন আমি তার বিপক্ষে ফাইনালে খেলব। এটা পাগলাটে। সে এখন বিশ্বের সেরাদের একজন। তার জন্য শুভ কামনা। তার জন্য যেটা ভালো, সেটা বার্সেলোনার জন্যও ভালো। আমরা একটা ভালো ম্যাচ খেলার চেষ্টা করব যেন সে নিজের সেরা খেলাটা খেলতে না পারে।’
ওই ছবির ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফর্তের মতে, কোনো অঙ্কের অর্থই এমন একটি ছবির জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি মনে করেন, ঘটনাচক্রে ওই ছবি সম্ভব হয়েছিল। বলেন, ‘ভাগ্য তাদের একসঙ্গে নিয়ে এসেছিল। এই ছবি অন্য যে কোনো খেলোয়াড়ের সঙ্গে হতে পারত। কিন্তু এটা হলো লিওর সঙ্গে। নিশ্চিতভাবেই যদি ওই শিশুর পরিবারের পছন্দ করে নেওয়ার সুযোগ থাকতো তাহলে ছবিটা হতো রোনালদিনিয়ো, চাভি কিংবা ইনিয়েস্তার সঙ্গে।’ মেসির বিদায়ের পর বার্সেলোনার মূল দলে আসেন ইয়ামাল। তার সঙ্গে খেলার সুযোগ না হলেও তাকে দূর থেকে অনুসরণ করার কথা বললেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক, ‘সে অসাধারণ একজন খেলোয়াড়। আমি তাকে অনুসরণ করি, কারণ সে এমন ক্লাবের হয়ে খেলে যেটাকে আমি ভালোবাসি। তার বয়স কেবল ১৯। তার সামনে পড়ে আছে পুরো ফুটবল ক্যারিয়ার।’
‘মেসির শেষ বিশ্বকাপ? আমি কীভাবে জানব!'
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সে যেভাবে মাঠ মাতাচ্ছেন লিওনেল মেসি, তাতে একটা প্রশ্ন উঠছে জোরেশোরেই, পরের বিশ্বকাপেও কি খেলবেন ফুটবলের এই মহানায়ক। উত্তরটা জানা নেই আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিরও। হাসতে হাসতে বললেন, তার কোনো ধারণাই নেই এই ব্যাপারে। এখনও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আভাস দেননি মেসি। ফাইনালের পর হয়তো জাতীয় দল নিয়ে নিজের ভাবনা পরিষ্কার করতে পারেন তিনি। তবে কাতার আসরের পর থেকে বলে আসছেন, যত দিন উপভোগ করবেন এবং ফিটনেস থাকবে দেশের হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন তিনি। কাতার বিশ্বকাপে ‘শেষের আভাস’ দিয়েছিলেন মেসি।
বিশ্বকাপ জয়ের পর বলেছিলেন, সুন্দর এই সময়টা জাতীয় দলের সতীর্থদের সঙ্গে যতটা সম্ভব উপভোগ করতে চান তিনি। উপভোগের সেই মন্ত্রে ওই আসরের পর জিতেছেন একটি কোপা আমেরিকা। এবার আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি। ম্যাচের আগের দিন স্কালোনির সংবাদ সম্মেলনে এলো মেসির পরের বিশ্বকাপে খেলার প্রসঙ্গ। সেখানে স্পষ্ট কোনো উত্তর দিলেন না আর্জেন্টিনা কোচ। বললেন, ‘এটা কি মেসির শেষ বিশ্বকাপ? আমি কীভাবে জানব!
আমার কোনো ধারণা নেই। আমরা এটা নিয়ে কোনো কথা বলিনি। সে কখনও আমাদের অবাক করা থামায় না। ৩৯ বছর বয়সে ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া, আমি মনে করি এটা অবিশ্বাস্য। তার কাজের মূল্যায়ন আমাদের করতে হবে… সে এমন কিছু করেছে, যা কয়েক বছর আগে সম্ভব হবে কেউ ভাবতে পারেনি। এই পর্যায়ে আসাটা, এই পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করাটা সহজ নয়। আশা করি আমরা জিতব, যদি নাও জিততে পারি তবুও সে সবার জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









