উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নতুন একটি লঘুচাপের প্রভাবে অতিভারি বৃষ্টি, পাহাড়িঢল ও অস্বাভাবিক জোয়ারের জলোচ্ছ্বাসে উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমের ১০টি জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে ফের বন্যার আভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। জেলাগুলো হচ্ছে, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল। লঘুচাপের প্রভাবে থেমে থেমে বৃষ্টি, দমকা হাওয়া এবং অস্বাভাবিক জোয়ারের জলোচ্ছ্বাসে বরিশাল, ভোলা ও বরগুনা জেলার উপকূলীয় চর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সব মিলিয়ে ওই ১৩টি জেলায় নতুন করে বন্যার প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করায় দেশের চারটি সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর সতর্কতা সংকেত বহাল রেখেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এদিকে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে গতকাল শনিবার কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ের ১৬টি গেট ছয় ইঞ্চি করে খুলে দেওয়া হয়েছে।
লঘুচাপের প্রভাবে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়িঢলে টানা আটদিনের ভয়াবহ বন্যার পর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট (একাংশ) জেলায় ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ওই জেলাগুলোতে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়িঢলে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৫৯ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন আরও ৪০ জন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে, সেখানে স্থানীয় ও রোহিঙ্গাসহ ৩২ জন মারা গেছেন।
এবারের এই বন্যায় চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়ক, রাঙামাটি- খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক সড়ক ও রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের কোনো কোনো স্থানে পাহাড় ধসে রাস্তার ঢালাই উঠে গেছে। কোথাও কোথাও ধসে পড়েছে সড়ক রক্ষার দেয়াল। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে সরকার। এ পর্যন্ত ত্রাণ হিসেবে নগদ পাঁচ কোটি ১৫ লাখ টাকা, ৯ হাজার ৫০ টন চাল, ৪ হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং গৃহ নির্মাণে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বাড়ছে নদ-নদীর পানি, শঙ্কা বন্যার
গতকাল শনিবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, কুশিয়ারা নদীর সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি স্টেশনে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা দুটির পিয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, সারি গোয়াইন ও ভোগাই নদীর উজানে ভারতের মেঘালয়ে অতিভারি বৃষ্টি হয়েছে। সুনামগঞ্জে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়িঢলের প্রভাবে সুরমাসহ জেলাটির অন্য প্রধান নদ-নদীগুলোর পানির স্তরও বাড়ছে। লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিও বাড়ছে।
ফলে আজ রবিবার থেকে সংলগ্ন জেলাগুলোতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে অথবা বিদ্যমান পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। এছাড়া আগামী সোমবার থেকে বুধবার (২০-২২ জুলাই) পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার কিছু স্থানে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও প্লাবিত হতে পারে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ওই ১০টি জেলার বিভিন্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হওয়ায় বানের পানি ঢোকার শঙ্কাও তীব্র হচ্ছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নিয়মিত বুলেটিন বলছে, গতকাল শনিবার সকাল নয়টায় কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলিতে ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। সর্বশেষ ২৪ সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল বেড়েছে, যা আগামী সোমবার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এসময়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জে নদী লাগোয়া নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। ভারতের মণিপুর রাজ্যের আঙ্গামি নাগা পাহাড় থেকে সৃষ্ট বরাক নদী সিলেট সীমান্তে এসে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুটি ধারায় বিভক্ত হয়েছে। এ দুই নদী কিশোরগঞ্জের ভৈরববাজারের কাছে মিলিত হয়ে মেঘনা নদী গঠন করেছে, যা মিশেছে বঙ্গোপসাগরে।
এদিকে পিয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, সারি গোয়াইন ও ভোগাই নদীর উজানে ভারতের মেঘালয়ে অতি ভারি বৃষ্টি হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের বুলেটিনের তথ্য অনুসারে, ২৪ ঘণ্টায় মাউসিনরামে ৩৪৯ মিলিমিটার, আর কে এম সোহরায় ২৮০, চেরাপুঞ্জিতে ২৫২ ও মাওফ্লাংয়ে ৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এ সময়ে ভারতের দক্ষিণ ত্রিপুরার বিলোনিয়ায় ১০০ এবং অরুণাচলের পাসিঘাটে ৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বুলেটিন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল থাকলেও আগামী সোমবার পর্যন্ত বাড়তে পারে। আজ রবিবার থেকেই এসব নদীর কিছু স্থানে বিপৎসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে পারে। ফলে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।
সুনামগঞ্জে বন্যার ঝুঁকি বেশি: সুনামগঞ্জে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানির স্তর বাড়ছে। ২৪ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়েছে। ছাতকে সর্বোচ্চ ৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া লাউরেরগড়ে ৫৮ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জ সদরে ৫২ মিলিমিটার এবং দিরাইয়ে ২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল নয়টা পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, জেলার কোথাও নদীর পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের বন্যা পরিস্থিতি বুলেটিনে জানানো হয়েছে, ছাতক পয়েন্টে সুরমা নদীর পানির স্তর রয়েছে ৮ দশমিক ৪৮ মিটার, যা বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার নিচে। একই নদীর সুনামগঞ্জ সদর পয়েন্টে পানির স্তর ৭ দশমিক ৩২ মিটার, যা বিপৎসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার নিচে অবস্থান করছে। এ ছাড়া শক্তিয়ারখলার লাউরেরগড় পয়েন্টে যাদুকাটা নদীর পানির স্তর রেকর্ড করা হয়েছে ৭ দশমিক ২৪ মিটার, যা বিপৎসীমার ৮১ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। দিরাই পয়েন্টে কালনী নদীর পানির স্তর ৫ দশমিক ৯৮ মিটার, অর্থাৎ বিপৎসীমার ৫৭ সেন্টিমিটার নিচে। অন্যদিকে জগন্নাথপুর ও সোলেমানপুর পয়েন্টে পানির স্তর যথাক্রমে ৬ দশমিক ৫১ ও ৬ দশমিক ৪৪ মিটার হলেও এ দুটি পয়েন্টের জন্য কোনো বিপৎসীমা নির্ধারণ করা হয়নি। পাউবো জানিয়েছে, উজানের এলাকায় ভারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় আগামী দিনগুলোতে নদ-নদীর পানির স্তর আরো বাড়তে পারে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বরিশাল বিভাগে চর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে থেমে থেমে বৃষ্টি, দমকা হাওয়া এবং অস্বাভাবিক জোয়ারের জলোচ্ছ্বাসে বরিশালসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলার উপকূলীয় চর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। টানা চারদিন ধরে বিভাগের অধিকাংশ নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় লঞ্চ ও ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে (চলাচলের পথ) ও পন্টুনও পানিতে তলিয়ে গেছে। যাত্রীদের ঝুঁকি নিয়ে নৌযানে ওঠানামা করতে হচ্ছে।
বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের বাইরে বসবাসকারী অসংখ্য পরিবারের ঘরবাড়িতে হাঁটুসমান পানি ঢুকে পড়েছে। চরবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জাহিদুল আলম বলেন, কীর্তনখোলা নদীর তীরে ভাঙারপাড় পর্যটন এলাকায় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিনদিন ধরে অস্বাভাবিক জোয়ারে দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাঁধের বাইরে বসবাসকারী পরিবারগুলোও চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
বরগুনার তালতলী উপজেলার তুতুলবাড়িয়া, খোট্টারচর, জয়ালভাঙ্গা ও ছোট অংকুজানপাড়া এলাকার বাঁধের বাইরে বসবাসকারী অন্তত ৭০০ পরিবারও জোয়ারের পানিতে ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ায় নৌকায় করে মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে এবং স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
খোট্টারচর এলাকার ফিজলা বেগম বলেন, ‘আইজ চাইর দিন ধইরা দিন-রাইতের দুইবার জোয়ারে ঘরদুয়ারে কোমরসমান পানি ওঠে। তাই বাড়ি ছাইড়া পরিবার লইয়্যা বান্দার (বাঁধ) ঘরকূলে আশ্রয় নিচ্ছি। এখন মোগো রান্দা-খাওয়াও প্রায় বন্ধ।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, শুক্রবার সন্ধ্যার জোয়ারে বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর পানি বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার, ভোলার তেঁতুলিয়া নদীর খেয়াঘাট পয়েন্টে ২৬ সেন্টিমিটার, দৌলতখান পয়েন্টে মেঘনা নদীর পানি ৪৭ সেন্টিমিটার এবং তজুমদ্দিন পয়েন্টে ১ দশমিক ২৭ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এছাড়া ঝালকাঠির বিষখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার, বরগুনার পাথরঘাটা পয়েন্টে ৩০ সেন্টিমিটার, বরগুনা সদর পয়েন্টে ২৭ সেন্টিমিটার, পিরোজপুরে বলেশ্বর নদে ২২ সেন্টিমিটার এবং বরগুনার আমতলী পয়েন্টে পায়রা নদের পানি তিন সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। গতকাল শনিবার দুপুরের জোয়ারেও নদীগুলো ফের ফুঁসে ওঠে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে এবারই প্রথম একসঙ্গে এতগুলো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
এদিকে, পানি বাড়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ভোলার ইলিশা লঞ্চঘাটে। প্রবল জোয়ারে ঘাটের সব পন্টুন তলিয়ে গেছে। যাত্রীদের অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে ওঠানামা করতে হচ্ছে। ঢাকা থেকে যুবরাজ-৭ লঞ্চে ইলিশা ঘাটে আসা শাহজাহান মিয়া বলেন, পন্টুন ডুবে যাওয়ায় ব্যাপক ভোগান্তি হচ্ছে। যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ঘাটটি উঁচু জায়গায় স্থানান্তর করা উচিত।
ভোলা নদীবন্দরের কর্মকর্তা নির্মল কুমার রায় বলেন, শুক্রবার বিকেলের শেষ জোয়ারে পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে উঠে যাওয়ায় ঘাটের সব পন্টুন তলিয়ে যায়। এতে প্রতিদিন চলাচলকারী প্রায় ৩০টি লঞ্চের আনুমানিক ৫০ হাজার যাত্রী দুর্ভোগে পড়ছেন। কয়েক দিন ধরেই এই পরিস্থিতি চলতে থাকায় যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রবল জোয়ারের সময় অস্থায়ীভাবে ঘাট সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বরগুনার পায়রা নদের আমতলী-বরগুনা ফেরিঘাট এবং বিষখালী নদীর বরইতলা-বাইনচটকি ফেরিঘাটের উভয় প্রান্তেও গ্যাংওয়ে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে ফেরি পারাপারেও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো যাত্রী।
৪ বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল
উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করায় গতকাল শনিবারও দেশের ৪ সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর সতর্কতা সংকেত বহাল রেখেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্যের প্রভাবে সমুদ্র বন্দরসমূহ, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। সেই শঙ্কা থেকে আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কবার্তায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। এদিন সকাল ৯ টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে।
খুলে দেওয়া হলো কাপ্তাইয়ের ১৬টি গেট: রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গতকাল শনিবার কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ের ১৬টি গেট ৬ ইঞ্চি করে খুলে দেওয়া হয়েছে। কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান বলেন, গেট খুলে দেওয়ায় বাঁধের ১৬টি স্পিলওয়ে দিয়ে হ্রদের ৯ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে কর্ণফুলী নদীতে। কর্ণফুলীর অববাহিকা হয়ে এই পানির শেষ গন্তব্য বঙ্গোপসাগরে। বর্তমানে কাপ্তাই লেকে ১০৪.০৯ ফুট মিনসি লেভেল (এমএসএল) পানি রয়েছে। কাপ্তাই বাঁধের সর্বোচ্চ পানির ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুট এমএসএল হলেও ১০৮ ফুটকে বিপদসীমা হিসেবে ধরা হয়। পানির ইনফ্লো বেশি হলে স্পিলওয়ের গেইট খোলার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য মতে, কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৫টি ইউনিট দিয়ে ২২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এসব ইউনিট থেকে আরও ৩২ হাজার কিউসেক পানি হ্রদ থেকে কর্ণফুলী নদীতে নিষ্কাশিত হচ্ছে।
নিহত বেড়ে ৫৯ জন: গতকাল শনিবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো প্রতিবেদন অনুসারে, বন্যা, পাহাড়িঢল ও পাহাড়ধসে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ– এই সাত জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব জেলার ৫৬টি উপজেলা এবং ৩৭৪টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা পানিবন্দি বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যে বলা হয়েছে, নিহত ৫৯ জনের মধ্যে কক্সবাজারে ৩২ জন, চট্টগ্রামে ১৬ জন, বান্দরবানে সাতজন, রাঙ্গামাটিতে তিনজন এবং মৌলভীবাজারে একজন রয়েছেন। আহতদের মধ্যে কক্সবাজারে ২৫, চট্টগ্রামে ১২ জন, বান্দরবানে দুজন এবং খাগড়াছড়িতে একজন রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সাতটি জেলায় মোট ৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে বর্তমানে ২৯৮ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
ত্রাণ বিতরণে সবচেয়ে বেশি সহায়তা পেয়েছে চট্টগ্রাম। জেলাটিতে নগদ ৭৫ লাখ টাকা, এক হাজার ২০০ টন চাল, এক হাজার বান্ডিল ঢেউটিন, গৃহ নির্মাণে ৩০ লাখ টাকা, ৪৬ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, গোখাদ্য, শিশুখাদ্য এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অতিরিক্ত ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারে ৪০ লাখ টাকা নগদ, ৪৫০ টন চাল, এক হাজার বান্ডিল ঢেউটিন, ৩০ লাখ টাকা গৃহ নির্মাণ সহায়তা, গোখাদ্য, শিশুখাদ্য এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। খাগড়াছড়িতে ২৫ লাখ টাকা নগদ, ৪০০ টন চাল, গোখাদ্য, শিশুখাদ্য, ৫৪৬ বান্ডিল টিন, গৃহ নির্মাণে ১৫ লাখ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। রাঙামাটিতে ৩০ লাখ টাকা নগদ, ৫০০ টন চাল, ৫০০ বান্ডিল ঢেউটিন ও গৃহ নির্মাণে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বান্দরবানে ২৫ লাখ টাকা নগদ, ৪০০ টন চাল, শিশু ও গোখাদ্য এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মৌলভীবাজারে ১৫ লাখ টাকা নগদ, ২০০ টন চাল, ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন ও গৃহ নির্মাণে ছয় লাখ টাকা এবং হবিগঞ্জে ১০ লাখ টাকা, ২০০ টন চাল ও প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৭ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ধাপে ধাপে এসব বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সাতটি জেলায় দুই কোটি ৩০ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ৩৫০ টন চাল, চার হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং গৃহ মজুরির এক কোটি ২৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বাকি ৫৭ জেলার জন্যও সাধারণ ত্রাণ হিসেবে ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ও ৫ হাজার ৭০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দেশের সর্বমোট ৬৪ জেলার জন্য পাঁচ কোটি ১৫ লাখ টাকা ও ৯ হাজার ৫০ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পৃথকভাবে নগদ অর্থ ও চাল বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যেন প্রয়োজন দেখা দিলে দ্রুত সহায়তা দেওয়া যায়। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজন অনুযায়ী আরো ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হবে।
রাঙামাটিতে ধ্বংসচিহ্ন: এদিকে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় প্লাবিত আটটি জেলায় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে সড়ক, সেতু, বেড়িবাঁধ, কৃষিজমি, মৎস্য খামার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। তবে, এসব খাতে ক্ষতিগ্রস্ত মোট জেলার সংখ্যা ৪৩টি। এর মধ্যে টানা বৃষ্টি ও পাহাড় ধসে রাঙামাটির সড়কগুলোতে প্রায় ১০ কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার তথ্য দিয়েছে জেলা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর।
তাদের হিসাবে, জেলার ছয়টি সড়কের ২৬টি স্থানে ২ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়ক, রাঙামাটি- খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক সড়ক ও রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের কোনো কোনো স্থানে পাহাড় ধসে রাস্তার ঢালাই উঠে গেছে। কোথাও কোথাও ধসে পড়েছে সড়ক রক্ষার দেয়াল। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্যমতে, রাঙামাটির পাঁচ উপজেলায় ৬০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরমধ্যে জেলার কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া, কলমপতি ও ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের ২৫ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া লংগদু সদর ইউনিয়নে ৫ কিলোমিটার, বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা ও বাঘাইছড়ি ইউনিয়নে ১০ কিলোমিটার, কাপ্তাইয়ে ১০ কিলোমিটার ও রাজস্থলী উপজেলার বাঙালহালিয়া ইউনিয়নে ১০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া রাজস্থলীতে দুইটি কালর্ভাট পানির স্রোতে ভেসে গেছে। এলজিইডির রাঙামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী আহামদ শফি বলেন, বরকল ও বিলাইছড়িতে বন্যা হলেও ওইসব এলাকায় এলজিইডির গ্রামীণ সড়ক নেই। ক্ষতিগ্রস্ত ৬০ কিলোমিটার সড়ক মেরামতে এলজিইডির ১ কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলে সড়কের কাজ শুরু হবে। জেলা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বলেন, কোনো সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সড়ক অবকাঠামোর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় নয় কোটি টাকা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









