দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বহুদা বিভক্ত কওমি ধারার ইসলামি রাজনৈতক দলগুলোর মধ্যে নতুন মেরুকরণের আভাস দেখা দিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে ছড়িয়ে থাকা কওমিভিত্তিক দলগুলোকে এবার এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নিয়েছে ধর্মভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত, বিএনপি ও স্বতন্ত্র—এই তিন ধারায় বিভক্ত হয়ে নির্বাচন করায় কওমি অঙ্গনে শুধু রাজনৈতিক বিভাজনই তৈরি হয়নি, বরং তার প্রভাব পড়েছে মাদ্রাসা পরিচালনা, সাংগঠনিক সম্পর্ক এবং আলেম-ওলামাদের পারস্পরিক অবস্থানেও। এ বাস্তবতায় কওমি ধারার সাতটি নিবন্ধিত ইসলামি দলকে নিয়ে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, এখনো নতুন রাজনৈতিক জোটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, প্রক্রিয়া সফল হলে জামায়াত ও বিএনপি—উভয় বলয়ের রাজনীতিতেই এর প্রভাব পড়তে পারে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে এক মতবিনিময় সভায় এ বিষয়ে প্রাথমিক ঐকমত্য গড়ে ওঠে। সভায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারাও।
সভাসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিটি দলকে আগামী আগস্টের শুরুতে নিজ নিজ ফোরামে আলোচনা করে লিখিত প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে পরবর্তী বৈঠকে সম্ভাব্য ঐক্যের কাঠামো, নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপন্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। হেফাজতের লক্ষ্য আপাতত নতুন দল গঠন নয়; বরং কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমিয়ে একটি সমন্বিত অবস্থান তৈরি করা।
হেফাজতের নেতারা মনে করছেন, এ উদ্যোগের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা। ওই নির্বাচনে কওমি ধারার দলগুলো কার্যত তিনটি রাজনৈতিক বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নেয়। অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্বাচন করে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন বণ্টন নিয়ে মতবিরোধের কারণে জামায়াতের জোট ছেড়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়। খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোটও স্বতন্ত্র অবস্থান গ্রহণ করে। ফলে কওমি ঘরানার রাজনৈতিক শক্তি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
হেফাজত-সংশ্লিষ্ট নেতাদের দাবি, এই বিভক্তি নির্বাচনী রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা এবং মাদ্রাসাকেন্দ্রিক বিরোধও বেড়ে যায়। বিশেষ করে কয়েকটি কওমি মাদ্রাসার পরিচালনা ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে মতবিরোধ প্রকাশ্যে চলে আসে। হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, এ পরিস্থিতি কওমি অঙ্গনের সামগ্রিক ঐক্যকে দুর্বল করেছে।
সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক কারণের পাশাপাশি আদর্শিক বিষয়টিও এ উদ্যোগের অন্যতম ভিত্তি। দেওবন্দি ধারার আলেমদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদীর চিন্তাধারার সমালোচনা করে আসছেন। তাঁদের মতে, কওমি মাদ্রাসায় জামায়াতের আদর্শিক প্রভাব বৃদ্ধি পেলে আকিদাগত অবস্থান ও মাদ্রাসার স্বকীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণেই কওমি ধারার দলগুলোকে একটি স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্মে সংগঠিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন হেফাজতের নেতারা।
বৈঠক সূত্র জানায়, আলোচনায় রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও খোলামেলা মতবিনিময় হয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, কওমি ধারার দলগুলোকে জামায়াতের রাজনৈতিক বলয় থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। এর জবাবে অন্য কয়েকটি দলের প্রতিনিধিরা বলেন, যদি জামায়াতের জোট ছাড়ার প্রশ্ন ওঠে, তাহলে জমিয়তকেও বিএনপির রাজনৈতিক বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আলোচনার একপর্যায়ে জমিয়তের প্রতিনিধিরা জানান, অন্য দলগুলো জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করলে তারাও বিএনপির সঙ্গে নিজেদের অবস্থান নতুন করে বিবেচনা করতে প্রস্তুত।
যদিও বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা প্রকাশ্যে এটিকে কোনো ‘আল্টিমেটাম’ বলতে রাজি নন, হেফাজত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বক্তব্য, নতুন অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম কার্যকর করতে হলে বিদ্যমান রাজনৈতিক জোট থেকে দলগুলোকে বেরিয়ে আসতেই হবে। ফলে রাজনৈতিক মহলে বিষয়টিকে জামায়াত ও বিএনপি— উভয় বলয়ের ওপর পরোক্ষ চাপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মীর ইদ্রিস এদিনকে বলেন, ‘আগে হেফাজতের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ পরিবেশ ছিল। কিন্তু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দল ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে চলে যাওয়ায় তৃণমূলে কাদা ছোড়াছুড়ির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ কারণেই হেফাজতের আমির সবাইকে নিয়ে বসেছেন। প্রতিটি দলকে লিখিত মতামত দিতে বলা হয়েছে। এরপর পরবর্তী বৈঠকে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে।’ তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত সমন্বিতভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তার সাথে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও
মোটামুটি একমত। দলটির মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘সাতটি দল আপাতত ঐক্যবদ্ধভাবে থাকার বিষয়ে একমত হয়েছে। কীভাবে সেই ঐক্য বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে প্রতিটি দলের কাছে লিখিত মতামত চাওয়া হয়েছে। হেফাজতের আমির চান, দলগুলো নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখুক।’ এ নিয়ে কথা হয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমানের সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘সাতটি দলের আকিদা-বিশ্বাসে অনেক মিল রয়েছে। তাই একটি ঐক্যের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব। সেই ঐক্যের কাঠামো কেমন হবে, তা পরবর্তী বৈঠকেই নির্ধারিত হবে।’
কিছুটা ভিন্ন কথা বলছেন জামায়াত জোটের নির্বাচনী সঙ্গী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতারা। দলের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘এই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল কওমি ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমানো। এখনো নতুন কোনো রাজনৈতিক জোট গঠনের সিদ্ধান্ত হয়নি।’ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমীও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করছে। কীভাবে ঐক্য দীর্ঘস্থায়ী করা যায়, সে বিষয়ে লিখিত প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে। কার্যকর ঐক্য গড়ে তুলতে কিছুটা সময় লাগবে।’
বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেন, ‘মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক বিরোধ বাড়ানো নয়, বরং কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমানো। রাজনৈতিক জোট গঠনের বিষয়টি সময়সাপেক্ষ হলেও নীতিগতভাবে সবাই একসঙ্গে চলার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে।’
হেফাজতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এক প্রভাবশালী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কওমি অঙ্গনের অধিকাংশ আলেম ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের আদর্শিক অবস্থানের সমালোচক। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় কয়েকটি দল জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ায় বিভ্রান্তি ও অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে। সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে কওমি ধারার নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ হবে না। কারণ সাতটি দলের প্রত্যেকটির রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংগঠনিক স্বার্থ এবং নির্বাচনী কৌশল এক নয়। কেউ জামায়াতের সঙ্গে, কেউ বিএনপির সঙ্গে, আবার কেউ স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থানে থেকে নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছে। একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সবাইকে একত্র করা বড় ধরনের সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
তারপরও হেফাজতের এ উদ্যোগকে কওমি ধারার ইসলামি রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আগস্টে দলগুলোর লিখিত প্রস্তাব জমা হওয়ার পরের বৈঠকেই বোঝা যাবে, এ উদ্যোগ কেবল পারস্পরিক সমঝোতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই নতুন একটি রাজনৈতিক জোটের জন্ম দেবে। যদি শেষপর্যন্ত সে ঐক্যই বাস্তবায়িত হয়, তাহলে কওমি ঘরানার ইসলামি রাজনীতির পাশাপাশি দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেও নতুন বাস্তবতার সৃষ্টি হতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম এদিনকে বলেন, রাজনীতিতে জোট গঠন নতুন কিছু নয়। ইসলামি রাজনীতির অন্যতম প্রধান দল হিসেবে জামায়াত ইসলাম অন্যসব ইসলামি দলকেও সবসময় সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে। তাই যে কোনো দল বা সংগঠন নতুন কোনো জোট করলে আমরা বরাবরের মতোই স্বাগত জানাব। কারণ আমরা চাই যে কোনো ফরম্যাটেই হোক, ইসলামী দল ও সংগঠন যেন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বকে সঠিককভাবে পালন করে এবং তাগুতের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থাকে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









