ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ থাকলেও বাংলাদেশ এখনও তার সফর নিশ্চিত করেনি। তবে ভারতের সংবামাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দিল্লি যাচ্ছেন এবং আগামী সপ্তাহেই। কিন্তু ভারতের আরেকটি সংবাদমাধ্যম দ্য ট্রিবিউন দাবি করেছে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন না। ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সম্প্রতি দিল্লিতে তার বিতর্কিত সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য ঘিরে ঢাকায় চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এই সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের আসন্ন ভারত সফর নিয়ে দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দুটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
গতকাল শুক্রবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ট্রিবিউনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন না। গত ১০ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৪৫ মিনিটব্যাপী এক বৈঠকে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে তিনি সরাসরি এই কড়া বার্তা দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অগ্রগতির ওপরই বাংলাদেশ-ভারতের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফরের বিষয়টি ‘পঞ্চাশ-পঞ্চাশ ভাগ’ নির্ভর করছে। এই শর্ত পূরণ না হলে সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনেও তিনি অংশ না-ও নিতে পারেন। তবে ওই বৈঠকের পর ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সাংবাদিকদের জানান, দুদেশের আলোচনায় সমাধান করা সম্ভব নয়, এমন কোনো সমস্যা নেই।
অন্যদিকে, ভারতের আরেক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ঢাকা ও দিল্লির একাধিক সূত্রের বরাতে সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহের দ্বিতীয়ার্ধেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সফরটি বাস্তবায়িত হলে তা হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর এবং দুদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুদিনের এই সফরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ছাড়াও বাণিজ্য, সংযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রস্তুতি ইতিপূর্বে দুই রাজধানীতেই শুরু হয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এখন অবধি তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
বিশ্বের প্রধান উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক জোট ব্রিকস। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ অবশ্য এই জোটের সদস্য নয়। তবে ব্রিকসের নিয়ম অনুযায়ী, আয়োজক দেশ হিসেবে ভারত সদস্যদেশের বাইরেও অন্য দেশগুলোর নেতাদের বিশেষ অতিথি হিসেবে আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানাতে পারে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে গুম ও মানবতাবিরোধী হত্যাকাণ্ডের একাধিক মামলা রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে দিল্লিকে আনুষ্ঠানিকভাবে একাধিকবার অনুরোধ করে ঢাকা। অনুরোধ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দিল্লিও। তবে দিল্লির বক্তব্য হলো, অনুরোধটি সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ও আইনগত বিষয় বিবেচনা করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। জুলাইয়েও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছিল।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র গণমাধ্যমকে বলেছেন, জাতিসংঘ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে আগামী ২৭ বা ২৮ অগাস্ট যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তার আগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারত সফরে যোগ দেবেন।
মোদী-তারেকের সম্ভাব্য প্রথম বৈঠক
এনডিটিভি লিখেছে, নরেন্দ্র মোদী ও তারেক রহমানের সম্ভাব্য বৈঠকের দিকে বিশেষ নজর থাকবে দুই দেশেরই। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতকেও নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করতে হচ্ছে। গত নির্বাচনের পর থেকে দিল্লি ও ঢাকা দুই তরফেই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে বিভিন্নভাবে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও কিছুটা বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এপ্রিলে নয়াদিল্লি সফর করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে ১০ অগাস্ট ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা এসেছে; তবে সেজন্য ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির ওপর জোর দিয়েছে ঢাকা। আর এর অংশ হিসেবে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখার বিষয়টি আলোচনায় আসছে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ‘বড় ইস্যু’
এনটিভি লিখেছে, ভারত সফরে তারেক রহমানের আলোচনায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ভারত বলে আসছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা ‘যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায়’ পর্যালোচনা করছে। তবে ভারত তাকে ফেরত দেবে, তেমন সম্ভবনা দেখছেন না অধিকাংশ বিশ্লেষক। গত ৫ অগাস্ট দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেওয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল ঢাকা। দিল্লির সাউথ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে সেদিন অডিও কলে যুক্ত হন শেখ হাসিনা। তিনি সেখানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দেন।
অনুষ্ঠানটির আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, এটি একটি বেসরকারি সংগঠনের আয়োজন এবং এতে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আর ওই অনুষ্ঠানে যে মতামত প্রকাশ করা হতে পারে, ভারত সরকার তাতেও কোনো সমর্থন দিচ্ছে না। কিন্তু তারপরও দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন হতে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশ সরকার। ‘দণ্ডিত পলাতক আসামিকে’ বক্তৃতার সুযোগ করে দেওয়াকে সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে।ঢাকার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ১০ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয় নতুন ভারতীয় হাই কমিশনার ত্রিবেদীর।
ওই বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চাওয়ার পাশাপাশি তাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখতে বলেছে ঢাকা। ‘সংশ্লিষ্ট সূত্রের’ বরাত দিয়ে এনডিটিভি লিখেছে, তারেক রহমান ও ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকেও শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক যাতে এই একটি প্রশ্নে আটকে না যায়, সে জন্য বিষয়টি কীভাবে আলোচনায় আনা হবে, তাও উভয় সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পানি, বাণিজ্য ও সীমান্ত
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা প্রসঙ্গের পাশাপাশি আরও বেশ কিছু অমীমাংসিত সমস্যা রয়েছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য বৈঠকে বাণিজ্য ও ট্রানজিট, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও পরিবহন যোগাযোগও রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হলে এসব ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থাকবে।
পানি বণ্টনও দুই দেশের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। ১৯৯৬ সালে সই হওয়া গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আসছে ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। সে কারণে স্বাভাবিকভাবেই চুক্তি নবায়নের আলোচনা বৈঠকে গুরুত্ব পাবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক ভারতের জন্যও জরুরি। দুই দেশের অভিন্ন সীমান্তের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে এর যোগাযোগও নয়াদিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









