বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি বাংলাদেশের ‘খুব গুরুত্ব সহকারে’ নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। তিনি বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে, এয়ারবাসের অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতামূলক অফার রয়েছে। এটিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত এবং আমরা এয়ারবাস ও বিমানের মধ্যে খুব দ্রুত আলোচনা সমাপ্তির প্রত্যাশা করছি।’
গতকাল রবিবার ইইউ রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ইইউর বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক, অশুল্ক বাধা দূর করা এবং ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে মাইকেল মিলার বলেন, ‘আমরা সব ক্ষেত্রে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির অনুরোধ করছি । আপনি যদি কোনো সরকারি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নে, তা যেন বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে নেওয়া হয় এবং আমাদের কোম্পানিগুলো যেন যে কোনো দেশের কোম্পানির সাথে তাদের সাধ্যমতো সর্বোত্তম প্রতিযোগিতা করতে পারে।’
বৈঠকে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব ও বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
‘ভালো অফার’, বললেন বাণিজ্যমন্ত্রী
এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকেও মাইকেল মিলার অশুল্ক বাধা দূর করার পাশাপাশি বাংলাদেশে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জোর দিয়েছিলেন। ইইউয়ের পক্ষে তখন ৬১টি অশুল্ক বাধার কথা বলা হয়েছিল। গতকালের বৈঠক শেষে সরকার ছয় মাসে এর মধ্যে ৪৮টি দূর করেছে বলে দাবি করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই করা বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) কার্যকর হওয়ার আগেই সেখান থেকে এলএনজি, গম কেনার মতো সিদ্ধান্ত নিতে কোনো চাপ রয়েছে কি না এমন প্রশ্নে বাণিজ্যমন্ত্রী ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘ভালো অফার’ বিবেচনায় সেসব কেনায় সরকার সায় দিয়েছে। এক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক মূল্য বিবেচনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মুনাফা ও অপচয়ের মতন বিষয় আমলে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে চিহ্নিত ৪৮টি অশুল্ক বাধা (নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার) সমাধান করা হয়েছে। আরও ১৩টি বাধা সমাধানের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে অশুল্ক বাধা নিয়ে ইইউর পক্ষ থেকে আগে যেসব অভিযোগ করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে ৪৮টির সমাধান করা হয়েছে। আরও ১৩টি বিষয়ে সমাধানের প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন লজিস্টিক কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন, বাণিজ্যিক স্যাম্পল আমদানির বার্ষিক সীমা ১০ হাজার মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার মার্কিন ডলারে উন্নীত করা এবং রপ্তানি পণ্যের ‘ট্রেসিবিলিটি’ নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত স্ক্যানিং স্মার্ট কার্ডের শুল্কায়ন জটিলতা দূরীকরণ এবং যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের বিষয়গুলোও তুলে ধরেন তিনি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রপ্তানি গন্তব্য। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে এ বছরের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন আমরা তিন বছর পেছানোর জন্য আবেদন করেছি। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের দুইটা—মানে এই প্রসেসের দুইটা প্রক্রিয়া আমরা শেষ করেছি, এই প্রক্রিয়ার দুইটা ধাপ আমরা অতিক্রম করেছি ইউএন সিডিপি আর ইকোসক।’ তিনি বলেন, আর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এটা উত্থাপিত হলে আমরা আশা করছি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সম্মতি পাব। এটাই তাদের সমর্থন।’
একজন সাংবাদিক বলেন, ‘ইদানীং ইউএস থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু ইমপোর্ট করছে এবং ইউএস’র সাথে একটা ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করেছি, যেটি এনফোর্সমেন্টে যায় নাই এবং সেটা পার্লামেন্টেও তোলা হয় নাই। কিন্তু তার পরেও আমরা ইউএস থেকে অনেক কিছু ইমপোর্ট করছি।…সেটা কি কোনো ফোর্স করা হচ্ছে নাকি আমরা উইলিংলি আনছি?’। জবাবে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘রিগার্ডলেস অব এআরটি (দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি)। এআরটি চুক্তি থাকুক বা না থাকুক, বাংলাদেশের এলএনজি প্রয়োজন। এলএনজির জন্য তো আমরা বিশ্বের সব জায়গায় সোর্স করি। আমেরিকান একটা কোম্পানি অফার করেছে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ১১৭টা কার্গো দেবে। এবং যেদিন আমরা ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে এটি অনুমোদন দিয়েছি, সেই দিনের ইনডেক্সের বেসিসে এই পুরা ১১৭ কনটেইনারের এভারেজ প্রাইস দাঁড়াত নয় ডলার করে। তো আমাদের কাছে সেটা একটা ভালো অফার মনে হয়েছে, আমরা সেটা অনুমোদন করেছি।’
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গম কিনি আমরা আমেরিকা থেকে। সেই গমের অন্যান্য সোর্স থেকে আমরা যে গম আনি, তার তুলনায় সেই গমের ওয়েস্টেজ পার্সেন্টেজ অনেক কম। তো সেটাকে যদি আপনি ভ্যালুতে ট্রান্সলেট করেন, তাহলে সেটা লাভজনক। এইভাবে যখন কোনো পণ্য কেনার ব্যাপার আসে, তখন জাস্ট অন দ্য ফেইস অব ইট যদি আপনি প্রাইসিং করেন, তাহলে সেই প্রাইসিংটা প্রপার হবে না। এটার অপচয়, এটার লং টার্ম বেনিফিট—এগুলি চিন্তা করে প্রাইসিং করতে হয় ‘ তিনি বলেন, ‘তো আমরা যে সমস্ত ক্রয় করি—আমেরিকা বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা অন্য যে জায়গা থেকেই, চীন বা ভারত যে জায়গা থেকেই পারচেজটা করি—অন ইটস ওন মেরিট আমরা চেষ্টা করি, আমাদের বেস্ট জাজমেন্ট অ্যাপ্লাই করতে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিনদিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই করে। চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ১৩১টি শর্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছয়টি শর্ত মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে খবর এসেছে। ট্রাম্পের বাড়তি সম্পূরক শুল্ক এড়াতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হওয়া আলোচিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে বিএনপি সরকার দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কেনায় সায় দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সইয়ের লক্ষ্যে আলোচনা শুরুর উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইইউর সঙ্গে এফটিএ ( মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি) স্বাক্ষরের বিষয়ে আলোচনা শুরুর জন্য শিগগিরই আলোচনা শুরু হতে পারে।
ব্রিফিংয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউর সমর্থন চাওয়া হয়েছে। তিনি আশা করেন, ইইউ বাংলাদেশের প্রস্তাব সমর্থন করবে। ভোটে বা ভোট ছাড়া যেভাবে হোক বাংলাদেশ মনে করেন এই প্রস্তাব অনুমোদন হবে। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে চলতি মাসে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে ইইউর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ চায় ইইউ
বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে এয়ারবাস নিয়েও কথা বলেন ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। তিনি আরো জানান, এ সপ্তাহের শেষ দিকে ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
নানা আলোচনার মধ্যে ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে গত ৩০ এপ্রিল মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এসব উড়োজাহাজ কিনতে খরচ পড়বে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা (১ ডলারে ১২২ টাকা ৭৩ পয়সা হিসাবে)। ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে এই এয়ারক্রাফটগুলো বিমানকে সরবরাহ করবে বোয়িং। বাংলাদেশের কাছে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ বেচার কথা সম্প্রতি এক এক্স পোস্টে তুলে ধরেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর। সেখানে তিনি এক নতুন চুক্তির কথা বলেন।
গোর বলেন, ‘চলতি সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আরেকটি অসাধারণ চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তাদের প্রাথমিক ক্রয়াদেশের চেয়ে অনেক বেশি। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বোয়িং কিনতে রাজি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি দিয়ে ধন্যবাদও জানান।
ট্রাম্প বলেন, ‘বোয়িং আপনাকে হতাশ করবে না, আমিও বিষয়টি ভুলব না। এ বিষয়ে মনোযোগের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। খুব বেশি দিন নয়, অদূর ভবিষ্যতেই আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রত্যাশা করছি।’
একই দিনে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনছে এবং আরও উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। তবে জুলাই গণআন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের চাপের মধ্যে শেষ পর্যন্ত বিমানের ক্রয়াদেশ গেছে বোয়িংয়ের ব্যাগে। তবে ইউরোপীয়দের চাপে তাদের কোম্পানি এয়ারবাস থেকেও এখন উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









