কাগজে-কলমে আছে, বাস্তবে নেই কার্যক্রম; বরিশাল বিভাগে এমন সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে সমবায় অধিদপ্তর। এক বছরে নানা অনিয়ম ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে ১৬৪টি সমবায় সমিতির নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও প্রায় ২২০টি সমিতিকে রাখা হয়েছে নিবন্ধন বাতিলের সম্ভাব্য তালিকায়।
সমবায় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান নয়, যেসব সমিতির কার্যক্রমে অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোকেও নিয়মিত অডিট ও নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, নিবন্ধন বাতিলের পাশাপাশি গ্রাহকের অর্থ সুরক্ষিত রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বরিশাল বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে বিভাগে ১৬৪টি সমবায় সমিতির নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে পিরোজপুরেই বাতিল হয়েছে ৮১টি। এছাড়া বরগুনায় ৪৩টি এবং বরিশালে ৪০টি সমিতির নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।
বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়ের মহিলা পরিদর্শক বীনা পানি হালদার জানান, নিবন্ধন বাতিলের প্রক্রিয়ায় থাকা সমিতির সংখ্যাও কম নয়। ঝালকাঠিতে ৫০ থেকে ৬০টি, বরিশালে ৩০টি, পটুয়াখালীতে ২০টি, বরগুনায় ৬০টি এবং ভোলায় ৫০টি সমিতিকে সম্ভাব্য তালিকায় রাখা হয়েছে।
তার ভাষ্য, তালিকাভুক্ত অনেক সমিতির বাস্তবে কোনো কার্যক্রম নেই। কোথাও নেই গ্রাহকও। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু নিবন্ধনের কাগজে টিকে ছিল। ফলে যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।
শুধু নিবন্ধন বাতিল নয়, বরিশাল বিভাগে ৩৫১টি সমবায় সমিতিকে অবসায়নে ন্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ৩৫০টি এবং পিরোজপুরে একটি সমিতি রয়েছে।
বীনা পানি হালদার বলেন, অবসায়নে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকির পাশাপাশি গ্রাহকদের পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। দেনা-পাওনা নিষ্পত্তির পর সমিতিগুলোর আইনি অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বরিশাল বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়ের যুগ্ম নিবন্ধক (ভারপ্রাপ্ত) আতিকুল ইসলাম জানান, বর্তমানে বরিশাল বিভাগে নিবন্ধিত সমবায় সমিতির সংখ্যা ৬ হাজার ৭৮৩টি।
জেলাভিত্তিক হিসাবে বরিশালে ১ হাজার ৮০৬টি, ভোলায় ১ হাজার ৪৫১টি, পটুয়াখালীতে ১ হাজার ২৭৬টি, পিরোজপুরে ৯৭২টি, বরগুনায় ৭৪৫টি এবং ঝালকাঠিতে ৫৩৩টি সমবায় সমিতি রয়েছে।
আতিকুল ইসলাম বলেন, সব সমিতিই সমবায় কার্যালয়ের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। নিয়মিত অডিটের ব্যবস্থাও আছে। তবে শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের তদারকি থাকলেই অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। সমিতি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সততাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি স্বীকার করেন, সমবায় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সবাই যে সৎ এমন দাবি করার সুযোগ নেই। একইভাবে সমিতি পরিচালনাকারীদের মধ্যেও অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি থাকতে পারেন।
বরিশাল বিভাগের সমবায় খাতের সাম্প্রতিক সংকটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার ‘আরামকাঠি সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতি’। সমবায় কার্যালয়ের হিসাবে, প্রায় ৫২ কোটি টাকার জটিলতায় পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
যুগ্ম নিবন্ধক আতিকুল ইসলাম বলেন, সমিতিটির মালিক রহমতুল্লাহ পালিয়ে যাননি। তিনি কারাগারে ছিলেন এবং এখনও সমবায় কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তার ৫২টি জমির দলিল জব্দ করা হয়েছে। সমিতির অর্থে গড়ে তোলা গরুর খামার ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে বলে জানান তিনি।
সমবায় কর্মকর্তার ভাষ্য, উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হতো। এক লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে মাসে পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়ার কথা বলা হতো। এতে অনেক মানুষ সেখানে টাকা রাখেন।
কিন্তু সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন লোকসানি প্রকল্পে বিনিয়োগের পর সংকট তৈরি হয়। এখন গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে সমবায় কার্যালয়। জব্দ করা জমি বিক্রি করে অর্থ ফেরতের চেষ্টা থাকলেও সেগুলোর প্রত্যাশিত মূল্য না পাওয়ায় সেই পথও সহজ হচ্ছে না।
আরেকটি জটিলতা তৈরি হয়েছে ঋণগ্রহীতাদের নিয়ে। সমিতি বন্ধ হয়ে গেলে ঋণ পরিশোধের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সমবায় কার্যালয়।
নথিতে সমিতিটির গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩০০ দেখানো হলেও প্রকৃত গ্রাহক সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
যুগ্ম নিবন্ধক জানান, কোনো সমিতির নিবন্ধন হঠাৎ করে বাতিল করা হয় না। নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সমিতিকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়। সাধারণত পাঁচ থেকে ছয়বার নোটিশ দেওয়ার পরও কার্যক্রম স্বাভাবিক না হলে নিবন্ধন বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
আতিকুল ইসলাম জানান, চলতি অর্থবছরেও আরও বেশ কিছু সমবায় সমিতির নিবন্ধন বাতিল হতে পারে। তার মতে, বিভাগে সমবায় সমিতি নিয়ে সমস্যার দিক থেকে পিরোজপুরকে বিশেষভাবে নজর দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত লাভের আশায় কোনো সমিতিতে অর্থ বিনিয়োগের আগে গ্রাহকদের সতর্ক হতে হবে। সমিতির নিবন্ধন, কার্যক্রম ও আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে প্রয়োজনে সমবায় কার্যালয়ে এসে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।’
আতিকুল ইসলাম দাবি, চলতি কিংবা গত অর্থবছরে গ্রাহকদের টাকা নিয়ে কোনো সমবায় সমিতি উধাও হয়ে যাওয়ার তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে কোনো সমিতির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা কার্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বরিশাল বিভাগে অনেক ভালো ও কার্যকর সমবায় সমিতিও রয়েছে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ সমবায় সমিতির নিয়মকানুন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করে বিপাকে পড়েন।
বরিশালের গবেষক দেবাশীষ চক্রবর্তী মনে করেন, অনিয়ম ও আর্থিক সংকটের কারণে শহরাঞ্চলে সমবায় সমিতিগুলোর ওপর মানুষের আস্থা অনেকটাই কমেছে। তবে গ্রামাঞ্চলে এখনো এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম রয়েছে।
তার অভিযোগ, কিছু প্রতারক ও অসাধু ব্যক্তি সমবায় সমিতির নিবন্ধন নিয়ে নানা অপকর্ম করছেন। অনেক ক্ষেত্রে সমিতি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না হলেও গ্রাহকদের অর্থ আটকে যাচ্ছে কিংবা অর্থ ফেরত না পাওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।
দেবাশীষ চক্রবর্তী বলেন, এ ধরনের ঘটনা চলতে থাকলে সমবায় সমিতি ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে। তাই নিবন্ধনের পর নিয়মিত অডিট, আর্থিক লেনদেনের কঠোর নজরদারি এবং গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় সমবায় দপ্তরের তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, একদিকে নিষ্ক্রিয় ও অনিয়মে জড়িত সমিতির নিবন্ধন বাতিল করছে সমবায় কার্যালয়, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক সমিতিকে রাখা হয়েছে নজরদারির আওতায়। তবে যেসব সমিতিতে সাধারণ মানুষের অর্থ জড়িত, সেগুলোর ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাতিলের পাশাপাশি গ্রাহকদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









