রাষ্ট্রের অন্যতম সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় ও কূটনীতির কেন্দ্রস্থল গুলশানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের হঠাৎ ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাসভবন এবং বিদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলোর নাকের ডগায় এমন নিরাপত্তা ভেদ করে ঝটিকা মিছিল কিভাবে সম্ভব হলো—তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন, যার রেশ ধরে এরই মধ্যে গুলশান জোনের ডিসি ও থানার ওসির প্রত্যাহারসহ চলছে নানা উচ্চপর্যায়ের বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ এখন বলতে গেলে ‘বায়বীয়’ পর্যায়ে আছে। যার কারণে তাদের ধরাও যাচ্ছে না, আবার এত বড় দল হওয়ায় সবার মধ্যেই একটা জুজুর ভয় কাজ করছে। বিশেষ করে তাদের ঝটিকা মিছিলে বিপাকে পড়ছেন সংশ্লিষ্ট থানা বা জোনের পুলিশ কর্মকর্তারা।
গতকাল বুধবার ডিএমপির পৃথক আদেশে গুলশান জোনের ডিসি তানভীর আহমেদ ও গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই আকস্মিক ঘটনা কি নিছক গোয়েন্দা দুর্বলতা, নাকি আসন্ন রাজনৈতিক সমীকরণের কোনো গভীর ইঙ্গিত? শুধু গুলশানের ডিসি-ওসি নয়, পুরো ডিএমপির ডিসি-এসি ও ওসিসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা এখন আতংকে। বদলি-ক্লোজসহ শাস্তিমূলক নানা ভয়ে আছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বরত পুলিশ কর্তারা। তাছাড়া পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে ইতিমধ্যে কঠোর বার্তা দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে- কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের নেতা-কর্মীরা যেখানে কার্যক্রম চালাবে, সেই থানার এবং জোনের পুলিশ কর্তারা দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুরো ঘটনার পটভূমি ও গোয়েন্দা তথ্যের ধোঁয়াশা নিয়ে সাজানো হয়েছে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
জানা গেছে, রাজধানীর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের মিছিলকে কেন্দ্র করে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদ ও গুলশান মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেনকে। গতকাল বুধবার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকে ডিএমপি সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের সই করা এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এম তানভীর আহমেদকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক কারণে ঢাকা মেট্রোপলিটন সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হলো। একই দিন গুলশান মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। ওসির প্রত্যাহার আদেশে বলা হয়, প্রশাসনিক কারণে ১৬ সেপ্টেম্বর পূর্বাহ্নে ডিএমপি সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে দাউদ হোসেনকে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হলো।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর গুলশান থানাধীন ৩ নম্বর সড়কের কেএফসি-সংলগ্ন সড়কে মিছিল করে কার্যক্রমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে গেলে মিছিলকারীরা পুলিশের দিকে ককটেল নিক্ষেপ করে। এ সময় হাতেনাতে দুজনকে গ্রেফতার ও পাঁচটি ককটেল উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার পর এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ঝটিকা মিছিলের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। ওই সময় ছড়িয়ে পড়ে গুলশান থানার ওসিকে বদলি করা হয়েছে, তবে সেটি ছিল ভুয়া। তবে ঘটনার এক সপ্তাহ পেরুনোর আগেই শেষ পর্যন্ত সরানো হলো দাউদ হোসেনকে।
ঢাকার গুলশান শুধু রাজধানীর অভিজাত এলাকাই নয়- রাষ্ট্রের ক্ষমতা, কূটনীতি ও নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাসভবন, বিদেশি কূটনৈতিক মিশন এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বসবাসের কারণে এই এলাকার নিরাপত্তা সবসময়ই থাকে বিশেষ নজরদারিতে। কিন্তু সেই গুলশানেই হঠাৎ প্রকাশ্যে একটি মিছিল বের করে ফেলল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকশো মানুষ। দুপুর বেলায় মিছিল হলো, স্লোগান হলো, আবার দ্রুত সরে গেলেন অংশগ্রহণকারীরা। যেন ‘হিট অ্যান্ড রান’কৌশলে নিরাপত্তার বলয়কে চ্যালেঞ্জ করে দেওয়া হলো বার্তা। প্রশ্ন উঠছে, এত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে গুলশানের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় এমন একটি মিছিল কিভাবে সম্ভব হলো? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি বিষয়টি আঁচ করতে পারেনি? গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে কি কোনো আগাম তথ্য ছিল না? নাকি তথ্য থাকার পরও কোথাও সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল? আরো বড় প্রশ্ন, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পরপরই এই মিছিল; দুই ঘটনার মধ্যে কি কোনো যোগসূত্র আছে? গুলশানের এই মিছিল আসলে কী বার্তা দিল? আওয়ামী লীগ কি রাজপথের সক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করল? আর এই ঘটনার আড়ালে কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো সমীকরণের ইঙ্গিত রয়েছে?
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এমন তৎপরতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও। তবে ঝটিকা মিছিল নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় বিএনপি। দলটির নেতাদের অভিমত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারে না। কেউ দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। গত শনিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নেতা জানিয়েছেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ভারত থেকে দেশে ফেরার ঘোষণা থাকলেও বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দেশে ফেরার বিষয়টি সামনে রেখে মাঠের রাজনৈতিক তৎপরতা ধরে রাখতে দলটির নেতা-কর্মীরা এখন থেকে নিয়মিত বিরতিতে গোপন মিছিল ও জমায়েতের চেষ্টা করতে পারেন। গুলশানের মিছিলও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে মনে করছেন তারা। এ ধরনের কর্মসূচির পরিধি আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির মধ্যম সারির একাধিক নেতা।
রাজধানীর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য থাকার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে ওই সময় সেখানে মিছিল হতে পারে, পুলিশ তা অনুমান করতে পারেনি বলে দাবি করেছেন তিনি। এ ঘটনাকে পুলিশের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ফজরের নামাজের পর অল্পসংখ্যক লোক নিয়ে মিছিল করে ভিডিও ধারণের মতো ঘটনাও ঘটছে। গুলশানের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুক্রবার জুমার নামাজের সময়কে কেন্দ্র করে কিছু লোক সেখানে জড়ো হয়েছিল। পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গুলশানে মিছিলের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য ছিল। তবে ওই সময় এবং ওই এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে, পুলিশ হয়তো তা ধারণা করতে পারেনি। এ কারণে ঘটনাটিকে গোয়েন্দা বা পুলিশের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।
কী ঘটেছে গুলশানে
গুলশানে এমন কিছু স্থাপনা আছে যা একইসঙ্গে ‘বিশেষ শ্রেণির’গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআই এবং ভিভিআইপি (ভেরি ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন) এলাকা হিসাবে ঘোষিত। এরমধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এ রকম একটি এলাকায় শুক্রবার দুপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুই শতাধিক নেতা-কর্মী মিছিল করেছেন। এ সময় ককটেল বিস্ফোরণেরও ঘটনা ঘটেছে। গুলশান থানার ওসি দাউদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা পৌনে ১২টার দিকে গুলশান- ১ এর ভোলা মসজিদের সামনে থেকে মিছিলটি বের করার চেষ্টা হয়। পুলিশ ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করলে মিছিলকারীরা দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় দুজনকে। উদ্ধার করা হয় পাঁচটি ককটেল।
জমায়েতকারীরা মারমুখী হয়ে উঠলে মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে শটগানের দুই রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। পরে রাতভর অভিযানে আওয়ামী লীগের আরো ৩২ জন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
গুলশানের ঘটনার পর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। ঘটনার পেছনের কারণ, পরবর্তী পদক্ষেপ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে এসব বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের আন্তরিকতা এবং জবাবদিহির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে সরকারের বিরোধী কোনো মহল এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেপথ্য থেকে সহযোগিতা করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গুলশান থানার ওসি দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
তবে কারও কারও মতে, শুধু একজন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করলেই ঘটনার তদন্ত শেষ হওয়া উচিত নয়। ঘটনার পেছনে কী কী কারণ রয়েছে, তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিএমপি ছাড়াও অন্য কোনো সংস্থার সদস্যদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা দরকার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এসি রুমে বসে শুধু সিদ্ধান্ত নিলে হবে না। পুলিশ সদস্যদের চোখের ভাষা বুঝতে মাঠে যেতে হবে। তাদের সাহস দিতে হবে।’তিনি আরো বলেন, ‘নীতিনির্ধারকদের বোঝা উচিত, ৫ আগস্টের পর থেকে স্বস্তিকর সময় যাচ্ছে না। দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা এখনো পুরোপুরি মনোবল ফিরে পাননি। তারা কার জন্য জীবন বাজি রাখবেন? ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কি তাদের সেভাবে আশ্বস্ত করতে পেরেছেন?
মিছিলের আগে গোয়েন্দা তথ্য কী ছিল?
গুলশানের ঘটনার আগে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে জমায়েতের কোনো তথ্য ছিল কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মো. আকতার হোসেন জানিয়েছেন, শুক্রবারের ঘটনায় ১১৮ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরো ৮০ থেকে ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ককটেল বিস্ফোরণসহ রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিল কি না— এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যর্থতার বিষয়ে এখনই কিছু বলার সময় হয়নি। তবে গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এমন ঘটনার পেছনে কারও ব্যর্থতা থাকলে তা তদন্ত করে দেখা হবে। এরই মধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক আবদুল কাইয়ূম বলেন, শুধু গুলশান নয়, দেশের সব ইউনিট, জেলা ও থানা পর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের ওপর নজরদারি বাড়ানো উচিত। এ ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে গিয়ে সুপারভিশন করা জরুরি। এতে পুলিশ সদস্যদের মনোবল বাড়বে। তিনি বলেন, মনে রাখতে হবে, এখন রিল্যাক্স করার সময় নয়। গুলশান-বনানী নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে বিভিন্ন গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নিয়মিত তৎপরতা রয়েছে। এরপরও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এত বড় জমায়েত এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা কিভাবে ঘটল, সেটি তদন্ত করে দেখা জরুরি।
গোয়েন্দাদের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন
এ ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতা আছে কিনা, জানতে চাইলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে “ব্যর্থতার বিষয়ে কিছু বলার এখনি সময় হয়নি।”তবে সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গুলশান-বারিধারা-বনানী খুবই গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। গুলশানে প্রধানমন্ত্রী বসবাস করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও এই এলাকায় বসবাস করতেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতের মতো প্রভাবশালী দেশসহ ঢাকাস্থ প্রায়সব কূটনৈতিক মিশনও এই এলাকায়।”তিনি বলেন, “সশস্ত্রবাহিনীর গোয়েন্দা শাখা, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), গোয়েন্দা পুলিশ–সবাই অ্যাকটিভ আছে। তারপরও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কিভাবে জমায়েত করতে পারল, পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করল, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেনইবা রাবার বুলেট ছুড়তে হলো–এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই স্পষ্ট হবে গোয়েন্দা ব্যর্থতা না-কি অন্য কোনো কারণ নেপথ্যে আছে।”
শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বার হাসান সিজার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে লিখেছেন, “বাংলাদেশের গোয়েন্দারা সভা-সেমিনার-পাঁচ তারকা হোটেলে নজরদারিতে এত বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, মনে হচ্ছে আমাদের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের মিছিল নিয়ে তেমন প্রস্তুতি ছিল না।”তিনি বলেন, “জুলাই পরবর্তী আমার প্রত্যেকবারের ট্রিপে যত সভা সেমিনারে গিয়েছি গোয়েন্দাবাহিনীর লোকজন ছিল, জিজ্ঞেস করলেই বলছে আমরা এজেন্সি থেকে আসছি। হোক তা গুলশানে, ডেইলি স্টারে, হোটেল রূপসী বাংলা অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এমনকি দুই সাংবাদিক কফি পান করলেও ওইটার গোয়েন্দা রিপোর্ট হয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ-এ, আমার কাছে রিপোর্টের কপিও আছে।”মোবাশ্বার হাসান আরো লিখেছেন, “কিন্তু যে এলাকায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী থাকেন সেই এলাকায় এতগুলো মানুষ মিছিল করবে তা এই বাহিনী জানে না, এইটা তো পুরা কমেডি হয়ে যাচ্ছে।”
আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। শুক্রবার রাতেই গুলশানে এ বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রদলের সহ-সভাপতি কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেতের নেতৃত্বে মিছিলটি বের করা হয়। এতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। মিছিল থেকে দেশজুড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অপতৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়।
গত শনিবার সকালে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এ বিষয়ে কথা বলেন ডিসি (মিডিয়া) মো. আকতার হোসেন। তিনি বলেন, শুক্রবারের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১৮ জনের নামে, অজ্ঞাত ৮০ থেকে ১০০ জন। তাদের বিরুদ্ধে ককটেল বিস্ফোরণসহ রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিলো কিনা, জানতে চাইলে আকতার হোসেন জানান, ব্যর্থতার বিষয়ে কিছু বলার এখনি সময় হয়নি। গুলশানের মতো জায়গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মিছিল করায় কারো ব্যর্থতা থাকলেও তা তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানায় পুলিশের এই কর্মকর্তা।
সরকারের দিকে সরাসরি অভিযোগ
আওয়ামী লীগের মিছিলের ঘটনায় সরকারের সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চান বলেই পতিত স্বৈরাচার নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ মিছিল দিতে পারে।’এনসিপিসহ বিরোধী দলগুলোর নেতাদের এমন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সদিচ্ছা ও কঠোরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। শনিবার রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
বিএনপির সঙ্গে আঁতাত করেই আওয়ামী লীগ গুলশানে মিছিল করেছে—জামায়াতে ইসলামীর এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রিজভী বলেন, ‘আমাদের কোনো জাতীয় নেতা তো বলেননি যে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দেব। এটা কারা বলেছিল, সেটা নিশ্চয় দেশবাসী ভুলে যায়নি। সুতরাং কে কার সঙ্গে আঁতাত করছে, সেটা জনগণ জানে। ফলে এসব কথা বলে কোনো লাভ নেই।’ তিনি বলেন, যারা বেআইনি সংগঠন, নিষিদ্ধ সংগঠন—আদালত কর্তৃক তাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সুতরাং বেআইনি যে সংগঠন, তারা প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারে না। সরকারের কনসার্ন যে মিনিস্ট্রি, অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে দেখবে— কারা এর সঙ্গে মিছিল, ঝটিকা মিছিলে জড়িত আছে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে। তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে ভূমিকা রেখেছে, কিছু গ্রেফতারও হয়েছে।
একাধিক জায়গায় সমবেত হওয়ার চেষ্টা
শুক্রবার গুলশানে ঝটিকা মিছিলের পর ভাটারায় সভা করার চেষ্টা করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। তবে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা ওই সভা পণ্ড করে দেন। গুলশানের পাশেই ভাটারা থানার অবস্থান। আগের দিন বৃহস্পতিবার দুপুরে উত্তরা থেকে মিছিলের প্রস্তুতির সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের আরো চার নেতা–কর্মীকে গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা–পুলিশ। ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, “বেলা সোয়া ১টার দিকে উত্তরা পশ্চিম থানার আব্দুল্লাহপুর ফ্লাইওভারের নিচে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা–কর্মীরা মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পরে উত্তরা পশ্চিম থানা–পুলিশের একটি দল সেখানে গিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে মিছিলের একটি ব্যানার জব্দ করা হয়।”
স্বাভাবিক গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিলকে শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবেই দেখা হচ্ছে না। এই ঘটনা প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার সামনে। এটি কি নিছক আকস্মিক ঘটনা, নাকি এর পেছনে ছিল পরিকল্পনা এবং বড় কোনো রাজনৈতিক বার্তা- এসব প্রশ্নও এখন তদন্তকারীদের সামনে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









