মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর কিছু কাজ থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে। কেউ রেখে যান অঢেল সম্পদ, কেউ রেখে যান খ্যাতি; আবার কেউ কেউ নিজের সারাজীবনের অর্জনটুকুও মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করে যান। রাজশাহীর সাংবাদিক সাইদুর রহমান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। জীবনের শেষ সময়ে নিজের জন্য কিছুই জমিয়ে রাখেননি তিনি। বরং মৃত্যুর আগে নিজের সঞ্চিত অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার ইচ্ছা প্রকাশ করে গেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া সেই ইচ্ছা এখন পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। দীর্ঘদিন কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন সাইদুর রহমান। নিয়মিত ভারতে চিকিৎসা নিতেন। শেষপর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রবিবার ২১ সেপ্টেম্বর ভোররাতে মারা যান তিনি। বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।
রাজশাহী প্রেস ক্লাবই ছিল তাঁর ঘরবাড়ি। দিন-রাতের বড় অংশই কাটত সেখানে। ঘর-সংসার করা হয়ে ওঠেনি। ছিল না স্ত্রী কিংবা সন্তান। জীবনের শেষ সময়টুকুও কেটেছে কখনো প্রেস ক্লাবে, কখনো সহকর্মীর বাসায়। অথচ সঞ্চয় ছিল কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। সেই সম্পদও নিজের করে রাখেননি। মৃত্যুর মাত্র দুই মাস আগে সবকিছু গান করে গেছেন মানুষের কল্যাণে। রাজশাহী প্রেস ক্লাবের সদ্য প্রয়াত সভাপতি সাইদুর রহমান তাঁর সম্পদ দিয়ে গেছেন ‘জননেতা আতাউর রহমান ট্রাস্ট‘-এ। তাঁর ইচ্ছা ছিল, এই ট্রাস্টের মাধ্যমে গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো হবে। জীবনের শেষ সিদ্ধান্তটিও তিনি নিয়েছেন মানুষের কথা ভেবেই।
প্রায় দুই বছর ধরে রাজশাহীর সাংবাদিক রাজীব আলী রাতুলের বাসায় থাকতেন সাংবাদিক সাইদুর রহমান। দুই মাস আগে ওই বাসায় বসেই ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ নেন তিনি। সেদিন দুপুরে জরুরি কথা আছে বলে রাতুল ও তাঁর বাবা মাসুদ রানা সরকারকে ডাকেন তিনি। এরপর নিজের ইচ্ছার কথা জানান। রাজীব আলী রাতুল বলেন, ‘সাইদুর রহমান সেদিন বলেছিলেন, আমার তো স্ত্রী-সন্তান নেই। আমার ইচ্ছে—আমার যে সম্পদ আছে তা ট্রাস্টে দিয়ে যাব। গরিব-দুঃখী মানুষের কল্যাণে ওই সম্পদ ব্যয় করা হবে।’ সেদিনই ট্রাস্ট গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। দুই দিন পর মনোনীত সদস্যদের ডেকে নিজের ইচ্ছার কথা জানান সাইদুর রহমান। সবার সম্মতিতে গঠন করা হয় ট্রাস্টের পরিচালনা বোর্ড।
ট্রাস্টের চেয়ারম্যান করা হয়েছে তাঁর বোন আফরোজী রহমান খেলনাকে। সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে সাংবাদিক রাজীব আলী রাতুলের বাবা মাসুদ রানা সরকারকে। সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে রাজশাহী প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী আসলাম-উদ-দৌলা, সাংবাদিক আল-আমিন, সালাহউদ্দিন মিন্টু এবং তাঁর সহকর্মী দৈনিক ভোরের কাগজের বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি মো. জনিসহ ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে।
সাইদুর রহমানের সম্পদের মধ্যে রয়েছে রাজশাহী নগরের পাঠানপাড়ায় ১০ কাঠার একটি প্লট, একটি বাস এবং ব্যাংকে জমানো টাকা। এ ছাড়া ব্যবসা করতে বিভিন্ন মানুষকে প্রায় দুই কোটি টাকা ধার দিয়েছিলেন তিনি। এসবের নথিপত্রও রয়েছে। তাঁর ইচ্ছা অনুসারে এসব সম্পদ ও পাওনা ট্রাস্টের আওতায় নেওয়া হবে। তবে ব্যাংকে ঠিক কত টাকা আছে, তা তিনি কাউকে বলে যাননি। তাঁর ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের কেউ কেউ জানান, ব্যাংকে অন্তত দুই কোটি টাকা আছে। এর মধ্যে মৃত্যুর আগে সম্প্রতি তিনি প্রায় ১৭ লাখ টাকা তুলেছিলেন।
ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও তাঁর বোন আফরোজী রহমান খেলনাও ১৭ লাখ টাকা তোলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে বর্তমানে ব্যাংকে কত টাকা রয়েছে, তা তিনি জানাতে পারেননি। ভাইয়ের রেখে যাওয়া সম্পদের চেয়েও তাঁর রেখে যাওয়া ইচ্ছাটিকেই বড় করে দেখছেন আফরোজী রহমান খেলনা। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই সারাজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। রাজশাহী প্রেস ক্লাবকেই তিনি নিজের ঘরবাড়ি ভেবেছেন। সেখান থেকে বহু মানুষের উপকার করেছেন। মৃত্যুর আগেও তিনি মানুষের কল্যাণে সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে গেছেন।’
সাইদুর রহমান ছিলেন রাজশাহীর একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি। তাঁর বাবা ছিলেন রাজশাহীর সাবেক গভর্নর ও প্রখ্যাত আইনজীবী আতাউর রহমান। মা ভাষাসৈনিক মনোয়ারা রহমান। তাঁর নানা ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী মাদার বখশ। ১৯৬৪ সালের দিকে রাজশাহীর পাঠানপাড়ায় জন্ম নেওয়া সাইদুর রহমান পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল ও রাজশাহী কলেজে। উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন রাশিয়ার মস্কোতে। সেখানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে আশির দশকে দৈনিক করতোয়ার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে কাজ করেছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে। সর্বশেষ কর্মরত ছিলেন দৈনিক ভোরের কাগজে। রাজশাহীর সমস্যা, সম্ভাবনা ও মানুষের কথা উঠে এসেছে তাঁর লেখনীতে। শুধু সংবাদ লেখাতেই থেমে থাকেননি, মানুষের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়েও তাঁকে দেখা গেছে রাজপথে।
নিজের জন্য জমিয়ে রাখা সম্পদ দিয়ে কিছুই করেননি সাইদুর রহমান। মারা যাওয়ার আগে তা মানুষের জন্য রেখে গেছেন। তাঁর সঞ্চয় এখন তাঁর পরিবারের জন্য নয়, অসহায় মানুষের জন্য। আর এভাবেই জীবনের শেষ অধ্যায়ে নিজের অর্জনকে মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করে গেছেন রাজশাহীর এই সাংবাদিক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









