সরকারি চাকরির স্বপ্নটা যেন এবার সত্যি হতে চলেছিল। সব ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতও হয়েছিলেন তারা। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন, যাচাই-বাছাইও শেষ হয়েছে। এরপর শুধু অপেক্ষা ছিল কাঙ্ক্ষিত নিয়োগপত্রটি হাতে পাওয়ার। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলেও হঠাৎ করেই থমকে গেছে সেই স্বপ্ন। হতাশার কালো মেঘে ছেয়ে গেছে মন। নিয়োগপত্র পান নি তারা। কেন তাদের নাম নেই, সেই প্রশ্নেরও মিলছে না স্পষ্ট উত্তর। সরকারি চাকরির স্বপ্ন পূরণের দ্বারপ্রান্তে এসে এমন ঘোর অনিশ্চয়তার অন্ধকারে পড়েছেন এই প্রার্থীরা।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পরীক্ষায় পাস করেও সুপারিশপ্রাপ্ত প্রায় আড়াই হাজার প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। ঠিক কী কারণে তারা নিয়োগপত্র বঞ্চিত হয়েছেন, তা জানেনও না। এখন সরকারের পক্ষ থেকে পুনরায় ভেরিফিকেশনের যে কথা বলা হচ্ছে, এটিকে প্রার্থীরা প্রহসন বলে উল্লেখ করেছেন।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ২০২৫ ব্যাচ’-এর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, আমরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক ব্যাচ-২০২৫। দীর্ঘ আট মাস সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে বেকার থেকে মানবেতর জীবনযাপন করার পর যখন অযাচিতভাবে একজন প্রার্থী ভেরিফিকেশনের নামে প্রহসনে নিয়োগপত্র বঞ্চিত হয় তখন রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার সুস্পষ্টভাবে হরণ করা হয়। এতে আরও বলা হয়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে এক কোটি বেকারের কর্মসংস্থান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু আজ বেকারদের নিয়ে চূড়ান্ত প্রহসন করা হচ্ছে, বেকারত্ব বৃদ্ধি করা হচ্ছে। আমরা চাই না পুনরায় রি-ভেরিফিকেশনের নামে প্রহসন করা হোক। ২৫০০ প্লাস প্রার্থীকে কেন বাদ দেওয়া হলো তার কারণ অজানা। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ আসলে কে, তা আমরা জানি না। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বলে সব দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের, আবার মন্ত্রণালয় বলে জেলা শিক্ষা অফিস মূল দায়িত্বে। আর জেলা অফিস বলে দায়িত্ব অধিদপ্তরের হাতে। আসলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কারা? আমাদের চাওয়া, সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধ ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে সক্রিয়, সনদ জালিয়াতি ছাড়া যোগ্য সবাইকে ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিয়োগপত্র দিতে হবে। না হলে কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবো। আমরা চাই, সব যোগ্যপ্রার্থী আগামী ১ অক্টোবর একসঙ্গে যোগদান করতে।
গতকাল শনিবার নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নির্বাচিত যারা এখনো নিয়োগপত্র পাননি, তাদের বিষয়টি পর্যালোচনা করে ধাপে ধাপে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে। পোস্টে আগামী ১ অক্টোবরের মধ্যে যারা নিয়োগপত্র পাবেন না, তাদের সবার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি প্রযোজ্য হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। ফেসবুক পোস্টে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমরা লক্ষ করছি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ এর নিয়োগপত্র প্রাপ্তি নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, এ প্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে, ১ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কেউ নিয়োগপত্র না পেয়ে থাকলে তা পরবর্তীতে যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র প্রেরণ করা হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে ‘ভুল রাজনীতির খেলা’ থেকে সরে এসে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এ আহ্বান জানান। জামায়াত আমির বলেন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশ কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের বিষয় নয়। একজন নাগরিক হিসেবে চাকরিপ্রার্থীর মেধা ও যোগ্যতাই নিয়োগের ক্ষেত্রে একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত। ভেরিফিকেশনের নামে ‘ফ্যাসিবাদী আমলের’কর্মকাণ্ড পরিত্যাগ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সে সময়ের অনুরূপ যেকোনো কূটতৎপরতা জনগণ মেনে নেবে না। তিনি আরও বলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। মেধাবী যুবসমাজসহ তরুণদের নিজেদের অধিকার আদায়ে আবারও সোচ্চার হতে হবে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ছাড় দিলে বাংলাদেশ মেধাহীন ফ্যাসিবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। তাই এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
এদিকে, শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তিতে দিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আমরা লক্ষ্য করছি যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫-এর নিয়োগপত্র প্রাপ্তি নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত সময়ে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কেউ নিয়োগপত্র না পেয়ে থাকলে তা পরবর্তীতে যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র প্রেরণ করা হবে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) শাহীনা ফেরদৌসীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। অধিদপ্তরের অন্য কর্মকর্তারাও গণমাধ্যমে এ নিয়ে কথা বলতে চাইছেন না। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে চুপ। ফলে বাদ পড়া প্রার্থীরা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছেন। সর্বত্রই এ নিয়ে হাহাকার।
গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় (পার্বত্য তিন জেলা ছাড়া) একযোগে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা (এমসিকিউ টাইপ) অনুষ্ঠিত হয়। এত উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়। তাতে জেলাভিত্তিক উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। পুলিশি যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়। নিয়োগপ্রাপ্তদের ১ অক্টোবর নিজ নিজ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলার সহস্রাধিক প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। তবে সব জেলার তথ্য এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন তারা। নিয়োগপত্র না পাওয়া বেশ কয়েকজন প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় সবাই নিরীহগোছের। নিজে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এমনকি পরিবারের কোনো সদস্যও যুক্ত নেই বা ছিলেন না, কোনো প্রকার মামলা বা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার নজির নেই, একাডেমিক সনদেও নেই কোনো সমস্যা। তবুও নিয়োগপত্র অধরাই রয়ে গেল তাদের।
সাথিয়া উপজেলার একজন প্রার্থী কামরুন নাহার। অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় তার। দুই সন্তান ও সংসার সামলেও প্রতিদিন পড়ার টেবিলে বসতেন। একটি সরকারি চাকরির প্রত্যাশায় দীর্ঘ এই পথে নানা প্রতিকূলতায়ও মনোবল হারান নি। এত সাধনার পর অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণও এলো। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে ১৪ হাজারের বেশি চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীর তালিকার তার নামও যোগ হলো! এখন শুধু যোগদানের পালা। কিন্তু এত প্রতীক্ষার পর গতকাল যখন নিয়োগপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলো, তখনই মলিন হয়ে যায় তার মুখ। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েও তাদের হাতে পৌঁছেনি নিয়োগপত্র। নিয়োগ না পাওয়ার বিষয়ে এই প্রার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমার তো কাগজপত্রে কোনো সমস্যা ছিল না। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও আমার পরিবারের কারও সম্পৃক্ততা নেই। ফলাফলও খারাপ ছিল না। তাহলে কেন পাইনি? তিনি বলেন, আমার সরকারি চাকরির বয়স শেষ। যেদিন আমার এই চাকরি হয়, তখন আমার বয়স ৩১ বছর ৯ মাস। এখন আমার বয়স শেষ হয়ে গেছে। এনটিআরসিএ-এর ৭ম শিক্ষক নিয়োগের গণবিজ্ঞপ্তি যখন প্রকাশ হলো সেখানেও চাকরি হলো। কিন্তু এখানে করবো বলে সেখানে যোগ দিই নি। কেন আমাকে নেওয়া হলো না? এখন আমি কী করবো? তিনি আরও বলেন, আমার কাগজপত্রে যদি কোনো সমস্যা থাকত, তাহলে আমাদের ডিইপি অফিসের কর্মকর্তারা আমার আবেদনপত্র ও অন্যান্য ডকুমেন্ট নিয়ে সেগুলো একে একে মিলিয়ে দেখেছেন। তাঁরা দুইবার আমার কাগজপত্র নিয়েছেন। কোনো কাগজে ভুল বা অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সেটি সংশোধন করে আবার জমা দিতে হয়েছে। একটা কাগজও যদি এদিক-ওদিক হতো, সেটা ঠিক করে নিয়ে আসতে হয়েছে। ভুল কাগজপত্র থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই। কারণ ভুল থাকলে তাঁরা কাগজ গ্রহণই করতেন না।
কান্না বিজরিত কন্ঠে তিনি আরো বলেন, ঘরের বাইরে বের হতে পারছি না। আট মাস ধরে সবাই জানে আমার সরকারি চাকরি হয়েছে। এখন যদি নিয়োগপত্র পাই নি জানাই তাহলে মানুষ কী ভাববে। আমার পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেছে। ২৭-২৮ বছর পড়াশোনা করে জীবনটা কাটিয়েছি। এখন মুখ দেখানোর উপায় নেই। ওই প্রার্থী জানান, নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে যোগাযোগ করেছেন। সেখানে তাকে বলা হয়েছে, অধিদপ্তর থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তারা সেভাবেই কাজ করছেন।
পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার প্রাথী মো.ফরিদুল ইসলাম বলেন, আমার এমন কোনো কারণ নেই যে আমি নিয়োগপত্র পাব না। কেন পাইনি, এর কোনো কারণই আমি খুঁজে বের করতে পারিনি। আমি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। আমার পরিবারেরও কেউ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়, কারও কোনো পদ-পদবিও নেই। নিজের পারিবারিক পরিচয় তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা খুবই নিরীহ কৃষক পরিবারের সন্তান। আমার ভাইয়েরাও স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। এ ধরনের কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা সমস্যা আমাদের নেই। কখনো আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি নেই। পাবনা জেলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রার্থী বলেন, ডোপ টেস্টের কাগজপত্রসহ সবকিছু ঠিক আছে। বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনীতি করিনি। পরিবার এবং আত্মীয়স্বজনদের কেউই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন।নিজের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। নিয়োগপত্র না পাওয়ার কারণ জানতে তিনি ডিএসবি—পুলিশের ভেরিফিকেশন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানান। তার ভাষ্য, তারা আমাকে বলেছে, আপনার রিপোর্ট সম্পূর্ণ পজিটিভ। এছাড়া পাবনা জেলায় আমরা কাউকে নেগেটিভ দিইনি। ফরিদপুরের এক প্রার্থী জানান, তিনিও নিয়োগপত্র পাননি। তাঁর ধারণা, রাজনৈতিক কারণে এমনটা হয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, এটা হয়তো রাজনৈতিক কারণ। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছিলাম। ছাত্রজীবনেই বিয়ে করেছি, আমার সন্তানও আছে। আমার বাবা কৃষক। প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি প্যারালাইজড। তবে আমার এক চাচা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমাদের গ্রামে রাজনীতি নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। তারপরও মনে হচ্ছে, এনএসআই ভেরিফিকেশনের সময় হয়তো বিষয়টি ধরা হয়েছে।
জেলা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, জেলা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করেছি। তাঁরা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তাঁরা বলেছেন, অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে। তাঁরা এখান থেকে কিছু বলতে পারছেন না। কক্সবাজারের টেকনাফের এক প্রার্থীর ধারণা, নিয়োগপত্র না পাওয়ার পেছনে এনএসআইয়ের ভেরিফিকেশন অথবা স্থানীয় কারও ব্যক্তিগত বিরোধ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে আমাদের পারিবারিক জায়গা-জমি নিয়ে কিছু ঝামেলা আছে। এ নিয়ে স্থানীয় কিছু লোকের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে। তাঁরা আমাকে যতটুকু সম্ভব সমস্যায় ফেলতে পারে। এনএসআই যে ভেরিফিকেশন করেছে, সেটাও আমি জানতে পারিনি। ওই সময় আমি ঢাকায় ছিলাম। এখানে কী হয়েছে বুঝতে পারিনি। আমি স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছিলাম, আমার নিয়োগপত্র আসবে। কিন্তু আসে নি। তিনি বলেন, আমার ডিএসবি ভেরিফিকেশন সঠিক ছিল। ডিএসবি থেকে আমাকে ফোনও দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা পজিটিভ রিপোর্ট দিয়েছেন এবং বলেছেন, আমার কোনো সমস্যা নেই। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। আমরা হলে থেকেও পড়াশোনা করেছি। সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই ছিল আমাদের মূল চিন্তা।
এদিকে কক্সবাজারের প্রার্থী রিদোয়ানুল হক বলেন, আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই। তবে আমার আব্বু স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং বর্তমান যে কমিটি আছে সেখানেও তিনি সদস্য। কিন্তু আমরা বিএনপির পরিবারে হওয়ার পরও আমার নিয়োগপত্র কেন আসেনি, সেটা জানি না। তিনি আরও বলেন, আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডিও নেই। এমনকি কোনো বিষয়ে কখনও থানায় যাওয়ার ঘটনাও নেই আমার।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার প্রার্থী আইনুল ইসলাম জানান, নিয়োগ থেকে বাদ পড়ার কোনো কারণ এখনো জানতে পারেননি। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আন্দাজ করার মতো কোনো কারণও জানতে পারছি না। কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটা বুঝতে পারছি না। নিজের পরিবারের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সম্পর্কে আইনুল ইসলাম বলেন, আমার বাবা-চাচাদের মধ্যে কেউ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। আমিও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই। নিজের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি এ ধরনের কোনো বিষয় কখনো ছিল না। তিনি বলেন, জেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা বলেছেন, নিয়োগপত্রের তালিকা মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়েছে এবং ভেরিফিকেশনের কারণে যাঁদের নাম আসেনি, তাঁদের জন্য নিয়োগপত্র তৈরি করা সম্ভব হয়নি। কুমিল্লা জেলার ফারুক নামে এক প্রার্থী চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি নিয়োগপত্র পাননি। তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সব রিপোর্টই ইতিবাচক এসেছে।
তিনি বলেন, 'আমি কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কাজের সঙ্গে জড়িত নই, কোনো উচ্ছৃঙ্খল কাজের সঙ্গেও জড়িত নই। কোনো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে আমরা জড়িত নই। পরীক্ষাগুলোর রিপোর্ট পজিটিভ। তারপরও কেন নিয়োগপত্র পেলাম না, এটা বুঝতে পারছি না। পাবনার এক প্রার্থী মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, ছাত্র অবস্থায় রাজনীতি পরিবারের কেউ নাই। কোনও পুলিশি ঝামেলাও নেই। নিয়োগপত্র না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমি ছোটকাল থেকে ভালো ছাত্র। প্রাথমিকে বৃত্তি পেয়েছি। এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ। ইন্টারেও ভালো রেজাল্ট। অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস—বুঝছেন? আর আমার সঙ্গে এরকম হচ্ছে।
মা, প্রাইমারিতে চাকরি হয়ে গেছে—দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, অভাব আর অপেক্ষার পর মাকে এই কথাটিই জানিয়েছিলেন রাহুল দাস। ভেবেছিলেন, এবার হয়তো বদলে যাবে পরিবারের ভাগ্য। শেষ হবে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা। কিন্তু নিয়োগপত্র বিতরণের দিন সেই আনন্দই পরিণত হয়েছে হতাশায়। সব ধাপ পেরিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও শেষ মুহূর্তে নিয়োগপত্র পাননি তিনি। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, মাকে এখনো সেই খবরটি জানাতে পারেননি রাহুল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি লিখেন, ‘যে মুখ দিয়ে মাকে বলছিলাম মা প্রাইমারিতে চাকরি হয়ে গেছে, সেই মুখ দিয়ে এখন মাকে কীভাবে বলব, মা ভেরিফিকেশনে আটকাই দিছে। রাহুল দাস কবি নজরুল সরকারি কলেজের ১৭-১৮ সেশনের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি সিলেটের বানিয়াচংয়ে। পড়াশোনা শেষে দীর্ঘদিন এলাকায় থেকেই চাকরির জন্য চেষ্টা করছিলেন তিনি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পর মনে করেছিলেন, দীর্ঘ বেকারত্বের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু নিয়োগপত্র না পাওয়ায় আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তিনি। নিজের ফেসবুক পোস্টে রাহুল লিখেন, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক’পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে চলে আসা। যে সময়ে শ্রেণিকক্ষে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করার কথা, সেই সময়ে হাওরে মাছ ধরে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির চেষ্টা করতে হচ্ছে। তিনি আরও লিখেন, চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও দীর্ঘদিন বেকার বসে থাকার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে হয়েছে। তার ভাষায়, সৃষ্টিকর্তা সহায় থাকলে হয়তো এই চাকরি দিয়ে সারাজীবন কাটাতে হবে না, তবে দীর্ঘদিন ধরে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অপেক্ষায় না রেখে এই মানসিক যন্ত্রণার অবসান ঘটানো প্রয়োজন।
এসব বিষয়ে কথা হয় মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মোল্লার সঙ্গে। তিনি জানান, মন্ত্রণালয় থেকে আমরা যাদের নিয়োগপত্র দেওয়ার জন্য নির্দেশনা পেয়েছি, তাদেরই নিয়োগপত্র দিচ্ছি। যাদের দিতে পারব না, তাদের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখব। নিয়োগের বিষয় খুব কনফিডেনসিয়াল। এর বাইরে আমি কিছু বলতে পারব না।
একই কথা বলেন ময়মনসিংহ এবং নরসিংদীর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারও। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতেও রাজি হননি তারা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের আন্দোলনের একজন নেতা ও মুখপাত্র দেবব্রত সরকার বলেন, অনেক জেলার নিয়োগপত্র ওয়েবসাইটে দেওয়া হচ্ছে, আবার কোনো কোনো জেলারটি ডাকযোগেও পাঠানো হবে বলে জেনেছি। কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও অনেকে নিয়োগপত্র পাচ্ছেন না বলে জানতে পেরেছি, যেমন চাঁদপুরে ২৭ জন পাননি, ঝালকাঠিতে ২০-২২ জন। শুনেছি পুলিশ ভ্যারিফিকেশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট নেগেটিভ আসায় তারা নিয়োগপত্র পাননি। আমি জেলারটি এখনও দেওয়া শুরু না হওয়ায় আমিও নিয়োগপত্র পাইনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









