মাদ্রাসার পড়াশোনা ছেড়ে দিনমজুরি এবং পরে রিকশা চালানো-এভাবেই শুরু হয়েছিল ওহিদুল মোল্লার কর্মজীবন। প্রায় পাঁচ বছর আগে হঠাৎ রিকশা চালানো ছেড়ে স্থানীয় কয়েকজন হ্যাকারের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন তিনি। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই হ্যাকিংয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। পরে তাঁর তত্ত্বাবধানে একটি বড় হ্যাকিং চক্র গড়ে ওঠে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নাটোরের লালপুরের ‘হ্যাকিং সম্রাট’ ওহিদুল মোল্লার (৩২) সঙ্গে এক পুলিশ কনস্টেবলসহ আরো পাঁচজনকে গ্রেফতারের পর এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
ওহিদুল মোল্লা লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া গ্রামের মৃত রাব্বেল মোল্লার ছেলে। তাঁর চাচাতো ভাই সেন্টু মোল্লা জানান, বাবার মৃত্যুর পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি ওহিদুল। মাদ্রাসার পড়াশোনা ছেড়ে প্রথমে দিনমজুর এবং পরে রিকশা চালানো শুরু করেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে তিনি রিকশা চালানো ছেড়ে দেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অল্প সময়ের মধ্যেই ওহিদুলের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মোহরকয়া গ্রামের পৈতৃক বাড়ির পাশাপাশি বিলমাড়িয়ায় পদ্মা নদীতীরে তিনি আরেকটি পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। সেখানে মহিষ ও কবুতরের বড় খামার গড়ে তোলেন। বাড়িটি উঁচু ইটের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং প্রবেশের জন্য রয়েছে একটি মাত্র ফটক। স্থানীয়দের যাতায়াত কম থাকলেও গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে তরুণদের আনাগোনা দেখা যেত বলে জানিয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।
পুলিশের দাবি, কবুতরের খামারের একটি ঘরকে হ্যাকিং কার্যক্রমের গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতেন ওহিদুল।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ওই কক্ষে ছিল স্মার্ট মনিটর, ওয়াই-ফাই সংযোগ ও খাট। বাইরে থেকে দেখলে সেটিকে বসবাস বা কোনো কার্যক্রম পরিচালনার জায়গা বলে বোঝার উপায় ছিল না। লালপুর থানা পুলিশ জানায়, বাড়ি থেকে গ্রামের প্রধান সড়ক পর্যন্ত অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন ওহিদুল। পুলিশের ভাষ্য, ক্যামেরাগুলো শুধু গবাদিপশু ও কবুতর চুরি ঠেকানোর জন্য নয়, পুলিশের গতিবিধি নজরদারিতেও ব্যবহার করা হতো।
হ্যাকিংয়ের কাজে সাতটি মোবাইল ফোনে অদলবদল করে ৬৮টি সিম কার্ড ব্যবহার করা হতো বলেও জানিয়েছে পুলিশ। সিমগুলোর নম্বর সাদা কাগজে ছক করে লেখা ছিল। এ ছাড়া বিকাশ, নগদ ও রকেটের লেনদেনের হিসাব রাখতে সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হতো বলে পুলিশের দাবি।
স্থানীয়দের দাবি, সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কারণ জানতে চাইলে ওহিদুল বলতেন, কবুতর ও মহিষ চুরি ঠেকাতে ক্যামেরাগুলো লাগানো হয়েছে। পরে তারা জানতে পারেন, পুলিশের গতিবিধি নজরদারির জন্যও এগুলো ব্যবহার করা হতো।
পুলিশের অভিযোগ, অন্যের মোবাইল ফোনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং মাদক ব্যবসা পরিচালনায় ওই গোপন কক্ষটি ব্যবহার করতেন ওহিদুল। অল্প সময়ে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। যাতায়াতের জন্য দামি মোটরসাইকেল ব্যবহার করতেন এবং রাজশাহী ও পাবনায় যাতায়াতের সময় দামি গাড়ি ভাড়া করতেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এক প্রাইভেটকার চালক।
সূত্র জানায়, সোমবার রাতে মোহরকয়া গ্রামে ওহিদুলের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় কবুতরের খামারের গোপন কক্ষ থেকে হ্যাকিং কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে ওহিদুলসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারদের মধ্যে আলামিন (২৩) নামে রাজশাহী রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের (আরআরএফ) এক পুলিশ কনস্টেবলও রয়েছেন। আলামিন লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের পানসিপাড়া গ্রামের আতাহার প্রামাণিকের ছেলে। তাঁর গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন আরআরএফ রাজশাহীর কমান্ড্যান্ট (অতিরিক্ত ডিআইজি) দীন মোহাম্মদ।
অভিযানে গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১০৬টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় হ্যাকিং কার্যক্রম ও মাদক কারবারের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। মামলায় ওহিদুলসহ ছয় আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে লালপুর আমলি আদালতের বিচারক সাদ্দাম হোসেন তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে রাত ৯টার দিকে তাঁদের নাটোর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
লালপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম এদিনকে বলেন, ‘ওহিদুলের কাছ থেকে আশপাশের অনেক মানুষ হ্যাকিং শিখে এ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছেন। গ্রেফতার এড়াতে তিনি নানা কৌশল অবলম্বন করলেও শেষপর্যন্ত পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন। অপরাধীরা যত কৌশলই অবলম্বন করুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’ পুলিশের দাবি, দীর্ঘদিন নজরদারি ও নানা কৌশলের মাধ্যমে হ্যাকিং কার্যক্রম পরিচালনা করলেও শেষপর্যন্ত অভিযানে ধরা পড়েন ওহিদুল ও তাঁর সহযোগীরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









