রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থাপনা দিন দিন চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট এবং অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে প্রতি বছর ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। এর ফলে ঢাকার কেন্দ্রস্থলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে একটি বিরাট ও ভয়ংকর শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। যার বিস্তার ঢাকার কেন্দ্র থেকে টঙ্গী, সাভার, ধামরাই, দোহার ও নবাবগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। ভূতাত্ত্বিক ভাষায় একে বলা হচ্ছে 'কম্পাউন্ড কোন অব ডিপ্রেশন।’দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থা চলতে থাকলে চাকচিক্যময় রাজধানী মারাত্মক ভূমিধস ও ভয়াবহ পানিশূন্যতার মুখে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দীর্ঘ ৬০ বছরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে ২ মিটার বা প্রায় ৭ ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। ১৯৭০ সালেও ঢাকা শহরে মাত্র ৬ মিটার বা প্রায় ২০ ফুট গভীরেই পানি পাওয়া যেত, অথচ বর্তমানে তা ৭৩ মিটার বা ২৪০ ফুটের নিচে নেমে গেছে। পানির স্তরের নিচে নামার এ আশঙ্কাজনক হার রোধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরকে এই মহাবিপর্যয় থেকে বাঁচাতে হলে কেবল নতুন পাম্প বসানো বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা, পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানির ২৫ শতাংশ অপচয় রোধ করা, এবং ‘বাংলাদেশ পানি আইন’কঠোরভাবে কার্যকর করে ভূগর্ভস্থ পানির সুষম ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, নগরীর প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করতে হয়। এর ফলে ঢাকার কেন্দ্রস্থলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে বিরাট শূন্যতা বা ভূতাত্ত্বিক ভাষায় 'কম্পাউন্ড কোন অব ডিপ্রেশন' তৈরি হয়েছে। তাই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রায় এক দশক আগে মেঘনা নদীর পানি শোধনাগার (ডিইএসডব্লিউএস) এবং সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (ফেইস-৩)-এর মতো বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ, ঠিকাদার চূড়ান্তকরণ ও বৈদেশিক ঋণ বা অনুদানের অর্থছাড়ের দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। ২০১৩ সালের ডিইএসডব্লিউএস প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হলেও কাজ শেষ হয়নি।
অন্যদিকে ২০১৫ সালে শুরু হওয়া সায়েদাবাদ প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশের মতো, আর এর ব্যয় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিকল্প ভূ-উপরিস্থ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পেরে ঢাকা ওয়াসা বাধ্য হয়ে পুনরায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। এজন্য নেওয়া হয়েছে ৯২০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প। ভূগর্ভ থেকে দৈনিক আরো ৫৭৬ মিলিয়ন লিটার পানি উত্তোলনের জন্য ৯২০ কোটি ৮৫ লাখ টাকার এ নতুন জরুরি প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
একনেকে অনুমোদন পেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়িত হওয়ার কথা রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৮৮টি গভীর নলকূপ প্রতিস্থাপন, ৪৫০ সেট পাম্প মোটর সেট সরবরাহ ও স্থাপন, নতুন করে ৬২টি গভীর নলকূপ, ৪৫০টি ভ্যারিয়েবল ফ্রিকোয়েন্স সরবরাহ ও স্থাপন, ৪৮০ সেট পাম্প ডেলিভারি লাইন স্থাপন, ২৫০টি পাম্প ঘর, ২৮০ গভীর নলকূপ রি-জেনারেশন, ১২৪টি স্ক্যাডা সিস্টেম স্থাপন ও ৬০টি গভীর নলকূপ রি-হ্যাবিলিটেশন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া প্রকল্প কার্যক্রমে থাকছে বৈদ্যুতিক কেবল সরবরাহ, কলাম পাইপ সরবরাহ, বাউন্ডারি ওয়ালসহ অন্যান্য নির্মাণ কার্যক্রম।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা ওয়াসার এক কর্মকর্তা দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহী, ময়মনসিংহ, খুলনা এলাকার। ঢাকার মাটিরও প্রায় একই অবস্থা। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমলেও নগরীর মানুষ বেড়েই চলছে। সে জায়গা থেকে আমাদেরও নতুন নতুন উৎস খুঁজতে হচ্ছে। মেঘনা নদী থেকে ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহে একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। তবে সেগুলো যেহেতু এখনো চলমান পর্যায়ে রয়েছে এবং শেষ হতে আরো কয়েক বছর লাগবে, তাই জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যমান পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ করতে প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ স্তরে আরো চাপ সৃষ্টি হবে।’
এদিকে ওয়াসার এই নতুন উদ্যোগকে ‘আত্মঘাতী’ও ‘বুমেরাং’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন পানি ও নগর বিশেষজ্ঞরা। এ মেগা প্রকল্প নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে প্রকল্প নিয়ে সংস্থাটির ধীরগতিতেও ‘বুমেরাং’হতে পারে ওয়াসার এ নতুন উদ্যোগ ও পরিকল্পনা।
এ ব্যাপারে নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান এদিনকে বলেন, বড় প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ না করে নতুন করে গভীর নলকূপ বসানোর এই উদ্যোগ আত্মঘাতী। এতে ব্যক্তিপর্যায়ে অবৈধভাবে পানি তোলার সরকারি স্বীকৃতি মিলে যাচ্ছে, যা মাটির নিচের পরিবেশকে আরো বিপন্ন করবে।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মতিন আহমেদ সতর্ক করে বলেন, কাদামাটির স্তরগুলো বালির স্তরের বিপরীত আচরণ করে। কাদার স্তরে এ ধরনের ‘কোন অব ডিপ্রেশন’বা শূন্যতা তৈরি হলে বড় ধরনের ভূমিধস হতে পারে এবং ভূগর্ভস্থ পানির রিজার্ভ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ অসীম নয়; সরকারকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও জাতীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে ঢাকার প্রায় ৬৫ শতাংশ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। এজন্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে প্রতি বছর ঢাকার পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। এ ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ আরো বাড়ছে।
এদিকে সারা দেশে ১ হাজার ২৭২টি পর্যবেক্ষণ কূপের মাধ্যমে ৬০ বছর ধরে পানির পরিমাণ ও গুণমান পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুসারে, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর ২ মিটার বা প্রায় ৭ ফুট করে নেমে যাচ্ছে।
ভূগর্ভস্থ পানি বিশেষজ্ঞ এবং পাউবো পরিচালক ড. আনোয়ার জাহিদ বলেন, 'ঢাকার মাটির নিচে একটি বড় বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে। মাটির নিচে হচ্ছে বলে আমরা সেটা দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমরা বিপর্যয়ের ধারণাই পাচ্ছি।' তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভূবিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ভূগর্ভস্থ পানি কমিশন’গঠনের জোরালো তাগিদ দিয়েছেন।
সূত্র জানায়, কয়েক দশক আগেই ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল পাউবো এবং গবেষকরা। ১৯৯৬ সালে ঢাকায় পানির স্তর ছিল ২৫ মিটারে, যা ২০০৫ সালে ৪৫ মিটার, ২০১০ সালে ৬০ মিটার এবং ২০২৩ সালে এসে ৭৫ মিটারে নেমেছে।
২০৫০ সালের মধ্যে এটি নেমে যেতে পারে ১২০ মিটারে। কেননা, ওয়াসার প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৫ সালে প্রতিদিন ৩৫ লাখ ঘনমিটার, ২০৩০ সালে প্রতিদিন ৪৩ লাখ ঘনমিটার এবং ২০৩৫ সালে প্রতিদিন ৫২ লাখ ঘনমিটার পানির চাহিদা থাকবে ঢাকায়।
জাতিসংঘের এক গবেষণায়ও ঢাকার ভূগর্ভ থেকে পানি তোলার বিষয়টিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, সোমালিয়ার মোগাদিসু এবং মিশরের টান্তা শহরের পর বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকার ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা মেটাতে ওয়াসার ১ হাজার পাম্প ছাড়াও ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপন করা অন্তত ২ হাজার গভীর নলকূপ ও আরো কয়েক হাজার অননুমোদিত গভীর নলকূপ দিয়ে প্রতিদিন ভূগর্ভস্থ পানি তোলা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এদিনকে বলেন, ‘ওয়াসার প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রায়ই ধীরগতির হয়। বিশেষ কারণ হচ্ছে ঋণ ও অনুদানে এসব প্রকল্প নেওয়া হয়। যখন বিদেশি ঋণে বা কোনো সংস্থার অনুদানে প্রকল্প নেওয়া হয় সেখানে প্রধান চ্যালেঞ্জ থাকে সংশ্লিষ্ট দেশ বা সংস্থার অর্থছাড়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দেখে অর্থছাড় করে বিদেশি সংস্থা। ফলে এটি প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর প্রভাব পড়ে। যেমনটা আমরা ওয়াসার আগের দুই প্রকল্পে দেখেছি। ২০১৩ সালে নেওয়া প্রকল্প এখনো শেষ হয়নি। বাস্তবায়ন এতটা ধীরগতি যে প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। তবে বর্তমান জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নতুন প্রকল্পটি একনেকে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছে।’
জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী শওকত মাহমুদ এদিনকে বলেন, বড় শোধনাগারগুলোর নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নগরবাসীর পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেই এই জরুরি প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। এটির মাধ্যমে দৈনিক ৫৭৬ মিলিয়ন লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে, যা ঢাকার দুটি সিটির আওতাধীন বাসিন্দাদের জন্য সরবরাহ করা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









