বাজার আর জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়ার মধ্যেই নতুন করে আরেক দুশ্চিন্তা গ্রাস করছে রাজধানীর অনেক পরিবারকে। কারণ বাড়িওয়ালা এক টুকরো কাগজের নোটিশে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘সম্মানিত ভাড়াটিয়া, আগামী জানুয়ারি ২০২৭ থেকে আপনার ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া বৃদ্ধি করা হলো।’
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনের বেনারশী পল্লীর ‘এ’ ব্লকের ৪ নং লেনের ১৭/১৯ নং বাড়ির ভাড়াটিয়াদের কাছে গত সপ্তাহে ভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ পাঠিয়েছেন বাড়ির মালিক। নোটিশে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে এক লাফে ৫ হাজার টাকা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে মালিক পক্ষ। অন্যথায় চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাসা খালি করতে হবে। মালিকপক্ষের নোটিশে উল্লেখ করা হয়- সম্মানিত ভাড়াটিয়াবৃন্দ, আপনাদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষত পানির বিল, হোল্ডিং ট্যাক্স, বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং অন্যান্য খরচ বৃদ্ধিসহ সার্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে আপনাদের বসবাসকৃত ফ্ল্যাটটির ভাড়া মাসিক ৫ হাজার টাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্ধিত ভাড়া আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ হতে কার্যকর হবে। বর্ধিত ভাড়া আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ হইতে প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হলো।
যদি বর্ধিত ভাড়ায় কেউ থাকতে অনীহা প্রকাশ করেন, তাহলে চলতি (অক্টোবর) মাসের মধ্যেই জানান পূর্বক ডিসেম্বর মাসের ভাড়া পরিশোধ করে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাসা খালি করবেন। ধন্যবাদান্তে মালিক পক্ষ।
একইভাবে ভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ পেয়েছেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারাও। ৩ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া বাড়ানো সংক্রান্ত মালিকপক্ষের কাগজটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। বেসরকারি একটি বিপণন কোম্পানিতে ৭ বছর ধরে চাকরি করেন তিনি।
বেতন সেই ৪০ হাজার টাকাতেই আটকে আছে দুই বছর ধরে। অথচ গত এক বছরে কেজিতে চালের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা। ছেলের স্কুলের বেতন বেড়েছে ১৫০০ টাকা, তারপর এখন বাড়তি ভাড়ার নোটিশ। বাড়ির মালিকের নোটিশে উল্লেখ করা আছে- ‘সম্মানিত ভাড়াটিয়া, আগামী জানুয়ারি ২০২৭ থেকে আপনার ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ৩০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হলো।’
বছর ঘুরলেই যেমন ক্যালেন্ডারে নতুন সংখ্যা যোগ হয়, তেমনি ঢাকাবাসীর জীবনে যোগ হয় বাড়তি বাড়িভাড়ার চাপ। পুরনো বছরকে বিদায় দিয়ে নতুন বছর যেমন অনিবার্য, তেমনি রাজধানীতে বাড়িভাড়া বাড়ানোও যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বছরের প্রথম মাসেই ভাড়াটিয়াদের গুনতে হয় অতিরিক্ত এক থেকে তিন হাজার টাকা। নতুন বাসা নিতে হলে দিতে হয় দুই থেকে তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া; সঙ্গে চলতি মাসের ভাড়া, যা জোগান দিতে অনেককে সঞ্চয় ভাঙতে হয়। কেউ কেউ বাধ্য হন ঋণ নিতে। ঢাকায় বাড়িভাড়া এখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। উদ্যোগ আছে, কিন্তু সর্বজনীন নয়।
বর্তমানে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। এর মধ্যে বাড়ি ভাড়ার এই বাড়তি ঘোষণা যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রফিকুল ইসলামের মতো ভাড়াটিয়ারা বলছেন, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য বজায় রাখা এমনিতেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে নতুন বছরের শুরুতেই ভাড়ার এই বাড়তি চাপ তাদের পারিবারিক বাজেটে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। রফিকুল ইসলাম বললেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ুক, আমরা খুশি। কিন্তু আমাদের বেতন না বাড়িয়ে যদি সবকিছুর দাম বাড়ানো হয়, তাহলে আমরা বাঁচবো কিভাবে? বাসা ভাড়াটা অন্তত এক বছর না বাড়ালে কি খুব ক্ষতি হতো?’ প্রশ্নটা রফিকুলের একার নয়। এই প্রশ্ন এখন লাখো ভাড়াটিয়ার। যারা প্রতিমাসে ক্যালকুলেটর হাতে বসে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেন, আর জানুয়ারির নোটিশটা দেখে সেই হিসাবটা আবারও এলোমেলো হয়ে যায়।
রফিকুল একা নন। এমন হাজারো রফিকুল, ফারজানা, মিতুর ঘুম হারাম হয়ে গেছে এই একটি কাগজে। অক্টোবর শেষ হতে না হতেই রাজধানীর অলিগলিতে একটাই আলোচনা, জানুয়ারি থেকে ভাড়া বাড়ছে। মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী, উত্তরা থেকে লালবাগ, বাড্ডা থেকে ধানমন্ডি; সবখানেই বাড়িওয়ালারা নোটিশ দিচ্ছেন। কারো ২ হাজার, কারো ৫ হাজার— গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ছে বাসা ভাড়া। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেলের আলোচনায় বাজারে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে; সবার বেতনই বুঝি বাড়ছে। বাড়িওয়ালারা সেই অজুহাতেই ভাড়া বাড়াচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
মালিবাগে ২২ হাজার টাকায় থাকা স্কুল শিক্ষিকা নাহিদা আক্তার বলেন, তার সংসারে আয় করেন দুজন। দুজনই বেসরকারি চাকরিজীবী। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীর অফিসে গত ঈদে বোনাস অর্ধেক দিয়েছে। বলেছে, কোম্পানির অবস্থা ভালো না। সেখানে ভাড়া ৫ হাজার টাকা বাড়লে আমার মেয়ের প্রাইভেট টিচার বন্ধ করে দিতে হবে। মা হিসেবে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?’
যাত্রাবাড়ীতে ১৫ বছর ধরে একই বাসায় থাকেন ৬৫ বছরের শেখ ফরিদ। ১৪ হাজার টাকার বাসা ১৮ হাজার টাকা হয়ে গেছে। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, এই বয়সে নতুন বাসা খোঁজা, আবার অ্যাডভান্স, ট্রাক ভাড়া... এই টাকা আমি পাবো কোথায়? মনে হয় শহরটা আমাদের মতো গরিবদের জন্য না।
সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় আছেন নারী চাকরিজীবীরা। বাড্ডায় সাবলেটে থাকা সুমি আক্তার বলেন, ‘আমরা মেয়েরা একটু নিরাপদ বাসার জন্য ১-২ হাজার টাকা বেশি দিতে রাজি থাকি। বাড়িওয়ালারা সেই দুর্বলতাটা জানেন। তাই তারা এও জানেন, আমরা সহজে বাসা ছাড়ব না।’
বেসরকারি চাকরিজীবী ইউসুফ আলীর মতো অসংখ্য মানুষ বছরের শুরুতেই চরম চাপের মুখে পড়েন। বাচ্চার স্কুল ভর্তি, ইউনিফর্ম, বই-খাতা, পাশাপাশি বাড়িভাড়া— সব মিলিয়ে নতুন বছর তাদের কাছে উৎসব নয়, বরং বাড়তি দুশ্চিন্তার নাম। ইউসুফ আলী বলেন, ‘বছর না ঘুরতেই মালিক আবার ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ দিয়েছেন। এ বছর থেকে অতিরিক্ত দুই হাজার টাকা গুনতে হবে। কথা বললে বলেন, না পোষালে বাসা ছেড়ে দিতে। বাসা ছাড়াও সহজ নয়। স্কুল, কর্মস্থল, যাতায়াত খরচ— সব কিছু হিসাব করে অনেকেই বাধ্য হয়ে বাড়তি ভাড়া দিয়ে একই বাসায় থেকে যাচ্ছেন।’
মিরপুর থেকে রাজধানীর দক্ষিণে মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ কিংবা কারওয়ান বাজার মেট্রোতে প্রতিদিন যাতায়াত করেন অনেক মানুষ। সকাল সন্ধ্যা মেট্রোতে চড়ার সুবিধা পাওয়ায় এই এলাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে ভাড়াটিয়ার সংখ্যা। স্থানীয়রা জানান, আগে যে বাসা পাওয়া যেত ১১ থেকে ১২ হাজার টাকায়, সেটিই এখন ভাড়া নিতে গুনতে হচ্ছে অন্তত ১৫ থেকে ১৮ হাজার।
সাধারণত বছরের শুরুতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ধরনের নোটিশ ভাড়াটিয়াদের জন্য বেশ বড় একটি ধাক্কা। মোহাম্মদপুরের মতো এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া এমনিতেই চড়া। তার ওপর ৩ হাজার টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক পরিবার এখন নতুন করে বাসা বদলানোর কথা ভাবছেন, যদিও বর্তমান বাজারে নতুন বাসা খুঁজে পাওয়া এবং সেখানে স্থানান্তর হওয়াও বেশ ব্যয় ও সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। বাড়ি ভাড়ার এই নোটিশ পাওয়ার পর থেকেই ভাড়াটিয়াদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে। অনেকে মনে করছেন, বাড়িওয়ালাদের পক্ষ থেকে ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে না। ফলে ভাড়াটিয়ারা প্রায়ই এ ধরনের আকস্মিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হচ্ছেন। রফিকুল ইসলামসহ স্থানীয় ভাড়াটিয়ারা এখন এই পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজেদের খরচের খাত কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগের অভাবে ভাড়াটিয়ারা প্রায়ই অসহায় বোধ করেন। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে ভাড়া নির্ধারণের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হয়। মোহাম্মদপুরের এই ঘটনাটি সেই পুরনো সমস্যারই একটি প্রতিফলন, যেখানে ভাড়াটিয়াদের কোনো মতামত বা প্রস্তুতির সুযোগ না রেখেই ভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘ঢাকায় জনসংখ্যার তুলনায় ভাড়া বাসার চাহিদা থাকায় বাসা ভাড়া বেশি। চাহিদা না থাকলে এটা একটা সহনীয় পর্যায়ে থাকত। বাড়া বৃদ্ধির পেছনে বাড়িওয়ালাদের একটা যুক্তি থাকে। তবে সেটা যৌক্তিক কিনা, আসলে তা দেখার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা করা জরুরি। ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়গুলো আইনি কাঠামোর মধ্যে দিয়েই নিষ্পত্তি করা সম্ভব।’
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৫ বছরে ঢাকায় বাসাভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। অথচ একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম যতটা বেড়েছে, তার তুলনায় বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ হারে। ক্যাবের আরেক গবেষণায় দেখা যায়— ঢাকার ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া তাদের আয়ের প্রায় অর্ধেক ব্যয় করেন কেবল বাসা-ভাড়ার পেছনে, আর ১২ শতাংশ ভাড়াটিয়ার ক্ষেত্রে এই হার ৭৫ শতাংশের কাছাকাছি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশে গত চার বছরে বাসাভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। সরকারি এই হিসাবের চেয়ে বাস্তবে ভাড়া আরো বেশি হারে বাড়ছে, দাবি ভাড়াটিয়াদের। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বেড়েছে বেশি। বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত গত চার বছরে দেশের গড় বাসাভাড়া প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বাসাভাড়া বেড়েছে ৫.২৫ শতাংশ এবং সর্বশেষ প্রান্তিকে তা আরো বেড়ে ৫.১৯ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। ঢাকা বিভাগে বছরের ব্যবধানে ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৫.৪৮ শতাংশ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তিন রুমের ফ্ল্যাটের ভাড়া এলাকাভেদে ১৮ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে ৩ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ যুক্ত হয়।
বাড়িওয়ালারা বলছেন, তাদেরও খরচ বেড়েছে বহুগুণ। ধানমন্ডির একজন বাড়িওয়ালা, যিনি নিজে একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক। নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, ‘বাড়ি মেনটেইনেন্সের খরচ বেড়েছে। একটা ফ্ল্যাটে রঙ করাতে আগে ১৫ হাজার লাগত, এখন মিস্ত্রি ২৮ হাজার চায়। পানির মোটরপাম্প, লিফটের সার্ভিসিং, গ্যাস-বিদ্যুতের বিল— সবই তো বেড়েছে। ভাড়াটিয়ার যেমন দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, আমাদেরও তো একই বাজারে বাজার করতে হয়।’
মোহাম্মদপুর নুরজাহান রোডের বাড়িওয়ালা আমিন মোহাম্মদ বলেন, ‘দেখুন, সরকার যখন পে-স্কেল বাড়ায়, তখন বাজারের সবাই ভাবে মানুষের হাতে টাকা এসেছে। দোকানদার জিনিসের দাম বাড়ায়। তখন বাড়িওয়ালা কেন বাড়াবে না? এছাড়া ঢাকায় প্রতিদিন মানুষ আসছে, বাসার চাহিদা প্রচুর। আমি না বাড়ালে পাশের বাড়ি বাড়াচ্ছে। এটা পুরোপুরি বাজার অর্থনীতি। আমি জোর করছি না, যার পোষাবে থাকবে, না পোষালে চলে যাবে—এখন ভাড়াটিয়ার অভাব নেই।’
আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে না পেরে অনেক পরিবার সাবলেটের দিকে ঝুঁকছেন। কেউ আবার পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে একা থাকছেন শহরে। কারওয়ান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী শফিউল্লাহ বলেন, ‘ছোট ফ্ল্যাট ছেড়ে সাবলেটে উঠেছি। পরিবার গ্রামে পাঠানো ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু সাবলেটেও স্বস্তি নেই।’ বাড়তি নিরাপত্তা বিল, বাড়তি ভাড়া— সব মিলিয়ে সেখানেও বাড়ছে খরচ ও মানসিক চাপ।
মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের অবস্থাও একই রকম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনিম জেরিন বলেন, ‘টিউশনি ও খণ্ডকালীন চাকরি করেও মাস শেষে হাতে কিছুই থাকে না। ভাড়া আর খাবারের খরচ বেড়েছে। আগে একটু সঞ্চয় থাকত, এখন সেটুকুও নেই। রিয়াদুল ইসলাম নামে অপর শিক্ষার্থী বলেন, গত সপ্তাহে মেস মালিক নোটিশ দিয়ে জানিয়েছেন নতুন বছর থেকে এক হাজার টাকা করে রুমপ্রতি বেশি দিতে হবে। মালিকের নাকি অনেক বাড়তি খরচ হচ্ছে বিদ্যুৎ বিল, পানি ও গ্যাস বিলের পেছনে। এ কারণে তিনি বাড়তি ভাড়া নেবেন।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেস সংঘের মহাসচিব আয়াতুল্লাহ আখতার এদিনকে বলেন, ‘বাসার মালিকরা প্রতিবছরই ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছেন—এটা অন্যায়-অন্যায্য। আমরা এর প্রতিকার চেয়ে সমাবেশ-মানববন্ধন করেও কোনো ফল পাইনি। সরকারের কাছে দাবি জানাই, কোনোভাবেই যেন বাসা ভাড়া না বাড়ানো হয়, প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ করতে হবে।’
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী অজিমপুরের ভিকারুননিসা নূন স্কুলের আশপাশের বাসাভাড়া অনেক বেশি। ঠিক একই মাপের বাসা কিছুটা দূরত্বে নিলে সেই বাসার ভাড়া কমে আসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা। এই চিত্র সব এলাকাতেই দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন এবং বেশকিছু স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজিমপুরের আশেপাশে থাকায় এই এলাকায় থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন অভিভাবকরা। এছাড়া অধিকাংশ ভাড়াটিয়া শিক্ষার্থী বা ব্যাচেলর হওয়ায় হুট করে বাড়তি ভাড়ার নোটিশে টানাপড়েনে পড়েন তারা।
মানিকনগর, বাসাবো এবং খিলগাঁওসহ বেশ কিছু এলাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের প্রাধান্য। অন্য এলাকাগুলোর তুলনায় বাসা ভাড়া কম—এই খবরে সবাই ভিড় করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এখানেও প্রতিবছরই নিয়ম করে বাসাভাড়া বাড়ে। বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যেখানে বাড়তি দামে নিত্যপণ্য কিনতে হচ্ছে, সেখানে বাড়তি বাড়িভাড়া নগরবাসীর যাপিত জীবনের উদ্বেগের রেখা বাড়িয়ে দিয়েছে। আবাসন খরচ বেড়েছে বিত্তবানদের আবাসস্থল গুলশান বনানীতেও। এখানে থাকার খরচ তো বাড়ছেই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সার্ভিস চার্জের খড়গ। ভাড়াটিয়াদের দাবি, অযৌক্তিকভাবে বাড়ছে নানাবিধ খরচ। এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ আশা করছেন তারা।
রিহ্যাবের এক গবেষণায় উঠে এসেছে—ঢাকায় ২০ হাজার টাকা আয়েও মানুষকে থাকতে হচ্ছে ঝুপড়ি ঘরে। মানসম্মত আবাসনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৫০ হাজার টাকা মাসিক আয়। এক লাখ টাকার কম আয় হলে ভালো মানের ফ্ল্যাট পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
বাংলাদেশে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ অনুযায়ী, বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া দুই বছরের মধ্যে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে মালিকরা প্রায়ই নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়াচ্ছেন। আইনজীবী সুলতান মাহমুদ বলেন, আইন অনুযায়ী অযৌক্তিক ভাড়া আদায়যোগ্য নয়। কিন্তু সুনির্দিষ্ট চুক্তি না থাকায় ভাড়াটিয়ারা আইনি পথে যেতে ভয় পান বা আগ্রহ হারান।
ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি বাহারানে সুলতান বলেন, বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়ানোর ব্যাপারে আইন-কানুন, নিয়মনীতি কোনো কিছুই তারা মানছেন না। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর উদ্যোগ প্রয়োজন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









