শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে ঢাকা

প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম

আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১১ এএম

ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে ঢাকা

# সবচেয়ে বেশি শনাক্ত রাজধানীর উত্তরায়
# আক্রান্ত হয়ে মারা যান বাণিজ্য সচিব
# আগেই সতর্ক করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা
# সর্তক বার্তা দেওয়া হয় ডব্লিওইএচওকে

হালকা জ্বর অনুভব করে গত ৯ এপ্রিল শেষ অফিস করেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। বেশ কয়েক দিন শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করলে গত ১৩ এপ্রিল মাহবুবুর রহমানকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে সময় তার শরীরে রক্তের প্লাটিলেট আশঙ্কাজনক হারে কমে গিয়েছিল। হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকাকালীন পরীক্ষায় তার শরীরে ম্যালেরিয়া শনাক্ত হয়। অবস্থা খারাপ হলে ১৩ এপ্রিল ভর্তি হন হাসপাতালে। অবশেষে ম্যালেরিয়ার কাছে হার মেনে গতকাল শুক্রবার ভোরে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এদিন ভোর ৬টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর।

সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা বাণিজ্য সচিবের মৃত্যুর পর নগরবাসীর মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। জনমনে প্রশ্ন- পাহাড়ি অঞ্চল ভেদ করে খোদ রাজধানীতে কি ম্যালেরিয়া মশার বিস্তার ঘটছে। এই মশা ও লার্ভা পাওয়ার ঘটনায় শহরাঞ্চলেও ম্যালেরিয়া প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা তৈরি হলো বলে মনে করছেন গবেষকরা। এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিতে পারছেন না অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারাও। তারা মনে করছেন, ঢাকায় যেহেতু বিভিন্ন সময় ম্যালেরিয়া রোগী পাওয়া গেছে, তাই ভবিষ্যতে এসব রোগী ও মশার সান্নিধ্য ঘটলে রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে। গবেষকরা ইতোপূর্বে সরকার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) সর্তক করেছিলেন, বর্তমান ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা।

ঢাকায় ম্যালেরিয়া রোগের বাহক অ্যানোফিলিস মশা ও মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এর আগে অল্পবিস্তর কিছু মশা পাওয়া গেলেও ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এবারই প্রথম এই মশার পাশাপাশি মশার লার্ভা পেলেন গবেষকরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তারা এত দিন ঢাকার বাইরে থেকে আসা কিছু ম্যালেরিয়া রোগী পেলেও অ্যানোফিলিস মশা বা মশার লার্ভা পায়নি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একদল গবেষক ঢাকার কিছু এলাকায় পূর্ণাঙ্গ অ্যানোফিলিস মশা ও মশার লার্ভা পান। 

জানা গেছে, গত সপ্তাহে রাজধানীতে ম্যালেরিয়া মশার বিস্তারের গবেষণার একটি রিপোর্ট ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কাছে তুলে দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বিশিষ্ট কীটতত্ববিদ ও মশা গবেষণা বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশার। ওই রিপোর্টে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অস্তিত্ব পাওয়া গেছে ম্যালেরিয়ার মশার। সববেচে বেশি অস্তিত্ব ছিল উত্তরায়। এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ঢাকাস্থ ডব্লিউএচও’র কার্যালয়ে ই-মেইল বার্তা দিয়েও সর্তক করেছেন ড. কবিরুল বাশার। মশা গবেষণা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার মন্তব্য করেন, সার্ভে করতে গিয়ে গত সপ্তাহে ঢাকার উত্তরার বিভিন্ন স্থানে অ্যানোফিলিস মশা (ম্যালেরিয়া) পেয়েছি ছয় প্রজাতির। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তিন ধরনের ম্যালেরিয়ার ১০০-এর বেশি মাহক মশার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ম্যালেরিয়া মশা আছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আরবান এরিয়ায়। ফলে ঢাকাতে এর অস্তিত্ব থাকবে না, সেটি ভাবা ঠিক নয়। 

প্রসঙ্গত, ম্যালেরিয়ার প্রধান বাহক হলো স্ত্রী প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা। এ মশাগুলো প্লাজমোডিয়াম নামক পরজীবী বহন করে, যা ম্যালেরিয়া রোগ সৃষ্টি করে মানুষের শরীরে। সাধারণত, সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত কামড়ায় এ মশা। 

জানা যায়, গত বছর দেশে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু হয় মোট ১৬ জনের। ২০১৬ সালের পর দেশে ম্যালেরিয়ায় এত বেশি মৃত্যু দেখা যায়নি আর কোনো বছরে। ওই বছর মারা যাওয়া ১৬ জনের মধ্যে ৯ জনই মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য। মূলধারার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমলেও নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে রাজধানীতে ম্যালেরিয়ায় বাণিজ্য সচিবের মৃত্যু। তবে গবেষকরা বলছেন, যেহুতু বাণিজ্য সচিব ১৫ দিন আগে আফ্রিকা সফর করেছেন সেহুতু ধারণা করা হচ্ছে, সেখানেই তিনি আক্রান্ত হতে পারেন ম্যালেরিয়া মশার মাধ্যমে। 

এদিকে বর্তমানে কেবল ম্যালেরিয়ার বাহক অ্যানোফিলিস নয়, আরও নানা প্রজাতির মশার বিস্তার বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। গবেষকদের দাবি, ম্যালেরিয়ার মশা এখন ছড়িয়ে পড়ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি নতুন নতুন এলাকায়। যদিও সরকার ২০২৪-২০৩০ সালের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ২০৩০ সালের মধ্যে। বর্তমানে দেশে ম্যালেরিয়ামুক্ত বলে দাবি করা হয় ৫১ জেলাকে। 

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ছিল প্রতিবছর ০.০১৮৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশেষ করে শীতকাল আগের চেয়ে উষ্ণ হচ্ছে, যা দীর্ঘায়িত করছে মশার বংশবিস্তারের মৌসুমকে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, মশার প্রজননের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মশা ও পরজীবী উভয়ের জন্যই অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে বাংলাদেশের বর্তমান গড় তাপমাত্রা (২৫ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে আরও দীর্ঘ সময় ধরে। 

ডিসপারিটিজ ইন রিস্কস অব ম্যালেরিয়া অ্যাসোসিয়েটেড উইথ ক্লাইমেটিক ভ্যারিয়াবিলিটি অ্যামাং উইমেন, চিলড্রেন অ্যান্ড এলডারলি ইন দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস অব বাংলাদেশ শীর্ষক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আবহাওয়ার পরিবর্তন পার্বত্য অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিকে প্রভাবিত করছে বিভিন্নভাবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে মশার প্রজনন ও জীবাণুর বিকাশ হয় দ্রুত। গবেষণায় উঠে এসেছে, শিশু ও বয়স্কদের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে অতিরিক্ত বৃষ্টির সময়, আর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সময় ম্যালেরিয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায় নারীদের মধ্যে।

জানা যায়, দেশে একসময় বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা ছিল ম্যালেরিয়া। তবে গত দেড় দশকে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় অনেক কমে এসেছিল আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার। ২০১০ সালে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হলেও ২০১২ সালে তা কমে নেমে আসে ৬ হাজারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এই সাফল্যের ধারা; ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন ১৬ হাজার ৫৬৭ জন এবং ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার ১৫৬ জনে। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় এখনও পুরোপুরি ঝুঁকি দূর হয়নি এই রোগের। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৪ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে ২০২১ সাল পর্যন্ত কমেছে। কিন্তু ২০২২ এবং ২০২৩ সালে সে সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করে। যদিও আক্রান্তের হিসেবে মৃত্যুর সংখ্যা খুবই কম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১২ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে দেশে ম্যালেরিয়ায় সর্বোচ্চ সংখ্যক আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে। ওই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ সালে দেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫৭ হাজার ৪৮০জন। তাদের মধ্যে মারা গিয়েছিলেন ৪৫ জন।

এরপর ২০১৫ সালে আক্রান্ত হন ৩৯ হাজার ৭১৯ জন, তাদের মধ্যে মারা যান নয় জন। পরের বছর ২০১৬ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে ২৭ হাজারে নামলেও মৃত্যু আবার বেড়ে যায়। সে বছর মারা যান ১৭ জন। এরপর ২০১৭ সালে আক্রান্ত হন ২৯ হাজার ২৪৭ জন, যাদের ১৩জন মারা যান। পরের বছর ২০১৮ সালে আক্রান্ত হন ১০ হাজার ৫২৩ জন আর মারা যায় সাত জন। কিন্তু পরের বছরইআবার আক্রান্তের হার বেড়ে যায়, ২০১৯ এ আক্রান্ত হন ১৭ হাজার ২৫৫জন। ওই বছর মৃত্যুর সংখ্যা ছিল নয় জন। এরপর ২০২০ এবং ২০২১ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল আগের ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। কোভিড মহামারির বছর ২০২০ সালে ছয় হাজার ১৩০জন আক্রান্ত হন ম্যালেরিয়ায়। পরের বছর ২০২১ সালে এ সংখ্যা ছিল সাত হাজার ২৯৪। ওই দুই বছরই মারা যান নয় জন করে মানুষ। 

কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালে আবার বেড়ে যায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা। সে বছর ১৮ হাজার ১৯৫ জন আক্রান্তের বিপরীতে মারা যান ১৪ জন। এরপর ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন ১৬ হাজার ৫৬৭ জন, বিপরীতে মারা গিয়েছিলেন ছয় জন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে শুধু বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলা থেকেই শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৫০১ জন। সর্বশেষ গত বছর দেশে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু হয় মোট ১৬ জনের। ২০১৬ সালের পর দেশে ম্যালেরিয়ায় এত বেশি মৃত্যু দেখা যায়নি আর কোনো বছরে। ওই বছর মারা যাওয়া ১৬ জনের মধ্যে ৯ জনই মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়োপযোগী উদ্যোগের অভাবে ২০৩০ এর মধ্যে সরকারের ‘জিরো ম্যালেরিয়া’লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে না। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ম্যালেরিয়া পুরোপুরিভাবে নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ জন্য সরকার নানা কর্মসূচি পালন করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবস্থাপনাসহ নানা দুর্বলতার কারণে আগামী ছয় বছরের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষ ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, কয়েক বছর আগেও ম্যালেরিয়া নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ কার্যকরী কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিলো। সেটি অব্যাহত থাকলে সরকার তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারতো। কিন্তু বর্তমান কৌশলে ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া পুরোপুরিভাবে নির্মূল সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেছেন, এখন ম্যালেরিয়া নির্মূলে শুধুমাত্র কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ ও কর্মীদের মাধ্যমে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা পদ্ধতি চালু রয়েছে। এই দুই পদ্ধতি ম্যালেরিয়া কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকছে, পুরোপুরি নির্মূল হচ্ছে না। তিনি বলেন,আগে ঢাকায় শতাধিক হটস্পট নির্ধারণ করে সেগুলোতে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণের কারণে ম্যালেরিয়া অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণ হয়েছিলো। তবে, পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় এই প্রক্রিয়ায় ম্যালেরিয়া নির্মূলে কিছু সংকট রয়েছে বলেও জানান এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। 

ম্যালেরিয়ার কেন হয়? লক্ষণ কী?
স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু ছড়ায়। বাংলাদেশে মোট ৩৬ প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা দেখা যায়, এদের মধ্যে সাতটি প্রজাতি বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়। অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেছেন, এই সাত প্রজাতির মধ্যে চারটি প্রজাতি ম্যালেরিয়ার প্রধান বাহক বাংলাদেশে। সংক্রমিত অ্যানোফিলিস জাতীয় স্ত্রী মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া শুরু হয়। পরে ম্যালেরিয়ার জীবাণু লালার মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং যকৃতে পৌঁছে। সেখানে তারা পরিপক্ব হয় এবং বংশ বৃদ্ধি করে। অ্যানোফিলিস মশা যখন অন্য কাউকে কামড়ায়, তখন তার রক্তে ম্যালেরিয়ার জীবাণু ছড়ায় এবং সেও আক্রান্ত হয়।

ম্যালেরিয়াবাহী মশা মূলত সন্ধ্যা থেকে ভোরের মধ্যে কামড়ায়। চিকিৎসকরা বলছেন, কারো ম্যালেরিয়া হলে কিছু লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা যায়। এই রোগের প্রধান লক্ষণ কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা। জ্বর ১০৫-১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। তবে অনেক সময় জ্বর আসা-যাওয়া করে নিয়মিত ও নির্দিষ্ট বিরতিতে, যেমন একদিন পর পর জ্বর এসে তা তিন-চার ঘণ্টা দীর্ঘ হতে পারে। এরপর ঘাম দিয়ে জ্বর কমে যায়। 

এছাড়া অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে- মাঝারি থেকে তীব্র কাঁপুনি বা শীত শীত, মাথা ধরা, অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বমি বমি ভাব ও বমি, হজমে সমস্যা, অত্যধিক ঘাম হওয়া, খিচুনি, পিপাসা কম লাগা, ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভব করা, মাংসপেশি বা তলপেটে ব্যথা, রক্তশূন্যতা।

মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়া জনস্বাস্থ্যের অন্যতম শত্রু। পৃথিবীতে ২০২১ সালে এটি ৬,১৯,০০০ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল, যাদের মধ্যে প্রায় ৯৬% আফ্রিকায়। মশাপ্রবণ পরিবেশে এটি সারস-কোভ-২-এর ওমিক্রনের তুলনায় ৬-২০ গুণ বেশি ছড়িয়ে পড়ে। ১৬০০-এর দশকে এই রোগটি আমেরিকার মধ্য ছড়িয়ে পড়ে এবং উত্তরে আর্কটিক উপকূল পর্যন্ত এবং পূর্বে জাপান পর্যন্ত পৌঁছেছিল। কিন্তু আমরা এখন রোগ নির্মূলের দিকে অগ্রগতির পর ম্যালেরিয়াজনিত অসুস্থতা এবং মৃত্যু থেকে প্রতি বছর কমে আসছে। 

বাংলাদেশেও মশাবাহিত রোগের মধ্যে অন্যতম হলো ম্যালেরিয়া। অ্যানোফিলিস মশার সাতটি প্রজাতি বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়।  এরমধ্যে চারটি প্রজাতিকে প্রধান বাহক বলা হয়। বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা এবং বর্ডার এরিয়ার মোট ১৩ জেলায় ৭২টি উপজেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ২০০০ সালের পর সবচেয়ে বেশি ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা যায় ২০০৮ সালে। ২০০৮ সালে ৮৪ হাজার ৬৯০ জন মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং ১৫৪ জন মারা যায়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এই সংখ্যাটি কমে রোগী হয় ১৭ হাজার ২২৫ জনে। ২০২২ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৮ হাজার ১৯৫ জন লোক চিকিৎসা নিয়েছে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৪ জন লোক মারা গেছেন। ম্যালেরিয়ার বাহক অ্যানোফিলিস মশা গ্রীষ্ম-বর্ষায় বেশি জন্মায় এবং এই সময়ে রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়।

বাংলাদেশের তিনটি পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ম্যালেরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। এই তিনটি জেলার মধ্যে বান্দরবান জেলার তিনটি উপজেলা লামা, আলীকদম ও থানছি সবচেয়ে বেশি ম্যালেরিয়া ঝুঁকিতে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং গ্লোবাল ফান্ডের আর্থিক সহায়তায় জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি বছরব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে।

ম্যালেরিয়া রোগের পাশাপাশি পৃথিবীতে অনেক সংক্রামক রোগ পুনরায় আবির্ভূত হচ্ছে এবং হবে। আদিকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সংক্রামক রোগ মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে আসছে। প্রাচীনকালে বাইবেলের প্লেগ এবং এথেন্সের প্লেগ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের ব্ল্যাকডেথ, ১৯১৮ সালের ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ মহামারি এবং অতি সম্প্রতি ডায়রিয়া ও এইচআইভি/এইডস, ডেঙ্গু,  জিকা, চিকুনগুনিয়া মহামারি, সংক্রামক রোগগুলো ক্রমাগতভাবে উত্থিত এবং পুনরুত্থিত হয়েছে। এই রোগগুলোর পুনরুত্থান রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সব অনুমানকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.