মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণে কার্যত পানির নিচে চলে গেছে রাজধানী ঢাকা। নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে রবিবার (১২ জুলাই) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিরামহীন বৃষ্টিতে অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক সবখানেই সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে রাজধানীর জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার ভোর পর্যন্ত সর্বশেষ ছয় ঘণ্টায় ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মাসে স্বল্প সময়ে হওয়া সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের অন্যতম। সংস্থাটি জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দিনভর থেমে থেমে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
টানা বর্ষণে রাজধানীর বনানী, গুলশান, বারিধারা, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর, ধানমন্ডি-২৭, নিউমার্কেট, গ্রিন রোড, মতিঝিল, মোহাম্মদপুরের একাংশ, মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকা, ইসিবি, মালিবাগ, সায়েদাবাদ, আগারগাঁও থেকে জাহাঙ্গীর গেটমুখী নতুন সড়ক, খামারবাড়ি থেকে ফার্মগেট, ফার্মগেট-তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকা, শনির আখড়া, পুরান ঢাকার বংশাল ও নাজিমউদ্দিন রোড, মিরপুরের শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুর-১৩, কালশী, হাতিরঝিলের একাংশ, গুলশান লেকপাড়, কালাচাঁদপুরসহ অসংখ্য সড়ক ও অলিগলি পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও আবার কোমরসমান পানি জমে থাকতে দেখা যায়।
জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সড়কে জমে থাকা পানিতে অনেক বাস, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, সিএনজি ও মোটরসাইকেল বিকল হয়ে পড়ে। কয়েকটি এলাকায় যানবাহনের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চালকদের ঠেলে গাড়ি সরাতে দেখা যায়। এতে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
গণপরিবহনের সংকট দেখা দেওয়ায় অনেক যাত্রীকে বৃষ্টিতে ভিজেই দীর্ঘ সময় বাসের অপেক্ষা করতে হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে পানি বেশি থাকায় অনেক এলাকায় রিকশা ও ভ্যানচালকেরাও চলাচল করতে পারেননি। ফলে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে হেঁটেই গন্তব্যে রওনা দেন।
টানা বর্ষণে অনেক অলিগলি, বাসাবাড়ির প্রবেশপথ, দোকানপাটের সামনের অংশ এবং নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও নর্দমার পানি উপচে সড়কে মিশে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। অনেক দোকানে পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা তড়িঘড়ি করে পণ্য উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখেন।
মিরপুর এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলাম বলেন, “সকালে অফিসে বের হয়ে মনে হয়েছে রাস্তা নয়, যেন খাল পার হচ্ছি। কোথায় ম্যানহোল আছে, কোথায় গর্ত আছে কিছুই বোঝার উপায় ছিল না। কাপড়, জুতা সব ভিজে গেছে। প্রতিবার বর্ষায় একই কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। এত উন্নয়নের কথা শোনা যায়, কিন্তু বৃষ্টি হলেই সবকিছু পানির নিচে চলে যায় ঢাকায়।”
বিজয় সরণি ও তেজগাঁও হয়ে হাতিরঝিলের দিকে আসা সিএনজিচালক জাহিদুর রহমান বলেন, “আসার পথে একাধিক সড়ক ও অলিগলি পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে থাকতে দেখেছি। জমে থাকা পানিতে দু-একটি সিএনজির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চালকদের ঠেলে নিয়ে যেতেও দেখেছি। বলতে গেলে পুরো ঢাকা শহরের প্রায় সব সড়কেই জলাবদ্ধতা ছিল।”
এদিকে জলাবদ্ধতার কারণে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। রোববার বেলা ১১টার পর দেওয়া এক বার্তায় ট্রাফিক পুলিশের গুলশান বিভাগ জানায়, টানা বৃষ্টিতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাকলী র্যাম্পের নিচের অংশ, বনানী, খিলক্ষেত, ঢাকা গেটসহ রাজধানীর বিভিন্ন নিচু এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। মোটরযান চালক ও পথচারীদের জলাবদ্ধ এলাকায় ধীরগতিতে চলাচল, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং সম্ভব হলে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করার পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা মেনে ধৈর্য ধরে চলাচলের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, “টানা ভারী বর্ষণে সাময়িক জলজট তৈরি হলেও আমাদের কর্মীরা ভোর থেকেই মাঠে রয়েছে। জলাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে নগরজীবন স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
অন্যদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি গুলশান, বনানী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে, জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের সড়কসহ বিভিন্ন জলাবদ্ধ এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
তবে বছরের পর বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় এবং ঢাকা ওয়াসা থেকে নালা ও খালের দায়িত্ব দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হলেও রাজধানীর জলাবদ্ধতা সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষা শুরুর আগেই সামান্য বৃষ্টিতে নাকাল হচ্ছে নগরবাসী। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনার কথা জানানো হলেও অকেজো পাম্প স্টেশন ও স্লুইসগেট, অবৈধ দখল, প্লাস্টিক ও বর্জ্যে ভরাট হয়ে যাওয়া খাল এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে রাজধানীতে জলজটের পুরোনো চিত্রই ফিরে এসেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতার পেছনে একসঙ্গে পাঁচটি বড় সংকট কাজ করছে। সড়কের ক্যাচপিটের ছিদ্র আবর্জনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া, ড্রেনে পলি ও কাদা জমে থাকা, অবৈধ দখলে প্রধান খাল হারিয়ে যাওয়া, পাম্পিং স্টেশনগুলোর অকার্যকারিতা এবং আশপাশের নদ-নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি ক্যাচপিট থেকে ড্রেন, ড্রেন থেকে খাল এবং খাল হয়ে নদীতে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে প্রতি বর্ষাতেই রাজধানীবাসীকে একই ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়, দফায় দফায় সভা এবং নানা প্রতিশ্রুতির পরও সমস্যার গভীরে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় প্রতি বছর বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতার পুরোনো সংকট নতুন করে ফিরে আসে।এই সংস্করণে আপনার আগের সংবাদ ও নতুন আপডেটের সব তথ্য অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে, তবে পুনরাবৃত্তি বাদ দিয়ে আরও সাবলীল ও সংবাদপত্রের উপযোগী ধারায় সাজানো হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









