মাগুরার আকাশে-বাতাসে এখন শুধু লিচুর ঘ্রাণ। গাছের ডালে ডালে ঝুলছে লাল টুকটুকে হাজরাপুরি লিচুর থোকা, আর সেই দৃশ্য যেন নতুন স্বপ্ন বুনছে হাজারো কৃষকের চোখে। স্বাদ, গন্ধ ও রসালো মিষ্টতায় দেশজুড়ে খ্যাত মাগুরার একমাত্র জিআই স্বীকৃত পণ্য ‘হাজরাপুরি লিচু’ এবার বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে ফুটিয়েছে স্বস্তির হাসি।
অনুকূল আবহাওয়া, রোগবালাই কম থাকা এবং বাজারে ব্যাপক চাহিদার কারণে এ মৌসুমে জেলার লিচু বাগানগুলোতে যেন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। মৌসুমের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা ছুটে আসছেন মাগুরায়। সদর উপজেলার হাজরাপুর, ইছাখাদা, মির্জাপুর, হাজিপুর, নড়িহাটি, মিঠাপুর ও শিবরামপুর এলাকার বাগানগুলো এখন সরগরম লিচু সংগ্রহ, বাছাই ও বাজারজাতকরণে।
দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজ পাতার ফাঁকে কেউ যেন লাল মুক্তোর মালা ঝুলিয়ে রেখেছে। কৃষকদের ভাষায়, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ফলন অনেক বেশি এবং গুণগত মানও ভালো।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মাগুরা জেলায় প্রায় ৬৭১ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলাতেই সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে। শুধু সদর উপজেলাতেই রয়েছে তিন হাজারের বেশি বাণিজ্যিক লিচু বাগান। কৃষি বিভাগের আশা, এবার প্রায় ১০০ কোটি টাকার লিচু বাণিজ্য হতে পারে।
হাজরাপুর এলাকার এক লিচু চাষি বলেন, “এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় গাছে প্রচুর লিচু ধরেছে। বাজারদরও মোটামুটি ভালো। যদি শেষ পর্যন্ত দাম ঠিক থাকে, তাহলে আমরা লাভবান হবো।”
আরেক কৃষক জানান, জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর হাজরাপুরি লিচুর আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে। এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা সরাসরি বাগানে এসে লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও হাজরাপুরি লিচুর স্বাদ ও মিষ্টতা অন্য যেকোনো লিচুর চেয়ে আলাদা। আগাম জাত হওয়ায় বাজারেও এর চাহিদা বেশি। বর্তমানে প্রতিশত দেশি লিচু ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বোম্বাই ও মোজাফফরী জাতের দাম আরও বেশি।
লিচুর এই মৌসুম ঘিরে মাগুরার গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। বাগান পরিচর্যা, লিচু সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থান। নারী ও শিক্ষার্থীরাও খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত হয়ে বাড়তি আয় করছেন।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত “হাজরাপুরি লিচু মেলা-২০২৬” -এ বক্তারা বলেন, হাজরাপুরি লিচু এখন শুধু মাগুরার গর্ব নয়, এটি দেশের ঐতিহ্যবাহী এক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। জিআই স্বীকৃতির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারেও এ লিচুর সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
মাগুরার লিচু বাগানগুলো এখন শুধু ফলের বাগান নয়—সেগুলো যেন কৃষকের স্বপ্ন, শ্রম আর সাফল্যের রঙিন গল্প।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









