লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমি নামে একটি বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস থেকে ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের (১৫) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ খন্দকার আবদুল মান্নানসহ ৭ শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১০ জনের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সন্ধায় রামগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন মেহেদী হাসানের পিতা জিয়াউদ্দিন।
মেহেদী হাসানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে টানা তিন দিন ধরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে রামগঞ্জে। সহপাঠী ও এলাকাবাসীর টানা বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও মানববন্ধনে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে শহর।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন ১৬ জুন সন্ধা ৭টা ৪০ মিনিটে অজ্ঞাত ফোন থেকে মেহেদী হাসানের পিতা জিয়া উদ্দিনের মোবাইল নম্বরে কল দিয়ে জানানো হয় ছেলে মারাত্মক অসুস্থ্য। দ্রুত বিদ্যালয়ে যেতে হবে। পরে মেহেদীর মা ও নিকটাত্মীয়রা স্কুলে গিয়ে জানতে পারেন সে চাটখিল সরকারি হসপিটালে চিকিৎসাধীন। সেখানে গিয়ে তারা দেখে মেহেদী মারা গেছেন।
আরও জানা যায়, আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা তাকেসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিকভাবে নির্যাতন ও হয়রানি করতো। এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগও করা হয়েছে। কয়েকদিন আগে দ্বাদশ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর ফোন চুরি হওয়ার ঘটনায় মেহেদীসহ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে বেধম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে মামলায় অভিযুক্তরা।
আরও পড়ুন: শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার, অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ বিদ্যালয়
এ বিষয়ে একাডেমির অধ্যক্ষকে লিখিতভাবে জানানোর পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়ায় তাকে আবারও বেধম মারধর এবং মানসিকভাবে নির্যাতন করলে তার মৃত্যু হয়।
নিহত মেহেদীর মা শারমিন আক্তার বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে বলেন, “আমার ছেলেকে দুদিন ধরে নির্যাতন করা হয়েছে, অথচ স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের কিছুই জানায়নি। এমনকি মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অধ্যক্ষের কাছে গাড়ি চাইলেও তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন।”
ফরিদ আহমদ ভূঁইয়া একাডেমির জেষ্ঠ্য প্রভাষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘‘মেহেদীকে মারধরের অভিযোগে দ্বাদশ শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি চলছিল। এর মধ্যেই খবর পাই মেহেদী গলায় ফাঁস দিয়েছে। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’’
মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাতে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত জনতা একাডেমির প্রধান ফটক ও অভ্যর্থনা কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বারে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
পরদিন বুধবার (১৭ জুন) মরদেহ নিয়ে থানার সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন স্বজনরা। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকাল থেকে রামগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েকশ শিক্ষার্থী শহরের প্রধান সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
এদিকে শুক্রবার (১৯ জুন) নিহত মেহেদী হাসানের কবর জিয়ারত করতে এসে তার মা-বোনদের সঙ্গে কথা বলেন লক্ষ্মীপুর-১ রামগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম। এ সময় তিনি খুনিদের শাস্তি দেওয়ার আশ্বাস দেন।
রামগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী জানান, ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছি। অধ্যক্ষ খন্দকার আবদুল মান্নানসহ আরো ৭ শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ১০ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন মেহেদী হাসানের পিতা।’’
এ ব্যাপারে রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী আতিকুর রহমান বলেন, ‘‘আমি শিক্ষার্থীর জানাজায় অংশগ্রহণ করেছি। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









