ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা সীমান্ত দিয়ে বুড়িমারী জিরোপয়েন্টের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আন্তঃসীমান্ত ধরলা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর সংলগ্ন ধরলা নদীপাড়ের শত শত পরিবার। এ বছর বর্ষা মৌসুমের আগেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদী তীরবর্তী ফসলি জমি ও গাছপালা। এখনো যাদের ঘরবাড়ি নদীর তীরে যেকোনো সময় বসতঘর ও জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উদ্বেগ আর উৎকন্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। হুমকির মুখে রয়েছে স্থানীয় স্কুল, মসজিদ, কবরস্হানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
ভাঙন-রোধ ও নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধারে দ্রুত স্থায়ী কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে পুরো একটি গ্রাম, ব্যাহত হতে পারে আন্তর্জাতিক স্থলবন্দরের কার্যক্রম।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জিরোপয়েন্ট বাঁধের পাড় হতে নুর ইসলাম মিস্ত্রির বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার শত শত বাড়ি ধরলার তীব্র ভাঙ্গনের কবলে রয়েছে। নদীটি ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে উৎপন্ন হয়ে চ্যাংরাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, প্রবেশপথ থেকে নদীটি বেঁকে গিয়ে বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিম অংশে ভাঙনের কবলে পড়ে, আবার উত্তর-দক্ষিণ অংশে ধরলার তীব্র ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদী তীরবর্তী আবাদি জমি। ধরলার ভাঙ্গণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঐ গ্রামের একটি কবরস্থান।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯৯৪ সালে, ধরলার নদীর পশ্চিমের কিছু অংশে তীর সংরক্ষণ কাজ করা হয়। পাথরের ব্লক আর বস্তা নদীর পশ্চিম তীর বেধে দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৯৪ সালের পর থেকে ধরলার এই পয়েন্ট প্রতি বছর নদী ভাঙন দেখা দিলেও স্থায়ী কোনো বাঁধ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে নদীর নাব্যতা রক্ষায় খনন এবং ভাঙ্নরোধে কোন জিও ব্যাগ ডাম্পিং ব্যবস্হা গ্রহণ করেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। পানির স্রোত কমে গেলেও
অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে মাটি কাটা এবং বর্ষায় পানি বাড়লে ধরলার তীব্র বাঁকে এই ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। নদীপাড়ের মানুষ এখন প্রতিটা মুহূর্ত পার করছে চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে।
স্থানীয় কৃষক সাইদুল ইসলাম জানান- ধরলার গর্ভে আমার আবাদি জমি চলে গেছে। এখন শেষ সম্বল বাড়ি ভাঙলে আমরা কোথায় যাবো জানি না।
আরেক কৃষক বকুল মিয়া বলেন, ২১ শতক জমি হারায় আমি নিঃস্ব। এই ক্ষতিপূরণ দিবে কে। সরকারকে অনুরোধ জানাই আমার মতো আর কেউ যেন এই ভাঙ্গণে না পড়ে।
ধরলা নদীর অংশে গড়ে ওঠা আম বাগানের মালিক মেহেদী হাসান নাইম বলেন, ধরলার বুকে ১.৫ একর জমিতে হাড়ীভাঙ্গা আম বাগান। নদীটি খনন না করার কারণে আম বাগানটির কিছু অংশ ভেঙ্গে গেছে, তীব্র আকার ধারণ করলেও নদী ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নিচ্ছে না।
এ বিষয়ে ১ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাজেদুল হুদা সিয়াম বলেন, নদী পাড়ের মানুষের এই আর্তনাদ ও ভাঙন ঝুঁকি নিরসনে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, সরকারের পালাবদল হয় কিন্তু বুড়িমারীর এই অংশে নদী ভাঙ্গনের মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না।
এদিকে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগীরা দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ড মাধ্যমে ভাঙন প্রতিরোধে জরুরি জিওব্যাগ ডাম্পিং এবং স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রতি বছরের এই সময়ে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করলেও স্থায়ী কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা কৃষি অফিসার মোস্তফা হাসান ইমাম বলেন, ‘‘জিরোপয়েন্ট বাঁধের পাড় ধরলার অংশের বিষয়টি মনিটরিং করা হয়েছে। নদীর ভাঙন রোধ এবং নদী তীর সংরক্ষণ জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই পানি উন্নয়ন বোর্ড ধরলা নদীর ভাঙন রোধে সিসি ব্লক নির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবেন।’’
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, ‘‘পাটগ্রাম ধরলা নদীর অংশে ভাঙন রোধ এবং নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজের জন্য আমাদের কারিগরি টিম ভিজিট করেছে, প্রকল্পের অনুমোদন পেলেই বাঁধ সুরক্ষায় জিও ব্যাগ ডাম্পিংসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেওয়া হবে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









