মৌলভীবাজার থেকে বন্যার পানি যত নামছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রকৃতির এক নির্মম ধ্বংসলীলা। জেলাজুড়ে এখন শুধুই ক্ষতচিহ্ন আর হাহাকার। বিশেষ করে কমলগঞ্জ ও রাজনগর উপজেলায় বানের তোড়ে নিমেষেই ভেসে গেছে হাজারো কৃষকের সোনালী স্বপ্ন, ধসে পড়েছে গ্রামীণ যোগাযোগের মেরুদণ্ড আর লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে মৎস্য খাত। পানি কমার সাথে সাথে এখন কেবলই দৃশ্যমান হচ্ছে অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির এক করুণ বাস্তব চিত্র।
মৌলভীবাজার এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের দুই উপজেলা কমলগঞ্জ ও রাজনগরে ৩৩টি গ্রামীণ সড়কে প্রায় ৯৫ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৪টি ব্রিজ ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে কেবল কমলগঞ্জ উপজেলাতেই এলজিইডির আওতাভুক্ত গ্রামীণ সড়কসহ প্রায় ৫০ কিলোমিটার রাস্তা বিনষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রকৌশলী সাইফুল আজম।
অপরদিকে কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পানিতে জেলাজুড়ে ২৪৮ হেক্টর আউশ ধান, ৮৬.৫ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা এবং খরিফ-২ এর আরও ৬৪.৫ হেক্টর সবজি খেত আক্রান্ত হয়েছে।
সরজমিনে কমলগঞ্জ উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, বানের পানিতে কৃষকের ফসলি জমি, বীজতলা ও সবজি খেত ভেসে গেছে। আলাপকালে উপজেলার মোখাবিল এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত টমেটো চাষী আব্দুর রহিম বলেন, ঋণ করে ২ বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছিলাম। বানের পানিতে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব, তা ভেবেই রাতে ঘুমাতে পারি না।’
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, ‘বন্যায় এ উপজেলায় ৭০ হেক্টর ধানি জমি, ৩০ হেক্টর আউশ বীজতলা এবং ২৬ হেক্টর সবজি খেত আক্রান্ত হয়েছে। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও ক্ষতি নিরূপণ করা সম্ভব হবে।’
তবে দুর্যোগের এই মুহূর্তে কৃষকদের আশার বাণী শুনিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আউশ, রোপা আমনের বীজতলাসহ সবজি বন্যায় আক্রান্ত হলেও আমরা কৃষকদের পাশে আছি। বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারিভাবে প্রণোদনা, বীজ ও সার বিতরণসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, যাতে কৃষকরা দ্রুত আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মোঃ আরিফ হোসেন বলেন, জেলার কমলগঞ্জ ও রাজনগর উপজেলায় বন্যার পানিতে তলিয়ে ৪০৫টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে, যার ফলে মৎস্য চাষিরা বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
মৌলভীবাজার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বন্যায় প্রাথমিকভাবে জেলাজুড়ে ৯৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য মিলেছে। তবে পানি পুরোপুরি কমে যাওয়ার পর ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।’
বন্যা পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতি প্রসঙ্গে মৌলভীবাজারের জেলা প্রসাশক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘আমরা বন্যাকবলিত এলাকাগুলো সশরীরে পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে। বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। তালিকা সম্পন্ন হলে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সব ধরনের সহায়তা করা হবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









