একসময় নদী, শিক্ষা ও সংস্কৃতির নগরী হিসেবে পরিচিত বরিশাল এখন আরেকটি উদ্বেগজনক বাস্তবতার মুখোমুখি। নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে জনবহুল এলাকাগুলোতে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে মাদকের নেটওয়ার্ক। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ সমাজ। কিশোর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকের ভয়ংকর আসক্তিতে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ, পারিবারিক ভাঙন, মানসিক অবসাদ এবং সামাজিক অস্থিরতা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদকের সহজলভ্যতা, বন্ধুমহলের নেতিবাচক প্রভাব, পারিবারিক অশান্তি, মানসিক বিষণ্নতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন, এসব কারণ মিলেই তরুণদের একটি বড় অংশকে ঠেলে দিচ্ছে মাদকের অন্ধকার জগতে। ফলে এটি এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; বরং জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বরিশাল নগরীর অন্তত অর্ধশত এলাকায় নিয়মিত মাদক কেনাবেচা ও সেবন চলে। কাউনিয়া, ভাটিখানা, ত্রিশ গোডাউন, বেলস পার্কের হেলিপ্যাড, কেডিসি, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, রসুলপুর, পলাশপুর, বেলতলা, লামছড়ি, রূপাতলী, সাগরদী, বাংলাবাজার, ভাটারখাল, স্টেডিয়াম কলোনি, ওয়াপদা কলোনি, কাশিপুর বাজার, চর কাউয়া এবং কর্ণকাঠি চৌমাথাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই ইয়াবা ও গাঁজার কারবার চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাসিন্দাদের দাবি, মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও অনেক মাদক কারবারি কিছুদিন আত্মগোপনে থেকে আবারও একই কার্যক্রম শুরু করে। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ দুটোই বাড়ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক।
বরিশাল মহানগর পুলিশের (বিএমপি) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এক বছরে মহানগরের চার থানায় ৪৮৭টি মাদক মামলা হয়েছে।
অন্যদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের তথ্যে দেখা যায়, একই সময়ে জেলায় ১ হাজার ৯০৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ১ হাজার ৭৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি সাতটি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৬৪১ জন চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মামলার সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে, যা মাদকের বিস্তারের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলো বলছে, চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অধিকাংশই তরুণ।
দ্য নিউ লাইফ মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক মর্তুজা জুয়েল জানান, প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চারজন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। বর্তমানে তাদের কেন্দ্রে প্রায় ১০০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের প্রায় ৯০ শতাংশই তরুণ।
তার ভাষায়, কেউ বন্ধুর প্রভাবে, কেউ পারিবারিক অস্থিরতায়, আবার কেউ মানসিক অবসাদ থেকে মাদকের দিকে ঝুঁকেছে। প্রতিটি রোগীর পেছনে আলাদা গল্প রয়েছে। কারণ শনাক্ত করে কাউন্সেলিং ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।
সেভ দ্য লাইফ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন মিঠু বলেন, ‘‘তাদের কেন্দ্রে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ রোগীর বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশের নেতিবাচক প্রভাবই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আসক্তির মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে।’’
রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ও বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের সাবেক আবাসিক চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘মাদকাসক্তিকে শুধু অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না।’’
তার মতে, ‘‘এটি একটি মানসিক, সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত সংকট। তাই শাস্তির পাশাপাশি আক্রান্তদের বৈজ্ঞানিক ও মানবিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।’’
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. তপন কুমার সাহা বলেন, ‘‘একাকিত্ব, হতাশা, পারিবারিক অশান্তি, বিষণ্নতা এবং সঙ্গদোষ, এসব কারণেই তরুণদের বড় একটি অংশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কেবল আসক্তির চিকিৎসা নয়, কেন একজন তরুণ মাদক গ্রহণ শুরু করলেন, সেই কারণটিও সমাধান করতে হবে। পরিবার, চিকিৎসক ও সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে অধিকাংশ মাদকাসক্তকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’’
বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।’’
তার ভাষায়, ‘‘অভিভাবকদের সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। খেলাধুলা, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে পারলে মাদকাসক্তির ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।’’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক তানভীর হোসেন খান বলেন, ‘‘গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং মাদক পাচার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে।’’
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আশিক সাঈদ বলেন, ‘‘মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। নিয়মিত অভিযান চলছে এবং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নগরীকে মাদকমুক্ত করতে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।’’
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু গ্রেপ্তার, মামলা কিংবা অভিযান দিয়ে মাদকের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয়। পরিবারে সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, তরুণদের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বৃদ্ধি, সহজলভ্য কাউন্সেলিং এবং কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতে হবে। কারণ, আজ যে তরুণ মাদকের নেশায় হারিয়ে যাচ্ছে, সে-ই আগামী দিনের কর্মশক্তি, অভিভাবক ও রাষ্ট্রের সম্পদ।
তাই বরিশালে মাদকের বিস্তার রোধে এখন প্রয়োজন কেবল আইন প্রয়োগ নয়, বরং পরিবার, সমাজ, প্রশাসন ও রাষ্ট্রের সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং মানবিক উদ্যোগ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









