দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আবাসনের স্বপ্ন নিয়ে নির্মিত হয়েছিল তিনতলা একটি ছাত্রাবাস। সরকারি অর্থে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণের পর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৪ বছর। কিন্তু আজও সেখানে ওঠেনি কোনো শিক্ষার্থী। নেই কোনো তত্ত্বাবধায়ক, নেই পরিচালনা কমিটি, এমনকি ভবনটির দায়িত্ব কোন দপ্তরের, সেটিও স্পষ্ট নয়। বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থেকে এক সময়ের সম্ভাবনাময় এই ছাত্রাবাস এখন পরিণত হয়েছে মাদকসেবী ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে।
বরিশালের বাকেরগঞ্জ সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসসংলগ্ন বাসস্ট্যান্ডের দক্ষিণ পাশে মহাসড়কের পশ্চিমে অবস্থিত তিনতলা ছাত্রাবাসটি বর্তমানে জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের পাশাপাশি গভীর রাত পর্যন্ত ভবনটিতে চলে মাদকসেবন, জুয়া ও নানা ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ড। থানা পুলিশের অদূরেই এমন কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের অধিকাংশ কক্ষের দরজা-জানালা ও গ্রিল নেই। কোথাও ভাঙা দরজা, কোথাও খোলা কক্ষ। প্রতিটি তলায় ছড়িয়ে রয়েছে মদের খালি বোতল, সিগারেটের প্যাকেট, ইয়াবা সেবনের আলামত, ব্যবহৃত দিয়াশলাই, প্লাস্টিকের গ্লাস এবং নারীদের বিভিন্ন পোশাক। ভবনের ছাদেও দেখা যায় মাদকসেবনের চিহ্ন।
দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, বেরিয়ে এসেছে রড। বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ছাদের পানি চুঁইয়ে দেয়াল স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে। চারপাশ আগাছায় ঢেকে গেছে। সন্ধ্যা নামলেই পুরো ভবনটি যেন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়।
বাকেরগঞ্জ সরকারি কলেজ উপজেলার একমাত্র সরকারি কলেজ হওয়ায় প্রতিদিন দূর-দূরান্তের শত শত শিক্ষার্থী এখানে পড়তে আসেন। অনেকের বাড়ি নদী ও দুর্গম চরাঞ্চলে হওয়ায় নিয়মিত যাতায়াত তাদের জন্য কষ্টসাধ্য। সেই সমস্যার সমাধানেই নির্মাণ করা হয়েছিল ছাত্রাবাসটি।
কিন্তু তিন দশকের বেশি সময় ধরে ভবনটি তালাবদ্ধ থাকায় আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো শিক্ষার্থী।
কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্রাবাস চালু থাকলে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত। আবাসনের অভাবে অনেকেই ভোগান্তিতে পড়ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৭০ সালে এলাকার শিক্ষানুরাগীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় বাকেরগঞ্জ কলেজ। ১৯৭৮ সালে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয় প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৮৩ সালে নির্মিত হয় মূল একাডেমিক ভবন। পরে ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই কলেজটি সরকারি মর্যাদা লাভ করে।
এরপর ১৯৯২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অর্থায়নে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে ছাত্রাবাস নির্মাণের কাজ শুরু হয়। দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের আবাসনের কথা বিবেচনায় রেখে দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি। এরপর কেটে গেছে ৩৪ বছর, কিন্তু ভবনটি আর শিক্ষার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি।
শুধু ছাত্রাবাসই নয়, এর আশপাশের সরকারি জমিও দখলের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ছাত্রাবাসসংলগ্ন জমির একটি অংশ দখল করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দোকানঘর নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া আদায় করছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আ জ ম হাবিবুর রহমান জানান, কলেজটি ৬ একর ৩০ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ছাত্রাবাস নির্মিত স্থানের মোট ৫৩ শতাংশ জমির মধ্যে ২৭ শতাংশ কলেজের নামে রেকর্ডভুক্ত থাকলেও বাকি ২৬ শতাংশ জমি সর্বশেষ জরিপে স্থানীয় কয়েকজনের নামে রেকর্ড হয়েছে।
তিনি বলেন, জমি নিয়ে জটিলতার কারণে ২০১৯ সালে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার নম্বর ১৭৫৯/১৯। মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে। এ কারণেই ছাত্রাবাসটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাকেরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আদিল হোসেন বলেন, পরিত্যক্ত ছাত্রাবাসে মাদকসেবন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, যারা ওই ভবনে মাদকসেবন বা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের দাবি, কোটি টাকার সরকারি স্থাপনাটি বছরের পর বছর অবহেলায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত জমি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ভবনের সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে ছাত্রাবাসটি চালু করা জরুরি।
তাদের মতে, এতে একদিকে যেমন কোটি টাকার সরকারি সম্পদ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী নিরাপদ আবাসনের সুযোগ পাবে। দীর্ঘ ৩৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ছাত্রাবাসটি শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









