টানা অতিবৃষ্টির ফলে গাইবান্ধা জেলাজুড়ে অধিকাংশ সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে জেলাজুড়ে দেখা দিয়েছে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাকসবজির চরম সংকট। হাট-বাজারগুলোতে স্থানীয় পণ্যের জোগান প্রায় শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। জেলা শহরের প্রধান প্রধান বাজারসহ সুন্দরগঞ্জ ও অন্যান্য উপজেলার স্থানীয় কাঁচাবাজারে সবজির জোগান সচল রাখতে পার্শ্ববর্তী রাজশাহী, বগুড়া ও দিনাজপুর থেকে পণ্য সরবরাহ করতে হচ্ছে। তবে বাড়তি পরিবহন খরচ ও জোগানের ঘাটতির কারণে পুরো জেলায় সবজির দাম এখন লাগামহীন।
সুন্দরগঞ্জ বাজারের সবজি ব্যবসায়ী হামিদুল ইসলাম জানান, বর্তমানে বাজারে স্থানীয় বলতে সামান্য কিছু বেগুন, পটল ও কচু ছাড়া আর কিছুই মিলছে না। জেলাজুড়ে স্থানীয় সবজি না থাকায় বহিরাগত জেলা থেকে বাড়তি পরিবহন খরচ গুনে সবজি আনতে হচ্ছে। পাইকারি ব্যবসায়ী ও মহাজন আসাদুল ইসলাম জানান, জেলার বাইরে থেকে দ্বিগুণ পরিবহন খরচ দিয়ে সবজি আনার ফলে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। স্থানীয় পণ্যের ক্ষেত্রে কোনো পরিবহন খরচ লাগে না, তাই বহিরাগত সবজির কারণে বর্তমানে বাজার চড়া।
বাজারের এই অগ্নিমূল্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জেলার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। পৌরসভার অটোচালক ছামিউল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, "সারাদিন অটোরিকশা চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে চাল, ডাল, তেল আর লবণ কিনতেই পকেট খালি। কাঁচাবাজারে হাত দেওয়ার সাধ্য নেই। বৃষ্টি-বাদলের অজুহাতে যে হারে প্রতিদিন দাম বাড়ছে, তাতে মাসে একদিন মাছ বা মাংস খাওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়বে।"
কাঁচাবাজারে কেনাকাটা করতে আসা সত্তোরোর্ধ্ব প্রবীণ ক্রেতা মো. আব্দুস সামাদ মিঞা অতীত আর বর্তমানের তুলনা টেনে ক্ষোভের সাথে বলেন, "একসময় ২৫ পয়সায় আলু, ২০ পয়সায় বেগুন, ১৫ পয়সায় পটল, ৩০ পয়সায় মরিচ আর ২০ পয়সায় পেঁয়াজ কিনেছি। আর আজ সেই আলু কিনতে হচ্ছে ২৫ থেকে ৩৫ টাকা, বেগুন ৭০ থেকে ৮০ টাকা, মুলা ৮০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৪০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৭০ টাকা, পটল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, করলা ৬০ থেকে ৮০ টাকা, কচু ৪০ থেকে ৬০ টাকা, পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং কাঁচা মরিচ ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি দরে! এভাবে চলতে থাকলে আমরা গরিব মানুষ কীভাবে বাজার করব?"
বাজারের এই অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে জেলাজুড়ে থাকা সীমিত আয়ের চাকরিজীবীদের ওপরও। স্থানীয় বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, "কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে। অথচ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়েনি। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে চাকরিজীবী—সবাই সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এখানে সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার এবং দ্রুত বাজার মনিটরিং জোরদার করা উচিত।"
কৃষকদের কপালেও ফুটে উঠেছে চিন্তার ভাঁজ। শান্তিরাম গ্রামের সবজি চাষি পলাশ চন্দ্র জানান, প্রতিকূল আবহাওয়া ও টানা বৃষ্টিতে তাঁদের ক্ষেতের সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। জমি নতুন করে প্রস্তুত করে আবার চাষাবাদ করতে সময় লাগবে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুতই নতুন ফসল বাজারে আনা সম্ভব হবে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হঠাৎ এমন অতিবৃষ্টির কারণে জেলাজুড়ে সবজি উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নেমেছে। উপজেলা কৃষি অফিসার মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, "টানা বৃষ্টি-বাদলের কারণে শুধু সুন্দরগঞ্জ উপজেলাতেই ২০ হেক্টর জমির সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলাজুড়ে চাষিরা ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। আশা করা যাচ্ছে নতুন শাকসবজি বাজারে আসলে দাম অনেকটা কমে যাবে।"
এদিকে বাজার পরিস্থিতি ও সিন্ডিকেটের বিষয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ইফফাত জাহান তুলি বলেন, "অবশ্যই নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হবে। অসাধু বিক্রেতারা কৃত্রিম সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন কিনা, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









