সিলেট নগরের রায়নগর এলাকার একটি বাসা থেকে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের গৃহকর্মীর গলা কাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলা থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ বলছে, লোডশেডিংয়ের সুযোগ নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি ডাকাতি, পারিবারিক বিরোধ নাকি পূর্বশত্রুতার জেরে ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিহতরা হলেন আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা (১৫)। তাহমিনার বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক-দোয়ারাবাজার এলাকায়। তিনি সিলেট নগরের জল্লারপাড় এলাকার একটি কলোনিতে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন।
পুলিশ জানায়, একটি কক্ষ থেকে সুরাইয়া বেগম ও তাহমিনার এবং অন্য একটি কক্ষ থেকে আব্দুস সাত্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনজনকেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। তবে ঘটনাস্থল থেকে কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি।
লোডশেডিংয়ের সময় হত্যাকাণ্ড
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘প্রতিবেশীরা বাসার দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ গিয়ে দরজা খুলে ভেতরে তিনজনের মরদেহ দেখতে পায়।
ভাড়াটেদের বক্তব্য অনুযায়ী, সকালে বাসার ভেতর থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শোনা গিয়েছিল। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, সকালেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘‘বাসার ওয়ারড্রব ও আলমারি খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া গেছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। ডাকাতির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ বা পূর্ব শত্রুতা ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাসায় পাওয়া একটি দলিলও তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বুধবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ওই এলাকায় লোডশেডিং ছিল। পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায়। ওই বাসাতেও সিসি ক্যামেরা রয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় ওই সময়ের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, সিসি ক্যামেরার বিষয়টি জেনেই দুর্বৃত্তরা লোডশেডিংয়ের সময়কে হত্যাকাণ্ডের জন্য বেছে নিয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনায় পুলিশের বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি পিবিআই সিআইডি ও বিশেষায়িত দল ঘটনাটি তদন্ত করছে।
ভাড়াটের সঙ্গে বিরোধের তথ্য
নিরাপত্তাকর্মীদের ভাষ্য, ওই বাসায় দুজন গৃহকর্মী থাকতেন। তাদের মধ্যে অপর গৃহকর্মীর এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বাসার গাড়িচালকের বরাত দিয়ে জানা গেছে, নিচতলার এক ভাড়াটের সঙ্গে বাড়ির মালিক আব্দুস সাত্তারের বিরোধ চলছিল। প্রায় ছয় মাস পর গত মাসে ওই ভাড়াটে বাসা ছেড়ে যান। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওই বিরোধের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
নিহত দম্পতির ভাগ্নে মুন্না মিয়া বলেন, ‘‘ওই ভাড়াটে জায়গা-জমির ব্যবসা করতেন। ভাড়াটে বাসা ছাড়ছেন না এবং ঠিকমতো ভাড়া দিচ্ছেন না জানিয়ে আব্দুস সাত্তার মহল্লার কমিটির কাছে বিচারপ্রার্থী হয়েছিলেন। পরে কমিটির মাধ্যমে তাকে বাসা ছাড়তে বলা হয়। নিহত দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে দুজন লন্ডনে এবং দুজন যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।’’
সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মোহাম্মদ মইনুল জাকির বলেন, ‘‘ঘটনাটি ডাকাতি, পারিবারিক শত্রুতা নাকি পূর্ববিরোধের জেরে ঘটেছে, সব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে। ক্রাইম সিন সংরক্ষণ করে আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিভিন্ন তথ্যের সহায়তায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।’’
কাজে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরছে তাহমিনা
রায়নগরের ওই বাসায় কাজের মেয়ে হিসেবে এসেছিল তাহমিনা। গত ঈদুল আজহার পর ওই বাসায় এসেছিল ১৫ বছরের এই কিশোরী। দিনমজুর বাবার সংসারে কিছুটা স্বস্তি আনতে কাজ করছিল সে। কাজ শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হলো তাকে। তাহমিনার বাবা আপ্তাব মিয়া দিনমজুর। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তাহমিনা ছিল সবার বড়। সিলেট নগরের জল্লারপাড় এলাকার বাচ্চু মিয়ার কলোনিতে পরিবারের সঙ্গে থাকত সে।
তাহমিনার মামা রাহিম মিয়া বলেন, ‘‘কোরবানির ঈদের পর তাহমিনা ওই বাসায় কাজে যায়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় কাজ করে সংসারে সহযোগিতা করত সে।’’
বুধবার সকালে তাহমিনার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। মেয়েকে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা-মা। মেয়েটির এমন নির্মম মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









