বিকেলের আলো নরম হয়ে আসছে। কীর্তিনাশার বুকে ছুটছে একের পর এক রঙিন নৌকা। শত শত বৈঠার ছন্দে বাড়ছে গতি। নদীর দুই পাড়ে হাজারো মানুষের করতালি, হর্ষধ্বনি আর উচ্ছ্বাসে চারপাশ যেন পরিণত হয়েছে উৎসবের মঞ্চে।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার কীর্তিনাশা নদীতে শুক্রবার অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচের ফাইনালে এমন দৃশ্যই দেখা যায়। শিশু-কিশোর থেকে নারী-পুরুষ—বিভিন্ন বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে নদীর দুই পাড়ে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ডোমসার ইউনিয়নের তেতুলিয়া থেকে রাজগঞ্জ ব্রিজ হেলিপ্যাড পর্যন্ত নদীপথে অনুষ্ঠিত হয় ফাইনাল। শেষ পর্যন্ত আমগ্রাম এক্সপ্রেস প্রথম, সাত সমাজ এক্সপ্রেস-১ দ্বিতীয় এবং মামা ভাগিনা এক্সপ্রেস তৃতীয় হয়।
আয়োজক কমিটি জানায়, ১৪ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন এলাকার ১৪টি নৌকা অংশ নেয়। ওই দিন প্রথম রাউন্ড ও ১৮ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার হয় ফাইনাল।
ফাইনাল দেখতে সকাল থেকেই কীর্তিনাশার দুই পাড়ে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। আয়োজকদের দাবি, প্রায় অর্ধলাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল। অনেকে পরিবার নিয়ে নদীর পাড়ে অবস্থান নেন। কেউ মোবাইলে ছবি-ভিডিও ধারণ করেন, কেউ শিশুদের কাঁধে তুলে নৌকার দৌড় দেখান। কোনো নৌকা এগিয়ে গেলেই তার সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে নদীর পাড়।

গ্রামবাংলার সংস্কৃতিতে নৌকাবাইচ শুধু প্রতিযোগিতা নয়, নদীকেন্দ্রিক মানুষের আনন্দ ও সামাজিক মিলনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। আধুনিক বিনোদনের বিস্তারে এ ঐতিহ্য অনেকটা আড়ালে চলে গেলেও কীর্তিনাশার এ আয়োজন যেন ফিরিয়ে আনে পুরোনো দিনের সেই উৎসব।
আয়োজকদের ভাষ্য, তরুণ সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখা এবং খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
আয়োজকেরা বলেন, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ত করা গেলে তাদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি হয় এবং সামাজিক বন্ধনও শক্তিশালী হয়। মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরিতেও এ ধরনের আয়োজন ভূমিকা রাখতে পারে।
বিপুল দর্শনার্থীর কথা বিবেচনায় রেখে নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবায় মেডিকেল টিম, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবকদের রাখা হয়। ফাইনাল শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী নৌকা পায় একটি করে ফ্রিজ। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিটি নৌকার জন্য ছিল একটি করে টেলিভিশন।

শরীয়তপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ টিপুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ আহমেদ আসলাম। প্রধান বক্তা ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার এ. কে. এম. নাসির উদ্দিন কালু।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন সরদার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন বাদল বেপারী, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিরাজুল হক মোল্লাসহ দলীয় নেতাকর্মীরা।
দিন শেষে শান্ত হয়ে আসে কীর্তিনাশা। থেমে যায় বৈঠার ছন্দ, সরে যায় রঙিন নৌকা। তবে নদীর দুই পাড়ে থেকে যায় মানুষের উচ্ছ্বাস আর নৌকাবাইচের স্মৃতি—হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার এক চিরচেনা উৎসবের নতুন করে ফিরে আসার গল্প।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









