শীতলক্ষ্যার শান্ত জলে শনিবার হঠাৎ যেন জেগে উঠল বহুদিনের ঘুমন্ত কোনো স্মৃতি। নদীর বুক চিরে ছুটে চলা একের পর এক নৌকা, বৈঠার ছন্দে পানির ওপর তৈরি হওয়া ঢেউ, মাঝিদের হুংকার আর দুই তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে রূপগঞ্জের শীতলক্ষ্যা পরিণত হয়েছিল এক বিশাল লোকউৎসবের মঞ্চে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে দীর্ঘ ১৭ বছর পর আবারও শীতলক্ষ্যার বুকে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। কাঞ্চন পৌর বিএনপির উদ্যোগে শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাট থেকে কাঞ্চন ঘাট পর্যন্ত নদীর নির্ধারিত পথে বসে এই প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা শুরুর পরপরই যেন বদলে যায় নদীর চেহারা। শান্ত জলের জায়গা দখল করে নেয় বৈঠার ছন্দ, নৌকার গতি আর দর্শকদের উল্লাস।
বিভিন্ন এলাকার মাঝিমাল্লাদের ২৫টি নৌকা অংশ নেয় এবারের প্রতিযোগিতায়। বাহারি সাজে সজ্জিত নৌকাগুলো যখন একে একে নদীর বুকে ছুটে চলে, তখন শীতলক্ষ্যার জলরেখায় তৈরি হয় উত্তেজনার ঢেউ। সারিবদ্ধ মাঝিরা একসঙ্গে বৈঠা চালাচ্ছেন, আর প্রতিটি বৈঠার আঘাতে নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত থেকে দ্রুততর। তীর থেকে সেই দৃশ্য দেখছেন হাজারো মানুষ। কারও হাতে মোবাইল ফোন, কেউ আবার মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছেন নদীর দিকে।

শুধু নদীর দুই তীরেই নয়, ছোট-বড় শত শত নৌকা ও বোট নিয়েও অনেকে ভিড় করেন প্রতিযোগিতা দেখতে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে আসেন শীতলক্ষ্যার পাড়ে। দীর্ঘদিন পর নৌকাবাইচ দেখতে এসে অনেকের চোখেমুখে ছিল আনন্দ ও কৌতূহল। নদীর তীরের জনসমাগম আর পানিতে সারি সারি নৌকা মিলিয়ে পুরো এলাকা যেন রূপ নেয় এক মিলনমেলায়।
নৌকাবাইচ বাংলার নদীমাতৃক জীবন ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি ঐতিহ্য। নদী-খাল-বিলের দেশ বাংলায় একসময় নৌকাই ছিল মানুষের যাতায়াত, যোগাযোগ ও জীবিকার অন্যতম প্রধান বাহন। সেই নৌকাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল নানা লোকজ উৎসব। বিশেষ করে বর্ষাকালে নদী যখন পানিতে ভরে উঠত, তখন বিভিন্ন এলাকার মাঝিরা দল বেঁধে নৌকা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামতেন। লম্বা সরু নৌকায় সারিবদ্ধ মাঝিদের একসঙ্গে বৈঠা চালানোর দৃশ্য, ঢোল-বাদ্যের তালে তালে তাদের উদ্দীপনা এবং নদীর দুই পাড়ে দর্শকদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে নৌকাবাইচ হয়ে উঠেছিল বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ।
সময় বদলেছে, বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। নদীর নাব্যতা কমেছে, হারিয়েছে অনেক পুরোনো নৌপথ। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার বিস্তারে নৌকার ওপর মানুষের নির্ভরশীলতাও কমেছে। এর সঙ্গে অনেক এলাকায় হারিয়ে যেতে বসেছে নৌকাবাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। তাই ১৭ বছর পর শীতলক্ষ্যার বুকে এই প্রতিযোগিতা শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়, বরং পুরোনো এক লোকজ ঐতিহ্যের ফিরে আসার দৃশ্যও বটে।
প্রতিযোগিতা যত এগিয়েছে, ততই বেড়েছে মানুষের উচ্ছ্বাস। নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের সঙ্গে পানিতে থাকা নৌকা ও বোটের যাত্রীদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কোনো নৌকা একটু এগিয়ে গেলেই এক পাড় থেকে উচ্ছ্বাসের শব্দ ভেসে আসে, আবার অন্য নৌকা গতি বাড়ালে শুরু হয় নতুন করে হাততালি ও চিৎকার। শীতলক্ষ্যার বাতাসে মিশে যায় মানুষের আনন্দধ্বনি।
আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুসহ বিএনপি ও দলটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

আয়োজকরা জানান, গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই দীর্ঘ ১৭ বছর পর শীতলক্ষ্যায় নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
প্রতিযোগিতা শেষে ছিল পুরস্কারের আয়োজনও। অংশ নেওয়া ২৫টি নৌকার প্রত্যেকটিকে বিশেষ পুরস্কার হিসেবে একটি করে রেফ্রিজারেটর দেওয়া হয়। আর প্রতিযোগিতায় বিজয়ী তিনটি দলকে উপহার দেওয়া হয় মোটরসাইকেল।
তবে পুরস্কার কিংবা প্রতিযোগিতার ফলাফলের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে দিনের উৎসবের আবহ। কারণ, দীর্ঘ ১৭ বছর পর শীতলক্ষ্যার বুক আবার দেখেছে সেই পরিচিত দৃশ্য—বৈঠার তালে ছুটে চলা নৌকা, মাঝিদের সম্মিলিত শক্তি, নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল আর উৎসবের রঙে রাঙানো একটি দিন।
তাই এ নৌকা বাইচ শুধু ২৫টি নৌকার প্রতিযোগিতা ছিল না। বৈঠার প্রতিটি টানে যেন ফিরে এসেছে বাংলার নদী, মাঝি আর মানুষের বহু পুরোনো সম্পর্কের গল্প। শীতলক্ষ্যার ঢেউ সেই গল্পকে বয়ে নিয়ে গেছে নদীর স্রোতের মতোই—এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের দিকে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









