সবুজে ঘেরা পাহাড়ি টিলার গাছে গাছে ঝুলছে পান। ঘরের বারান্দায় বসে নারীরা নিপুণ হাতে পান সাজিয়ে তৈরি করছেন বাজারজাতের উপযোগী গুছি। মৌলভীবাজারের খাসিয়া পুঞ্জিগুলোর এ চিরচেনা দৃশ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। খাসিয়াদের নিজস্ব ভাষায় পানকে বলা হয় ‘টেম্পেউ’। এই পান চাষই তাঁদের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তবে প্রকৃতির বিরূপতা, উৎপাদন হ্রাস, পানের দরপতন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে ঐতিহ্যবাহী এ চাষে এখন দেখা দিয়েছে দুর্দিন। সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন অনেক চাষি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও রাজনগরের পাহাড়ি এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ৬৫টি খাসিয়া পুঞ্জি রয়েছে। এসব পুঞ্জিতে প্রাকৃতিক পরিবেশে ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে পান চাষ করা হয়। পানগাছের পরিচর্যা ও পাতা সংগ্রহের কাজ করেন পুরুষেরা। অন্যদিকে নারীরা দলবদ্ধভাবে পান সাজিয়ে বাজারজাতের উপযোগী গুছি তৈরি করেন। ১২টি পাতায় এক গুছি, ১২ গুছিতে এক কান্তা এবং ২০ কান্তায় এক কুড়ি পান হয়।
চাষিদের ভাষ্য, বর্ষাকাল পানের ভরা মৌসুম হলেও চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে দেড় মাস পরপর গাছ থেকে পান সংগ্রহ করা গেলেও এখন অপেক্ষা করতে হচ্ছে দুই থেকে আড়াই মাস। শুধু উৎপাদন কমেনি, ছোট হয়ে যাচ্ছে পানের পাতার আকারও। ফলে বড় পানের তুলনায় ছোট পাতার দাম কম পাচ্ছেন চাষিরা।
অন্যদিকে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন উপকরণের দাম। মৌসুমভেদে প্রতি কুড়ি পান ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বিক্রির অর্থ দিয়ে উৎপাদন খরচ ও সংসারের ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংকটের চিত্র তুলে ধরে শ্রীমঙ্গলের নাহার পুঞ্জির বাসিন্দা ডিবারমিন পতাম বলেন, ‘চলতি বছর মৌসুমের শুরুতে আশানুরূপ বৃষ্টি হলেও জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কম দামে পান বিক্রি করতে হয়েছে। এখন শীতের আগমনে পানের মৌসুম শেষের দিকে। অনেকের জুমে পানও কমে গেছে। ফলে খাসিয়া পুঞ্জির অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকটে পড়তে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও পানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিরা হতাশ। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে খাসিয়া পান বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।’
লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মান্ত্রী (সমাজপ্রধান) ফিলা পতমী বলেন, ‘পানের রোগবালাইয়ের ধকল কাটিয়ে এ বছর যে উৎপাদন হয়েছে, তারও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি না। সবকিছুর দাম বাড়ছে, অথচ পানের দাম কমছে। খাসিয়াদের মূল আয়ের উৎস পান। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। সরকারি আর্থিক সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পানচাষিরা ঘুরে দাঁড়াতে পারতেন।’
একই সংকটের কথা জানান কমলগঞ্জের মাধবপুর ইউনিয়নের হীরামতিছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মান্ত্রী বিওয়ানলী সুঙ। তিনি বলেন, ‘আগের মতো পান বিক্রি হয় না, দামও নেই। পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। তারপরও জীবিকার তাগিদে আমাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পান চাষ চালিয়ে যাচ্ছি। সংসারের খরচ মেটাতে ঋণ করতে হচ্ছে। সরকার সহযোগিতা করলে কিছুটা স্বস্তি পেতাম।’
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘চাষিদের বিভিন্ন সমস্যায় কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আরও কোনো সমস্যা থাকলে সেটিও দেখা হবে।’
পান শুধু খাসিয়া জনগোষ্ঠীর আয়ের উৎস নয়, এটি তাঁদের কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও খাসিয়া পান রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং উৎপাদিত পানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে সম্ভাবনাময় এ খাতের ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। জীবিকার তাগিদে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েও ঐতিহ্যবাহী পান চাষ আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন পাহাড়ের খাসিয়া চাষিরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









