শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে শুরু হয়েছে আখের গুড় তৈরির তোড়জোড়। মাঠ থেকে আখ সংগ্রহ, যন্ত্রের সাহায্যে মাড়াই করে রস বের করা এবং চুলায় জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও কারিগররা। তবে আখের ফলন কিছুটা কম হওয়া এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের হিসাব মেলাতে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁরা। উৎপাদিত গুড়ের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন কৃষকরা।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকশাবাড়ি, ছোনগাছা ও পাঁচঠাকুরীসহ উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর ও কামারখন্দ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চলছে আখ থেকে গুড় তৈরির কর্মযজ্ঞ। প্রথমে যন্ত্রের সাহায্যে আখ মাড়াই করে রস সংগ্রহ করা হয়। পরে মাটির তৈরি বিশেষ চুলায় বড় লোহার কড়াইয়ে সেই রস প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা জ্বাল দেওয়া হয়। রস ঘন হয়ে এলে তা ঠান্ডা করে কারিগররা হাতে বিভিন্ন আকৃতির সুস্বাদু গুড়ে পরিণত করেন।
ছোনগাছা ইউনিয়নের পারপাচিল গ্রামের আখচাষি মোখলেছুর রহমান বলেন, প্রতি বছর শীতের আগেই তাঁরা আখ থেকে গুড় তৈরি শুরু করেন। এবার আখের ফলন কিছুটা কম হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরি, আখ মাড়াই ও জ্বালানির খরচ বেড়েছে। তারপরও গুড়ের চাহিদা থাকায় উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন তাঁরা। ন্যায্যমূল্য পেলে কৃষকরা লাভবান হতে পারবেন।

একই গ্রামের গুড়ের পাইকার মো. সেলিম বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গুড়ের চাহিদা দেশের বিভিন্ন জেলায় রয়েছে। এখান থেকে গুড় সংগ্রহ করে ঢাকা, জামালপুরের সরিষাবাড়ী ও ইসলামপুরসহ টাঙ্গাইলের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। গুড়ের মান ভালো হলে ক্রেতাদের আগ্রহও বেশি থাকে।
অন্যদিকে নাটোরের কাছিকাটা, মশিন্দা, চাচকৈড় ও গুরুদাসপুর এলাকায়ও এবার আখের চাষ ও ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে বলে জানা গেছে। আখচাষি মনিরুল বলেন, এবার আখের ফলন ভালো হয়েছে। তবে বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া গেলে তাঁরা আরও বেশি উপকৃত হবেন।
আরেক চাষি গফুর মিয়া বলেন, আখ চাষে অনেক পরিশ্রম ও খরচ করতে হয়। উৎপাদিত আখের উপযুক্ত দাম পেলে কৃষকরা লাভবান হবেন এবং এ চাষে আরও আগ্রহী হবেন।
চাষিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি বিঘা ভালো মানের আখ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকায়। মাঝারি মানের আখের দাম ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। আর নিম্নমানের আখ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার টাকায়। অন্যদিকে প্রতি মণ গুড়ের দাম রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকা।
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. রেজাউল হক জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ৮০০ হেক্টর জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আখের রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি গুড় উৎপাদনে তাঁদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নত জাতের আখ চাষ, উৎপাদন খরচ কমানো এবং কৃষকদের উৎপাদিত আখ ও গুড়ের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে চলনবিল অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী আখের গুড় শিল্প আরও সম্প্রসারিত হবে। একই সঙ্গে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









