দক্ষিণ এশিয়ার সামনে এখন ১১৭ কোটি কর্মক্ষম মানুষের বিশাল জনমিতিক সুযোগ। তবে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দেরি হলে এই সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। এমনকি বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক সম্পদ না হয়ে বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় থেকে ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইল উইন্ডস টু হেড উইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী এক দশকের কম সময়ের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কমতে শুরু করবে। ২০৪৯ সালের মধ্যে অঞ্চলটি বয়স্ক অর্থনীতিতে পরিণত হবে। তখন ৬৫ বছর বা তদূর্ধ বয়সী মানুষের অনুপাত দাঁড়াবে ১৪%। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই পর্যায় আসবে ২০৫১ সালে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশে ২০৪৯ সালের মধ্যে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে।
বাংলাদেশে তা ঘটবে ২০৫১ সালে। অর্থাৎ অন্য বেশির ভাগ দক্ষিণ এশীয় দেশের তুলনায় জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশ কিছুটা বেশি সময় পাবে। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০০ সাল থেকে কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠী দক্ষিণ এশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বার্ষিক ০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শ্রম উৎপাদনশীলতা ১.১০% বাড়াতে সহায়তা করেছে। তবে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধিতে জনসংখ্যার এই বার্ষিক অবদান কমে মাত্র ০.১০% নেমে আসবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অনুকূল বয়স কাঠামো থাকলেও তা পুরোপুরি কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো যায়নি। সীমিত আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীদের শ্রমশক্তিতে কম অংশগ্রহণ এবং মানবসম্পদের ঘাটতি এর প্রধান কারণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং পেনশনব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে বার্ধক্যজনিত পরিবর্তন থেকেও অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব। একে ‘দ্বিতীয় জনমিতিক লভ্যাংশ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা বয়স্ক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি তাঁদের সঞ্চয় বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে।
বিশ্ব ব্যাংকের মতে, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ায় জনসংখ্যার বার্ধক্যে রূপান্তর অনেক দ্রুত ঘটছে। তা ছাড়া, মাথাপিছু আয় তুলনামূলক কম থাকা অবস্থাতেই দেশগুলোকে এ পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮৪% বা ৫ কোটি ৮০ লাখ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, উচ্চশিক্ষা বা ডিগ্রি অর্জনের পরও ৪৪ শতাংশ স্নাতক অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে ধীরগতিতে। সম্প্রতি ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেককে কর্মী ছাঁটাইও করতে হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। চাকরি না পেলে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হতে পারে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, এটিই এখন মূল উদ্বেগের বিষয়। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তাঁরা বলেন, শুধু তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা কিংবা তাদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে তোলাই যথেষ্ট নয়। সরকারি খাতে চাকরির সুযোগ সীমিত হওয়ায় মূল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে বেসরকারি খাতকে। এ জন্য বেসরকারি খাতের বিকাশ ও কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
অনানুষ্ঠানিক খাতের নিম্ন উৎপাদনশীলতা প্রসঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, পশ্চিমা ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যখন এ ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাদের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রভাব এতটা শক্তিশালী ছিল না। তাই আইন বা বিধিনিষেধ চাপিয়ে রাতারাতি অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক করা সম্ভব নয়। বরং এ খাতের সঙ্গে কাজ করতে হবে, প্রণোদনা দিতে হবে এবং তাদের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। উর্বরতার হার কমে যাওয়া প্রসঙ্গে তারা বলেন, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উর্বরতার হার একবার কমতে শুরু করলে সাধারণত তা আগের অবস্থায় ফিরে যায় না। অর্থ বা প্রণোদনা দিয়ে কৃত্রিমভাবে উর্বরতার হার বাড়ানোর পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলোও বিশ্বে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
বিশ্ব ব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের উপ-প্রধান ইয়োহানেস জুট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলো উন্নয়নের যাত্রায় আরও দ্রুত এবং তুলনামূলক কম বয়সেই বয়স্ক হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই এমন নীতি গ্রহণ ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা বেশি ও উন্নত মানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এর মাধ্যমে যুব লভ্যাংশের সুফল বাড়ানোর পাশাপাশি বার্ধক্যের জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হবে।
বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জাঁ পেস্মে বলেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগানো নির্ভর করছে এখন দেশটি কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর। ভালো চাকরি সৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা, তরুণদের শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতায় দক্ষ করে তোলা এবং নারীদের কর্মসংস্থানের বাধা দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও বৃদ্ধ বয়সে আয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতিও শুরু করতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য প্রতিবেদনে কয়েকটি করণীয় তুলে ধরেছে বিশ্ব ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য অর্থায়ন সহজ করা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক প্রক্রিয়া সরল করা। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতার মান উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









