বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের রান্নাঘর থেকে যুগ যুগ ধরে ভেসে আসে কাঠ পোড়ানোর ধোঁয়া। চুলা জ্বালানোর জন্য প্রতিদিনকার সঙ্গী হলো খড়-কুটা, নাড়া আর শুকনা গোবর। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মেট্রিক টন এ ধরনের সনাতনী জ্বালানির প্রয়োজন হয়। এর যোগান দিতে গিয়ে উজাড় হচ্ছে আমাদের বনজ সম্পদ, যা পরিবেশকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, গোবর বা অন্যান্য পচনশীল বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলার ফলে আবাদি জমি তার জন্য অতি প্রয়োজনীয় জৈব সার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই জ্বালানি সংকট আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
এই জটিল সংকটের এক সহজ, টেকসই এবং যুগান্তকারী সমাধান হতে পারে বায়োগ্যাস। এটি শুধু একটি বিকল্প জ্বালানি নয়, এটি গ্রামীণ জীবনযাত্রাকে বদলে দেওয়ার এক দারুণ সুযোগ, যা নিশ্চিত করতে পারে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, উন্নত মানের জৈব সার, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং স্বনির্ভর অর্থনীতি।
কাঁঠালিয়া উপজেলার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বায়োগ্যাস ব্যবহারের অনেক সুবিধা রয়েছে। বায়োগ্যাস উৎপাদনের প্রধান দুটি কাঁচামাল গোবর এবং কচুরিপানা। এ উপাদানগুলো কাঁঠালিয়া উপজেলার প্রায় সব গ্রামেই সহজলভ্য। তাই গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বায়োগ্যাস সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট হওয়ার কারণে পশুর খামার থেকে দূষণের হার কমেছে। জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দিয়ে উৎপাদিত হচ্ছে বিষমুক্ত সবজি ও নানা ধরনের অর্থকরী ফসল। বায়োগ্যাসে রান্নার কারণে কমছে মা ও শিশুদের ধোঁয়াজনিত নানা রোগ ও শ্বাসকষ্ট। ব্যায়োগ্যাস প্ল্যান্টের একমাত্র কাঁচামাল হচ্ছে পচনশীল বর্জ্য।
তথ্যমতে মাত্র ১/২ কেজি গোবরে উৎপাদিত বায়োগ্যাস দিয়ে একটি সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন রান্নাবান্নার কাজ করা সম্ভব। কিন্তু এরপরেও আমাদের দেশে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বায়োগ্যাস এখনও ততোটা জনপ্রিয়তা লাভ করেনি।
কাঁঠালিয়া সদর ইউনিয়নের উত্তর আউরা গ্রামের মেসার্স মাইনুল ডেইরি খামারের মালিক মো. মাইনুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, আমি গরুর খামার করার পরে বর্জ্য নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। আমার মাথায় আসে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের চিন্তা। একসময় আমি এ প্ল্যান্ট তৈরি করি। আর বায়োগ্যাসের স্যালারি (অবশিষ্ট বর্জ্য) শুকিয়ে চাষের জমিতে ব্যবহার করি। আমার খামারে ও তার আশেপাশে কোনো গন্ধ-দুর্গন্ধ নেই। আমাদের রান্নার সকল কাজ এ গ্যাসে হয়ে যায়।
কচুয়া গ্রামের খামারি মো. হানিফ খান বলেন, খামারের বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলে রাখলে পরিবেশ নোংরা ও দুর্গন্ধময় হয়, মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ে। বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট এই বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করে পরিবেশ দূষণও রোধ করে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ঝালকাঠি উপপরিচালক কার্যালয়ের কমিউনিটি সুপার ভাইজার মো. ইমরান হাওলাদার বলেন, কাঁঠালিয়ায় যুব উন্নয়ন অফিসের মাধ্যমে ইমপ্যাক্ট প্রকল্পের আওতায় ফেজ-৩ চলমান আছে। বায়োগ্যাসের প্ল্যান্ট বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যাহাতে খমার মালিকরা উপকৃত হচ্ছে।
স্থানীয় সমাজ কর্মী মো. হাছিব ভুট্টো আকন বলেন, চেষ্টা ও উদ্যোগ থাকলে বায়োগ্যাস জনপ্রিয়করণের মাধ্যমে বদলে দেয়া যাবে গ্রামীণ জনপদের জীবনধারা। বায়োগ্যাস প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রামে বসেই শহরের নাগরিক সুবিধা ভোগ করা সম্ভব।
কাঁঠালিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পাদ কর্মকর্তা ডা: এইচ এম জামশেদ আজাদ বলেন, পশুর খামারের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে দুর্গন্ধ ও পরিবেশ দূষণ। খামারের বর্জ্য বায়োগ্যাসের প্ল্যান্টে ব্যবহার করায় আর পরিবেশ দূষিত হচ্ছে না।
কাঁঠালিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ফাতেমা ইসলাম বলেন, কাঁঠালিয়ায় বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরির প্রবণতা ও আগ্রহ দিনদিন বাড়ছে। এটা কৃষিজমি ও ফসলের জন্যও উপকার বয়ে আনছে। কৃষিজমিতে বায়োগ্যাসের স্যালারি (উদ্বৃত্ত বর্জ্য) সার হিসেবে ব্যবহারের সুবাদে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমেছে। যারা এ সার ব্যবহার করছেন তাদের জমির ফলনও বেড়েছে।
কাঁঠালিয়া উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার মো. কামরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, পরিবেশ রক্ষা ও দূষণমুক্ত জ্বালানি ব্যবস্থা নিশ্চত করতে যুব উন্নয়ন অফিস থেকে খামারিদের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরিতে কারিগরি সহযোগিতা ও সল্প সুদে ঋণ দেওয়া হয়।
কাঁঠালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাপস কুমার তালুকদার বলেন, রান্নার জ্বালানি হিসেবে বায়োগ্যাস ব্যবহারের ফলে মা ও শিশুরা অনেক রোগ থেকে মুক্ত থাকছেন। বায়োগ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে মা ও শিশুদের মৃত্যুহারও কমবে।
কাঁঠালিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মকবুল হোসেন বলেন, বায়োগ্যাস ব্যবহারের ফলে জ্বালানি হিসেবে আর কাঠ-বাঁশ পোড়াতে হয় না। এতে করে পরিবেশ নিরাপদ থাকে। পশুর বর্জ্যের সঠিক ব্যবহার হয় এবং বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করতে পারলে আর্থিক ও পরিবেশগত দুই দিক থেকেই মানুষ লাভবান হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









