কুষ্টিয়া জেলার বৃহৎ ও সীমান্তবর্তী উপজেলা দৌলতপুর। ১৪টি ইউনিয়নে প্রায় ৫ লাখ মানুষের বসবাস থাকলেও স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও নির্মিত হয়নি জরুরি সেবায় নিয়োজিত ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। যার ফলে প্রতিবছরই পুড়ে ছাই হচ্ছে শত শত পরিবারের স্বপ্ন ও কোটি টাকার সম্পদ।
দৌলতপুর উপজেলায় একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের। ২০০৯ সালে ফায়ার স্টেশন নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হলেও জমি অধিগ্রহণ ও মামলাসহ নানা জটিলতায় সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়। এরপর ২০১৪ সাল প্রায় দশ বছর আগে এ স্টেশনের জন্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হলেও এখনো তা চালু করা সম্ভব হয়নি। অবকাঠামো ও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে গুরুত্বপূর্ণ এই সেবাটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দৌলতপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশন অনুমোদনের পরে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৬ জনবল। এসব জনবল বরাদ্দের পর স্থাপনা না থাকায় জেলার বিভিন্ন স্টেশনে কর্মরত রয়েছেন তারা।
ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকায় উপজেলার যেকোনো অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় ভেড়ামারা ও মিরপুর ফায়ার স্টেশন থেকে ইউনিট এসে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে। দূরত্ব বেশি হওয়ায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয়, ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেড়ে যায়।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে ভেড়ামারা ফায়ার স্টেশন থেকে দৌলতপুর উপজেলায় মোট ৪৫টি অগ্নিকাণ্ডে কাজ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আনুমানিক ২৭ লাখ টাকার ক্ষতি হলেও প্রায় ৯৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। একই বছরে ২টি সড়ক দুর্ঘটনায় অভিযান চালিয়ে ২ জন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়, তবে কোনো নিহতের ঘটনা ছিল না।
এছাড়া ২০২৫ সালে ২টি ডুবুরি কল পরিচালনা করে ফায়ার সার্ভিস, যেখানে ২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৪টি অগ্নিকাণ্ডে কাজ করেছে ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিস। এসব ঘটনায় আনুমানিক ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং প্রায় ২৬ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময়ে কোনো সড়ক দুর্ঘটনা বা ডুবুরি কলের ঘটনা ঘটেনি।
মিরপুর ফায়ার স্টেশন সূত্রেও জানা গেছে, দৌলতপুরে বিভিন্ন সময়ে তাদের ইউনিট থেকে গত বছর ২২টি অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। যার আনুমানিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২০ লক্ষ টাকা। এছাড়াও পাশের উপজেলা থেকে যেতে যেতেই অগ্নিকাণ্ডে শত শত ব্যক্তির স্বপ্ন ছাই হয়ে গেছে এমন দুর্ঘটনার পরিমাণ অনেক রয়েছে। যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও ব্যাপক।
দীর্ঘ সময় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মিত না হওয়ার কারণ হিসেবে জমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও নির্ধারিত জায়গা চূড়ান্ত না হওয়ায় বছরের পর বছর ধরে প্রকল্পটি ঝুলে ছিল।
এই জটিলতার অবসান ঘটিয়ে ২০২২ সালে উপজেলার দৌলতপুর সদর ইউনিয়নের চুয়ামেলিকপাড়া গ্রামের মৃত আবুল খায়ের সাদ উদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা বানু তার বসতবাড়ির ৮২ শতাংশ জমি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণের জন্য দান করেন। নিঃসন্তান এই জমিদাতার এমন উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
জমি দানের ৩ বছর পার হলেও হয়নি দৌলতপুরবাসীর আকাঙ্ক্ষার ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন। জমিদাতা হাসিনা বানু তার জীবদ্দশাতেই যেন দৌলতপুরে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণ হয় এমন ইচ্ছা জমিদানের সময় প্রকাশ করলেও ১ বছর আগে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
তার এই মানবিক উদ্যোগের পরও এখনো দৃশ্যমান কোনো নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। জমি সংক্রান্ত জটিলতা অনেকাংশে নিরসন হলেও অবকাঠামো নির্মাণ, বাজেট বাস্তবায়ন, এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
স্থানীয় যুবক ওয়ালিদ হাসান রোহান জানান, দৌলতপুরের মতো বড় উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস না থাকা খুবই উদ্বেগজনক। আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস আসতে আসতে সব শেষ হয়ে যায়। দ্রুত স্টেশন চালু করা প্রয়োজন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ জানান, স্টেশনের অবকাঠামো নির্মাণ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। অবকাঠামো ছাড়া ফায়ার সার্ভিস চালু করা সম্ভব নয়।
সহকারী পরিচালকের দপ্তর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কুষ্টিয়ার সহকারী পরিচলক ওয়াদুদ হোসেন জানান, দৌলতপুর ফায়ার সার্ভিস অনুমোদনের সময় থেকে ১৬ জন জনবল নিয়োগ আছে। তারা কুষ্টিয়া সদরসহ জেলার বিভিন্ন স্টেশনে কর্মরত আছেন। অপ্রতুল বাজেট এর কারণে দৌলতপুরের নির্ধারিত জমিতে মাটি ভরাট ও স্টেশন নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









