পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বাজারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং তদারকির গভীর দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। সাতটি ব্রোকারেজ হাউসে প্রায় ৪৫ হাজার বিনিয়োগকারীর ৫৬৩ কোটি ২২ লাখ টাকা ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আরো বড় বিষয় হলো, এসব অনিয়মের পেছনে একই ধরনের কৌশল- ভুয়া বা ডুপ্লিকেট ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার, গ্রাহকের অজান্তে শেয়ার বিক্রি এবং কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্টের (সিসিএ) অর্থ সরিয়ে নেওয়া- ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে। এতে স্পষ্ট হয়, দীর্ঘদিন ধরে বাজারের একটি অংশে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির বড় ঘাটতি ছিল।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত সফটওয়্যারের পরিবর্তে ভুয়া সফটওয়্যার ব্যবহার করে একদিকে নিয়ন্ত্রক ও বিনিয়োগকারীদের ভিন্ন তথ্য দেখানো এবং অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রকৃত হিসাব গোপন রাখা সম্ভব হয়েছে- এটি অত্যন্ত গুরুতর ব্যর্থতা। আরো উদ্বেগজনক হলো, সিডিবিএলের ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীর মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে অসাধু ব্যক্তিদের নম্বর যুক্ত করার অভিযোগ। এর ফলে লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রকৃত বিনিয়োগকারীর কাছে না গিয়ে অন্যের কাছে পৌঁছেছে। প্রযুক্তি যখন প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শুধু নিয়মকানুন দিয়ে নয়, শক্তিশালী প্রযুক্তিগত নজরদারি দিয়েও তা মোকাবিলা করতে হয়।
বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই ও সিডিবিএলের সমন্বয়ে আট সদস্যের স্থায়ী যৌথ পরিদর্শন কমিটি গঠনের উদ্যোগ তাই সময়োপযোগী। বিশেষ করে ঝুঁকিভিত্তিক ও আকস্মিক পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। তবে কমিটি গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। পরিদর্শনের ফলাফল, চিহ্নিত অনিয়ম এবং গৃহীত ব্যবস্থার বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো পুরনো সফটওয়্যার ব্যবহার করছে বা বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত লেনদেনের তথ্য পাঠাচ্ছে না, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তবে সবকিছুর আগে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার ফেরত দেওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পেতে হবে। মামলা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বছরের পর বছর চলতে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়বে এবং পুঁজিবাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরো কমবে। অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে, কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়াকেও দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইনভেস্টর প্রটেকশন ফান্ডের সক্ষমতা পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
পুঁজিবাজারের মূল ভিত্তি হলো আস্থা। বিনিয়োগকারী যদি মনে করেন, তাঁর অর্থ ও শেয়ার নিরাপদ নয়, তাহলে কোনো সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে শক্তিশালী করতে পারবে না। তাই অনিয়মকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত অর্থ ফেরত, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদার এবং নিয়মিত স্বাধীন পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। এখন প্রয়োজন শুধু নতুন কমিটি নয়- দৃশ্যমান ফলাফল। বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত এবং আস্থা পুনর্প্রতিষ্ঠাই হোক পুঁজিবাজার সংস্কারের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









