এককালে জীববিজ্ঞানের গবেষণা মানেই ছিল মাইক্রোস্কোপ, টেস্টটিউব আর গবেষণাগার। প্রযুক্তির উৎকর্ষে সেই চিত্র বদলেছে। জীবনের রহস্য অনুসন্ধানে মাইক্রোস্কোপের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কম্পিউটার, ডেটাবেজ, অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কারণ, আধুনিক জীববিজ্ঞানের বড় চ্যালেঞ্জ শুধু তথ্য সংগ্রহ করা নয়; বিপুল তথ্যের ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান খুঁজে বের করা।
এই কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বায়োইনফরমেটিক্স। জীববিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, গণিত ও পরিসংখ্যানের সমন্বয়ে ডিএনএ, জিন, প্রোটিনসহ বিভিন্ন জৈবিক তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের বিজ্ঞানই হলো বায়োইনফরমেটিক্স। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের সংজ্ঞাতেও বড় আকারের জৈবিক তথ্য কম্পিউটেশনাল পদ্ধতিতে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি বোঝার জন্য ডিএনএকে একটি বিশাল তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। একটি জীবের জিনগত তথ্যের মধ্যে তার নানা বৈশিষ্ট্য ও জৈবিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা থাকে। কিন্তু এই তথ্য এত বিপুল যে, মানুষের পক্ষে সরাসরি বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। কম্পিউটারভিত্তিক পদ্ধতিতে গবেষকেরা জিনগত তথ্য তুলনা করতে পারেন, নির্দিষ্ট জিনের পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারেন এবং বিভিন্ন জৈবিক সম্পর্ক খুঁজে বের করতে পারেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর সম্ভাবনা আরো বড়।
রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা, ক্যানসারের আণবিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য ওষুধের অণু খুঁজে বের করা এবং ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা গবেষণায় বায়োইনফরমেটিক্স ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে কম্পিউটার বিশ্লেষণে কোনো অণুকে সম্ভাবনাময় হিসেবে পাওয়া মানেই সেটি ওষুধ হিসেবে প্রমাণিত নয়। পরবর্তী পর্যায়ে পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক যাচাই প্রয়োজন।
কৃষিতেও এর গুরুত্ব কম নয়। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে খরা, লবণাক্ততা, রোগবালাই ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উন্নত ফসল নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। উদ্ভিদের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিকূল পরিবেশে সহনশীল বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার গবেষণায় বায়োইনফরমেটিক্স সহায়ক । বাংলাদেশে এই ক্ষেত্রটি এখনো বিকাশমান। তবে এর মধ্যেই কিছু উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। এর একটি হলো ডন অফ বায়োইনফরমেটিক্স লিমিটেড।
প্রতিষ্ঠানটি বায়োইনফরমেটিক্স, জিনোমিক্স, কম্পিউটেশনাল ড্রাগ ডিজাইন, ডেটা বিশ্লেষণ ও প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে। তাদের ডনিল্যাব গবেষণা ও উদ্ভাবনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে এবং বায়োইনফরমেটিক্সভিত্তিক গবেষণা ও প্রকল্প পরিচালনা করছে। এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর একটি হলো বাংলাদেশী মেডিসিনাল প্ল্যান্ট ফাইটোকেমিক্যাল ডাটাবেইজ, সংক্ষেপে বিএমপিপিডি। বিএমপিপিডি-এর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদ নিয়ে তৈরি একটি কিউরেটেড ফাইটোকেমিক্যাল ডাটাবেইজ। দুই বছরের গবেষণা ও তথ্যসংগ্রহের মাধ্যমে তৈরি এই ডেটাবেইজে বর্তমানে ৭০০-এর বেশি ঔষধি উদ্ভিদ, প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৪০০ ফাইটোকেমিক্যাল এন্ট্রি এবং প্রায় ৬৩ হাজার ৯০০টি ইউনিক ফাইটোকেমিক্যাল কম্পাউন্ড-এর তথ্য রয়েছে।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু সংখ্যার মধ্যে নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন ঔষধি উদ্ভিদের রাসায়নিক উপাদান সম্পর্কে তথ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলে গবেষকদের জন্য তা ব্যবহার করা কঠিন। বিএমপিপিডি সেই তথ্যকে একটি কাঠামোবদ্ধ ও অনুসন্ধানযোগ্য প্ল্যাটফর্মে একত্র করার চেষ্টা করছে। ফলে গবেষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা উদ্ভিদ ও তাদের ফাইটোকেমিক্যাল উপাদান সম্পর্কে তথ্য খুঁজে নিয়ে প্রাথমিক গবেষণায় ব্যবহার করতে পারেন। ডেটাবেইজটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এটি ন্যাচারাল প্রোডাক্ট রিসার্চ, ফাইটোকেমিস্ট্রি এবং আরলি-স্টেজ ড্রাগ ডিস্কোভারিতে সহায়ক হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
এখানে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের দেশে ঔষধি উদ্ভিদের বৈচিত্র্য কম নয়। গ্রামীণ ও লোকজ চিকিৎসায় বহু উদ্ভিদের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। কিন্তু লোকজ জ্ঞানকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার উপযোগী করতে হলে তার রাসায়নিক উপাদান, জৈবিক কার্যকারিতা এবং সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। বায়োইনফরমেটিক্স সেই তথ্যকে সংগঠিত ও বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে শুধু ডেটাবেজ তৈরি করলেই গবেষণার অগ্রগতি নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন দক্ষ গবেষক, আধুনিক কম্পিউটিং অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য ডেটা এবং বিশ্ববিদ্যালয়-গবেষণা প্রতিষ্ঠান-শিল্পখাতের সহযোগিতা। বিশেষ করে জীববিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের প্রোগ্রামিং, পরিসংখ্যান ও ডেটা বিশ্লেষণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। একইভাবে কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদেরও জীববিজ্ঞানের বাস্তব সমস্যা বোঝার সুযোগ দিতে হবে।
কারণ, ভবিষ্যতের জীববিজ্ঞান একক কোনো বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। একজন জীববিজ্ঞানীকে হয়তো ডেটা বিশ্লেষণ জানতে হবে, আবার একজন ডেটা বিজ্ঞানীকে জীববিজ্ঞানের সমস্যাও বুঝতে হবে। বায়োইনফরমেটিক্স এই দুই জগতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ এই ক্ষেত্রকে আরো বিস্তৃত করছে। বিশাল জৈবিক ডেটাসেট বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য অণু শনাক্তকরণ কিংবা বিভিন্ন জৈবিক সম্পর্ক খুঁজে বের করার কাজে মেশিন লার্নিং ও অন্যান্য কম্পিউটেশনাল পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে, ভবিষ্যতের গবেষণাগারে জীববিজ্ঞানী, কম্পিউটার বিজ্ঞানী, পরিসংখ্যানবিদ ও ডেটা বিজ্ঞানীদের যৌথ কাজ আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের জন্য সুযোগটি তাই বড়।
আমাদের উদ্ভিদ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিপুল তথ্যকে যদি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে নতুন গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। ডন অফ বায়োইনফরমেটিক্স-এর মতো উদ্যোগ এবং বিএমপিপিডি-এর মতো ডেটাবেজ দেখাচ্ছে, এই যাত্রা বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু অন্য দেশের প্রযুক্তি অনুসরণ করা নয়; বরং বাংলাদেশের নিজস্ব জীবসম্পদ ও বৈজ্ঞানিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে নিজস্ব ডেটা ও গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলা।
এক সময় বিজ্ঞানীরা প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করে জীবনের রহস্য খুঁজতেন। পরে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে জীবনের ক্ষুদ্র জগৎ দেখতে শিখলেন। এখন আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে শুধু দেখা যথেষ্ট নয়। জীবনের বিপুল তথ্য পড়তে, বুঝতে ও জানতে হচ্ছে। বায়োইনফরমেটিক্স সেই নতুন বিজ্ঞান, যা জীবনের ভাষাকে ডেটার ভাষায় পড়তে শেখাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি নতুন প্রযুক্তি নয়; আমাদের জীববৈচিত্র্য, ঔষধি উদ্ভিদ, কৃষি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ গবেষণাকে নতুন পথে নিয়ে যাওয়ার একটি সম্ভাবনাময় দরজা।
লেখক: শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









