রাজধানী ঢাকা আজ একবিংশ শতাব্দীর চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত স্ববিরোধিতার শিকার। একদিকে চকচকে ফ্লাইওভার, সুউচ্চ বাণিজ্যিক ভবন, মেট্রোরেল এবং দ্রুতগতির ডিজিটালাইজেশন নাগরিক উন্নয়নের অহংকার প্রকাশ করছে, অন্যদিকে এই নগরীর মাটির নিচে, চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ ও পচে যাওয়া বাস্তবতা- পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনা। কোটি মানুষের এই জনপদে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক ও টেকসই কাঠামোর অনুপস্থিতি আজ ঢাকা শহরকে একটি জীবন্ত স্বাস্থ্যঝুঁকির টাইমবোমায় পরিণত করেছে। বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন জাতীয় সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটির এই অভ্যন্তরীণ সংকট শুধু পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাচ্ছে না, বরং নীরবে হরণ করছে নগরবাসীর জীবন ও জনস্বাস্থ্য।
ঢাকার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার মূল ব্যর্থতা শুরু হয় এর কেন্দ্রীয় ট্রিটমেন্ট সুবিধার শোচনীয় পরিসংখ্যান থেকে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও ঢাকা ওয়াসার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সত্ত্বেও ঢাকার প্রায় ৯৯ শতাংশ বর্জ্যপদার্থ অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি প্রকৃতিতে নিক্ষিপ্ত হয়। শহরের একমাত্র কার্যকর স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা এসটিপি অবস্থিত পাগলায়, যার দৈনিক ক্ষমতা মাত্র ১২ কোটি লিটার।
অথচ প্রতিদিন শুধু ঢাকা ওয়াসার আওতাধীন এলাকা থেকেই উৎপন্ন হয় প্রায় ১৭০ থেকে ১৮০ কোটি লিটার পয়ঃবর্জ্য। ক্ষমতার এই বিশাল ব্যবধানের কারণে বাকি ৯০ শতাংশের বেশি বর্জ্য কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি গিয়ে পড়ছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু এবং শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে। ঢাকা ওয়াসা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যানে স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে কেবল শহরের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এলাকা। বাকি ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ এলাকা সেন্ট্রাল স্যুয়ারেজ লাইনের বাইরে অবস্থান করছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একমাত্র ভরসা হলো ব্যক্তিমালিকানাধীন সেপটিক ট্যাংক এবং অনাবৃত পিট ল্যাট্রিন বা শৌচাগার।
এই অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপটি প্রকাশ পায় যখন সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য বা গৃহস্থালির কালো পানি সরাসরি ড্রেন, খালের মাধ্যমে নদী কিংবা বৃষ্টির পানির নিষ্কাশন পাইপে সংযুক্ত করা হয়। রাজধানী জুড়ে যে রেইনওয়াটার ড্রেনেজ সিস্টেম রয়েছে, তার বড় একটি অংশ অবৈধ সংযোগের কারণে পয়ঃবর্জ্য বহনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফলে, একটু বৃষ্টি হলেই ঢাকার অলিগলি, প্রধান সড়ক এবং নিচু এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। সেই উপচে পড়া পানির সঙ্গে ড্রেনের বিষাক্ত মানববর্জ্য মিশে একাকার হয়ে মানুষের বাসাবাড়ি, দোকানপাট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, এভাবে উন্মুক্ত পয়ঃবর্জ্যের সংস্পর্শে আসা শহুরে জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ বছরের কোনো না কোনো সময়ে পানি ও বর্জ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়।
রাজধানীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনা আজ কেবল নদীর পানি বা মাটির নিচের ভূগর্ভস্থ পরিবেশকেই ধ্বংস করছে না, বরং এটি নগরবাসীর জীবনযাত্রাকে এক গভীর বৈজ্ঞানিক ও জনস্বাস্থ্যগত সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই সংকট এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ত্রুটিপূর্ণ বর্জ্যব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এটি এক ভয়ংকর প্রতিবেশগত ও জৈবিক মহামারীতে রূপ নিয়েছে। পয়ঃনিষ্কাশনের এই বিপর্যয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর লাগামহীন প্রাদুর্ভাব এবং বায়ুদূষণের মারাত্মক বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যান, যা ঢাকাকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ও অবাসযোগ্য মেগাসিটিতে পরিণত করেছে।
ঢাকার জনস্বাস্থ্যের বর্তমান অবস্থাকে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত করে তুলেছে প্রতিবছর পুনরাবৃত্ত ডেঙ্গুর ভয়ংকর প্রাদুর্ভাব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর-এর বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই পরিস্থিতির নৃশংস রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ইতিহাসের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়ে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং সরকারি হিসাব অনুযায়ী রেকর্ড ১ হাজার ৭০৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালেও পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ ছিল, যে বছর আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন প্রায় ৯৬ হাজার মানুষ এবং প্রাণ হারান ৫৩১ জন।
পরবর্তী কালে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমের আগেই পয়ঃবর্জ্য মিশ্রিত জমে থাকা নোংরা পানি এবং ড্রেনের দূষিত পরিবেশ এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্রকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার মতো মেগাসিটিতে অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ও গৃহস্থালির বর্জ্যমিশ্রিত পানি ড্রেন ও খালের পানিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা এডিস লার্ভার পুষ্টি ও বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। এর ফলে প্রথাগত বর্ষাকালের নির্দিষ্ট সময়সীমা পেরিয়ে ডেঙ্গু এখন সারা বছরব্যাপী একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে। আক্রান্তদের একটি বড় অংশ ১৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী কর্মক্ষম তরুণ ও যুবক, যা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতি ও জনবলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পয়ঃনিষ্কাশন ও ভূ-গর্ভস্থ পানির দূষণের পাশাপাশি ঢাকা নগরীর আরেকটি অদৃশ্য ও প্রাণঘাতী ঘাতক হলো এর চরম বায়ুদূষণ। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিবেশগত সংস্থার সূচকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাতাসের গুণগত মান প্রতিনিয়ত বিপজ্জনক মাত্রায় অবস্থান করছে। বিগত বছরগুলোতে ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই বার্ষিক গড় স্কোর ১৭০ বা তারও উপরে রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে বহুগুণ বেশি। বাতাসের এই চরম অবনতির মূল কারণ হলো, অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্পের ধুলোবালি, চারপাশের অবৈধ ইটভাটার ধোঁয়া এবং অপরিশোধিত বর্জ্য থেকে সৃষ্ট বিষাক্ত গ্যাসের বায়ুমণ্ডলে মিশে যাওয়া। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ফুসফুসের ক্যানসার, অ্যাজমা, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ঢাকার পয়ঃনিষ্কাশন অব্যবস্থাপনা এবং বায়ুদূষণ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। ড্রেন ও জলাশয়ে উন্মুক্ত পড়ে থাকা মানববর্জ্য এবং স্লিজ রোদে শুকিয়ে বায়ুর সঙ্গে মিশে অতি সূক্ষ্মকণা বা পার্টিকুলেট ম্যাটারের মাধ্যমে বাতাসে ছড়াচ্ছে। ফলে, নগরবাসী যখন শ্বাস নিচ্ছেন, তখন তারা বাতাসের সঙ্গে প্যাথোজেন, ব্যাকটেরিয়া এবং বিষাক্ত রাসায়নিক কণা ফুসফুসে গ্রহণ করছেন। এর ফলে পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশু ও বয়স্করা হাসপাতালে ভিড় করছেন।
এই অব্যবস্থাপনার আরেকটি অন্ধকার দিক হলো সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার ব্যবস্থার চরম বিশৃঙ্খলা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আধুনিক বা যান্ত্রিক উপায়ে স্লিজ অপসারণ না করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বা শ্রমিক নামিয়ে এই কাজ করানো হয়, যা মানবাধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তার লঙ্ঘন। কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই শত শত পরিচ্ছন্নতাকর্মী খালি হাতে এই বিষাক্ত বর্জ্য অপসারণ করেন। অন্যদিকে, সংগৃহীত বর্জ্য রাতের আঁধারে বা সুবিধাজনক সময়ে শহরের আশেপাশের নিচুজমি, জলাশয় কিংবা কৃষিজমিতে ফেলে দেওয়া হয়, যা পরবর্তী কালে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। বিষাক্ত নাইট্রেট ও কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া মাটির গভীরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। ঢাকার টিউবওয়েল বা সাবমার্সিবল পাম্পের পানিতে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি অনেক আগেই বিপদসীমা ছাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই অব্যবস্থাপনা ঢাকাকে এক বিরাট ক্ষতির মুখে ফেলছে। জনস্বাস্থ্য খাতে প্রতিদিন যে পরিমাণ চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, তার একটি বড় অংশ পরোক্ষভাবে এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের অবদান। কর্মক্ষম মানুষ পানিবাহিত রোগ বা ডেঙ্গুতে ভুগে কাজে অংশ নিতে না পারায় জাতীয় উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশে নদীগুলোর পানি বর্তমানে এতই দূষিত যে সেখানে কোনো জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না।
এই সংকট নিরসনে কেবল খণ্ডিত বা প্রতীকী পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখন আর নেই। ঢাকা ওয়াসা এবং রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোকে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় এনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু পাগলা এসটিপির ওপর নির্ভর না করে দাশেরকান্দি এবং রায়েরবাজারসহ প্রস্তাবিত সব কয়টি আধুনিক স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে এবং পুরো ঢাকাকে স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে। যেসব এলাকায় সেন্ট্রাল লাইন নেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে প্রতিটি বহুতল ভবনে পরিবেশবান্ধব আধুনিক সেপটিক ট্যাংক বাধ্যতামূলক করতে হবে। বর্জ্য অপসারণের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন এবং পয়ঃবর্জ্য অপসারণের লাইন সম্পূর্ণ আলাদা করতে হবে এবং বায়ুদূষণ ও মশার প্রাদুর্ভাব রোধে পরিবেশগত আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা আজ রাজধানীর টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য রাখতে হলে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই নীরব ঘাতকটিকে অবিলম্বে মোকাবিলা করতে হবে। নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক- সকলের সম্মিলিত সচেতনতা এবং কঠোর পদক্ষেপই পারে ঢাকাকে একটি স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও মানবিক মেগাসিটি হিসেবে রূপান্তর করতে।
লেখক: গবেষক ও শিক্ষাবিদ


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









