আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য- ‘দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থার পুনর্ভাবনা’। প্রতিপাদ্যটি সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সংগতিপূর্ণ। মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, বিশ্বজুড়ে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে, বার্ধক্য আর ব্যক্তিজীবনের শেষ অধ্যায় কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি এখন অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, নগরব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
১৯৮২ সালের ভিয়েনা আন্তর্জাতিক কর্মপরিকল্পনা থেকে ২০০২ সালের মাদ্রিদ আন্তর্জাতিক কর্মপরিকল্পনা- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবীণদের অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে চিন্তার বিকাশ ঘটেছে। এর মূল শিক্ষা হলো, প্রবীণ মানুষ কেবল সহায়তা বা সেবাগ্রহীতা নন; তাঁরা অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতার ধারক এবং সমাজের সক্রিয় অংশীদার। তাই তাঁদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি উন্নয়নেরও অপরিহার্য শর্ত। বাংলাদেশে বিষয়টির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৬০ বছর বা তার ওপরে। আগামী কয়েক দশকে এই জনগোষ্ঠীর আকার আরো বাড়বে। অর্থাৎ যে বাংলাদেশ আজ তরুণ জনসংখ্যার সুবিধা ভোগ করছে, তাকে একই সঙ্গে আগামী দিনের বয়স্ক সমাজের জন্যও প্রস্তুত হতে হবে। সরকারের উদ্যোগ কম নয়।
১৯৯৮ সাল থেকে বয়স্কভাতা কর্মসূচি চালু রয়েছে। প্রণীত হয়েছে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, বয়স্কদের সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা নির্দেশিকা এবং সুস্থ বার্ধক্যবিষয়ক জাতীয় কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এসব উদ্যোগ বাস্তবে প্রবীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পেরেছে? এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একজন প্রবীণ নাগরিককে চিকিৎসা নিতে গিয়ে যদি হাসপাতাল ভবনে ওঠানামায় অসুবিধায় পড়তে হয়, গণপরিবহনে নিরাপদে চলাচল করতে না পারেন, ফুটপাত বা সড়ক পারাপারে ঝুঁকিতে পড়েন, অথবা অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে কাগজে থাকা নীতিমালা তাঁর জীবনকে কতটা নিরাপদ করছে- তা নতুন করে ভাবতে হবে।
বিশেষ করে নগরায়ণ, যৌথ পরিবারের ভাঙন ও পরিবর্তিত জীবনযাত্রার কারণে প্রবীণদের একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। অনেকে আর্থিকভাবে নির্ভরশীল, অনেকে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত, আবার কেউ কেউ পরিবারে থেকেও মানসিকভাবে নিঃসঙ্গ। ফলে, প্রবীণ কল্যাণকে শুধু মাসিক ভাতা বা চিকিৎসাসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, মানসিক সুস্থতা, নিরাপদ আবাসন এবং সক্রিয় সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ।
এখন সময় এসেছে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুসারে তা হালনাগাদ করার। একই সঙ্গে প্রতিটি সরকারি ভবন, হাসপাতাল, পরিবহনব্যবস্থা, ফুটপাত ও জনপরিসরকে প্রবীণবান্ধব করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কমিউনিটিভিত্তিক দিবা-যত্ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, প্রবীণদের জন্য সহজপ্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা, পরিচিতি কার্ড এবং বিশেষ সেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার প্রয়োজন। তবে, দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। পরিবারকে প্রবীণের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কর্মক্ষেত্রে বয়সবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং নাগরিক সমাজকে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- প্রবীণদের নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাঁদের নিজেদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া।
আজকের প্রবীণরা আমাদের বর্তমান সমাজ নির্মাণ করেছেন। আর আজকের তরুণ ও মধ্যবয়সীরাই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ে তোলা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করার দায়িত্ব। দীর্ঘায়ু যদি মানবসভ্যতার সাফল্য হয়, তবে সেই দীর্ঘ জীবনকে সুস্থ, নিরাপদ, কর্মময় ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলাই হতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজের পরবর্তী বড় অঙ্গীকার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









