বাংলাদেশ দ্রুত একটি বার্ধক্যশীল জনসংখ্যার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ এবং মোট জনসংখ্যার ৯ শতাংশের বেশি। এই জনমিতিক পরিবর্তনের ফলে প্রবীণদের শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক নিরাপত্তা, পারিবারিক যত্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৬ সালের একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় বাংলাদেশের ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসিক রোগের সামগ্রিক হার ২৮.০ শতাংশ পাওয়া গেছে। একই গবেষণায় বিষণ্ণতাজনিত রোগ ১১.৬ শতাংশ, উদ্বেগজনিত রোগ ৪.৮ শতাংশ, শারীরিক উপসর্গ-সম্পর্কিত মানসিক রোগ ৩.৮ শতাংশ এবং জ্ঞানীয় বা স্মৃতিসংক্রান্ত রোগ ২.৩ শতাংশ পাওয়া যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত প্রবীণদের মাত্র ৫.১ শতাংশ কোনো সময় চিকিৎসা গ্রহণ করেছিলেন।
প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
প্রথমত: দ্রুত বর্ধনশীল প্রবীণ জনগোষ্ঠী
বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একই হারে সম্প্রসারিত হয়নি। ফলে, ভবিষ্যতে প্রবীণদের বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, স্মৃতিবিভ্রাট, নিঃসঙ্গতা এবং অন্যান্য মানসিক সমস্যার জন্যস্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণাতেও বাংলাদেশের দ্রুত বার্ধক্যজনিত জনমিতিক পরিবর্তনকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, অনিদ্রা ও নিঃসঙ্গতার উচ্চমাত্রা২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি বাংলাদেশভিত্তিক গবেষণায় ১,৫৪৪ জন প্রবীণের মধ্যে বিষণ্ণতার উপসর্গ ৫৮ শতাংশ, উদ্বেগের উপসর্গ ৮২ শতাংশ, অনিদ্রার উপসর্গ ৭৭ শতাংশ এবং নিঃসঙ্গতার উপসর্গ ৯ শতাংশ পাওয়া যায়। তবে, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এগুলো মূলত নির্দিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য-পরিমাপক যন্ত্রে পাওয়া উপসর্গের হার, সব ক্ষেত্রে চিকিৎসাগতভাবে নিশ্চিত রোগ নির্ণয়ের হার নয়। গবেষণায় দেখা যায়, বয়স, লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা, অবসর বা বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অবস্থা, একা বসবাস, শারীরিক ব্যায়ামের অভাব, সামাজিক কার্যক্রমে কম অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের সঙ্গে এসব মানসিক স্বাস্থ্য-উপসর্গের সম্পর্ক রয়েছে।
তৃতীয়ত: একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একাকীত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। জীবনসঙ্গীর মৃত্যু, সন্তানদের অন্যত্র বসবাস, অবসর গ্রহণ, বন্ধু ও সমবয়সীদের হারানো এবং সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ কমে যাওয়ার ফলে প্রবীণরা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রবীণ সামাজিক কার্যক্রমে খুব কম অংশ নেন তাঁদের মধ্যে নিঃসঙ্গতার সম্ভাবনা বেশি। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ও দৈনন্দিন আগ্রহ বা শখের সঙ্গে নিঃসঙ্গতার তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিও দেখা গেছে।
চতুর্থত: বিধবা বা বিপত্নীক হওয়ার প্রভাব
প্রবীণ বয়সে জীবনসঙ্গী হারানো একটি বড় মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তন। সাম্প্রতিক বাংলাদেশভিত্তিক গবেষণায় বিধবা প্রবীণদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও নিঃসঙ্গতার প্রবণতা বেশি পাওয়া গেছে। জাতীয় পর্যায়ের অন্য গবেষণাতেও বিধবা হওয়াকে প্রবীণদের মানসিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে পাওয়া গেছে।
পঞ্চমত: অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা এবং পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন
অবসর গ্রহণ বা কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে অনেক প্রবীণের নিজস্ব আয় কমে যায়। চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধের খরচ, খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যয় এবং পরিবারের ওপর আর্থিক নির্ভরতা তাঁদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। ২০২৫ সালের গবেষণায় নিম্ন-অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের জন্য স্থানান্তর, বিদেশগমন, ছোট পরিবার এবং পরিবর্তিত জীবনযাত্রার কারণে ঐতিহ্যগত পারিবারিক যত্নব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ফলে, শুধু পরিবারের ওপর নির্ভর করে প্রবীণদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক যত্ন নিশ্চিত করা ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ষষ্ঠত: দীর্ঘস্থায়ী রোগ ও শারীরিক অক্ষমতা
বার্ধক্যে দীর্ঘস্থায়ী রোগ, চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা এবং দৈনন্দিন কাজে অন্যের সহায়তার প্রয়োজন বাড়তে পারে। এসব শারীরিক সীমাবদ্ধতা আত্মনির্ভরতা ও সামাজিক অংশগ্রহণ কমিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশি গবেষণায় দীর্ঘস্থায়ী রোগ, দৈনন্দিন কাজে সহায়তার প্রয়োজন এবং বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও অনিদ্রার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও প্রবীণদের মানসিক রোগকে অবমূল্যায়ন এবং শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
সপ্তমত: মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বড় ঘাটতি এবং প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা
বাংলাদেশের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাতেই চিকিৎসা গ্রহণের বড় ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক রোগের ক্ষেত্রে প্রায় ৯১ শতাংশ চিকিৎসাঘাটতি পাওয়া গিয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য নির্দেশিকাতেও বিশেষজ্ঞ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমিত প্রাপ্যতা এবং সাধারণ জনগণের সেবা গ্রহণের বড় ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রবীণদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরো জটিল হতে পারে। কারণ, তাঁদের চলাফেরার সীমাবদ্ধতা, আর্থিক নির্ভরতা, পরিবারভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং একাধিক শারীরিক রোগের কারণে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ কঠিন হতে পারে। প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য শুধু মনোরোগ চিকিৎসার বিষয় নয়। তাঁদের জন্য প্রয়োজন চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, সমাজকর্মী, ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মী, নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট এবং অন্যান্য পেশাজীবীর সমন্বিত সেবা। বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত সমন্বিত মানসিক ও সামাজিক যত্নব্যবস্থা এখনও সীমিত।
প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত কিছু প্রস্তাব
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত তেমন গুরুত্ব পায়নি, যদিও বর্তমান সরকার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে আইন, নীতি, পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশের বিপুল জনসংখ্যার জন্য স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয়হীনতা রয়েছে তা দূর করে একটি সমন্বিত কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা চালু করা বর্তমান সরকারের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। বর্তমান সরকার প্রতিটি হাসপাতাল, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রসমূহের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করছেন। তদুপরি, স্বাস্থ্যসেবার প্রতি সংশ্লিষ্ট সকলেই যদি দায়িত্বের প্রতি সচেতন না হই তাহলে এটি একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।
প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, স্টাফ, যন্ত্রপাতি ও উপকরণ যেমন প্রয়োজন, তেমনি হাসপাতালের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকেও সেবাধর্মী মানসিকতা নিয়ে সেবা প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামোর দিকে লক্ষ্য রেখে আমাদের মনে রাখতে হবে, রাতারাতি আমূল সংস্কার যেমন সম্ভব নয় তেমনি জনগণের মৌলিক সেবা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে উপেক্ষিত করা কাম্য নয়। বর্তমান সরকার বিশেষ করে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতিসেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসহ সমন্বিত ই-হেলথ কার্ড ও স্বাস্থ্য আইডি, স্বাস্থ্যবীমা, জনবল নিয়োগ, বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ইতোমধ্যে গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবায় কিছু বিশেষ জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্তিকরণমূলক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। যেমন- প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রচলিত হাসপাতালগুলোতে আলাদা স্বাস্থ্যসেবা কর্নার, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্নার অথবা প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য স্বতন্ত্র সেবাব্যবস্থা চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে প্রবীণ ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা কার্যকর করার লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে যা বর্তমানে অত্যন্ত সময়োপযোগী।
প্রথমত: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য যুক্ত করা
প্রবীণরা নিয়মিত চিকিৎসার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান। তাই সেখানে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, স্মৃতিসংক্রান্ত সমস্যা, নিঃসঙ্গতা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি শনাক্ত করার সহজ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অ-বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মানসিক স্বাস্থ্য নির্দেশিকাও প্রাথমিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেয়।
পরিশেষে, বাংলাদেশে প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণের বিষয়। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দেখায়, প্রবীণদের মধ্যে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, অনিদ্রা, নিঃসঙ্গতা এবং অন্যান্য মানসিক সমস্যার বোঝা উল্লেখযোগ্য; একই সঙ্গে চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তবে, এই পরিস্থিতিকে শুধু সংকট হিসেবে না দেখে সেবা উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবেও দেখা যায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করা, সম্প্রদায়ভিত্তিক সেবা বৃদ্ধি, পরিবার ও পরিচর্যাকারীদের প্রশিক্ষণ, প্রবীণদের সামাজিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং জেরোন্টোলজিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মের পেশাগত ভূমিকা সম্প্রসারণ করা গেলে প্রবীণদের মানসিক সুস্থতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কার্যকর ভবিষ্যৎ কাঠামো হতে পারে-
‘শারীরিক স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক যত্ন, পারিবারিক সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা, পুনর্বাসন ও ফলোআপভিত্তিক সমন্বিত জেরোন্টোলজিক্যাল সমাজকর্ম’। এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা প্রবীণদের শুধু দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করার পরিবর্তে সুস্থ, মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ, সামাজিকভাবে সংযুক্ত ও অর্থপূর্ণ বার্ধক্য নিশ্চিত করার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
লেখক : উপাচার্য, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









