২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করেছে। এটি শুধু একটি সরকারের পতন কিংবা ক্ষমতার পালাবদল ছিল না; এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নাগরিকের সম্পর্ক নিয়ে নতুন চেতনা ও রাজনৈতিক ধারার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। মানুষের প্রত্যাশা ছিল—রাষ্ট্র আরও ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক হবে, আইনের শাসন শক্তিশালী হবে, রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের ঢাল হবে না, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার হবে স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত।
কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্র বদলানো সহজ হলেও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো কঠিন। পুরোনো সংস্কৃতির জায়গায় নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত না হলে শুধু ক্ষমতার মুখ বদলায়, ক্ষমতার চরিত্র বদলায় না। তাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছি, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক অভ্যাস ও ক্ষমতার সংস্কৃতিই নতুন পরিচয়ে ফিরিয়ে আনার পথেই হাঁটছি?
জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় এই প্রশ্নের কারণও স্পষ্ট। একদিকে বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে; অন্যদিকে সেই স্বাধীনতার আবরণে উচ্ছৃঙ্খলতা, চাঁদাবাজি, দখল, ভাঙচুর, মব-সন্ত্রাস এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও দৃশ্যমান হয়েছে। গণতন্ত্রে বাকস্বাধীনতা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রের সমালোচনা, সরকারের নীতির বিরোধিতা, রাজনৈতিক মত প্রকাশ, স্বাধীন সাংবাদিকতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য তুলে ধরা—এসবই মুক্ত সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু স্বাধীনতার অর্থ স্বেচ্ছাচার নয়। বাকস্বাধীনতা কাউকে অন্যের জীবন, সম্পদ ও নিরাপত্তার ওপর আক্রমণের অধিকার দেয় না। রাজনৈতিক অধিকারও চাঁদাবাজি, দখল, ভাঙচুর কিংবা সহিংসতার লাইসেন্স নয়। অবাধে উশৃঙ্খলতা প্রদর্শনের হাতিয়ার নয়।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় নয়; ভিন্নমতকে সহ্য করা এবং মতের বিরোধকে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মীমাংসার মধ্যেও তার শক্তি নিহিত। গণতন্ত্রে মতের সংঘাত থাকবে, কিন্তু তার নিষ্পত্তি হবে যুক্তি, সংগঠন, নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে—শক্তির জোরে নয়। রাজনৈতিক মতের জায়গা যখন ভয়, হুমকি ও সহিংসতা দখল করে, তখন গণতন্ত্র তার স্বাভাবিক চরিত্র হারাতে শুরু করে।
এর ভয়াবহ প্রকাশ ঘটতে পারে মব সংস্কৃতিতে। কোনো অভিযোগের তদন্ত ও বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আদালতের। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই যখন নিজের হাতে বিচার তুলে নেয়, তখন শুধু একজনের অধিকার লঙ্ঘিত হয় না; রাষ্ট্রের আইনগত কর্তৃত্বও দুর্বল হয়ে পড়ে। জনতার ভিড়ে ব্যক্তিগত দায় অস্পষ্ট হয়ে গেলে আইনের শাসনের জায়গা দখল করে প্রতিশোধের সংস্কৃতি।
আইনবহির্ভূত শক্তি প্রয়োগের সংকট শুধু মব-সন্ত্রাসে সীমাবদ্ধ নয়। এর আরেকটি বিপজ্জনক প্রকাশ দখলদারির সংস্কৃতি—রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় আধিপত্য কিংবা সংঘবদ্ধ শক্তি ব্যবহার করে জমি, সম্পদ, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনা- এ বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। ২৫ সেপ্টেম্বর গভীররাতে একটি বড় দল সেখানে প্রবেশ করে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে। তাদের বিরুদ্ধে ওষুধ, টিকা ও চিকিৎসাসামগ্রী লুট এবং ভারী যন্ত্র দিয়ে স্থাপনা ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। মা ও শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও টিকাদান সেবা দিয়ে আসা একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর এমন হামলা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হতে পারে না। ঘটনার সঙ্গে জমি দখল ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। মূল প্রশ্ন হলো—রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ দখলের চেষ্টা কীভাবে সম্ভব হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তা প্রতিরোধে কতটা কার্যকর ছিল।
একই উদ্বেগ দেখা যায় রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায়। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে সংঘবদ্ধ হামলার সময় স্টুডিওটিও আক্রান্ত হয়। পুলিশ ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে জমি নিয়ে বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানিয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে সালমান মুক্তাদির চাঁদা না দেওয়াকে হামলার কারণ হিসেবে স্থানীয় একদল বিএনপি কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা সমীচীন নয়। কিন্তু কারণ যাই হোক, সংঘবদ্ধ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট কোনো বিরোধ নিষ্পত্তির বৈধ পদ্ধতি হতে পারে না। রাড্ডা ও ইসিবি চত্বরের ঘটনাদুটি এক নয়; তাদের পেছনের কারণও তদন্তের আগে এক করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু দুটির মধ্যেই একটি অভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে—বিরোধ, দখল বা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে আমরা কি আইনের পথে থাকছি, নাকি সংঘবদ্ধ শক্তি ও প্রভাবের ওপর নির্ভর করছি? আইনি প্রক্রিয়ার পরিবর্তে শক্তি বিরোধ নিষ্পত্তির হাতিয়ার হয়ে উঠলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার সঙ্গে সম্পদ ও নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক নতুন নয়। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য বদলেছে, স্থানীয় প্রভাবশালীদের পরিচয় বদলেছে; কিন্তু দখল ও পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি থেকে গেলে পরিবর্তনের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
একজনের জায়গা আরেকজন দখল করলেই দখলদারির অবসান হয় না। একটি দলের জায়গায় আরেকটি দলের লোক চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিলেই চাঁদাবাজির সংস্কৃতি শেষ হয় না। প্রকৃত পরিবর্তন তখনই ঘটবে, যখন রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে জমি, প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা বা জনসম্পদ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সংকুচিত হবে। চিরতরে তার অবসান ঘটবে। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দলের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পুরো দলকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি দলীয় পরিচয়ের কারণে অভিযুক্তকে রক্ষা করাও রাজনৈতিক নৈতিকতার পরিপন্থী। দলীয় পরিচয় যদি অপরাধের ঢাল হয়ে ওঠে, তাহলে আইন ও রাজনীতি—দুটোর প্রতিই মানুষের আস্থা ক্ষয়ে যায়।
এর সামাজিক অভিঘাতও কম নয়। কিশোর গ্যাং, মাদক ও স্থানীয় অপরাধী নেটওয়ার্কের সঙ্গে এ ধরনের সংস্কৃতির সম্পর্ক উপেক্ষা করা যায় না। কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করা হলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা থাকে না; সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটেও রূপ নেয়। কিশোরদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; যারা তাদের ব্যবহার করে, অর্থ জোগায়, অস্ত্র দেয় কিংবা অপরাধী নেটওয়ার্কে যুক্ত করে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের সমূলে উৎখাত করতে হবে।
রাষ্ট্রের নীতি হওয়া উচিত স্পষ্ট—অপরাধীকে তার রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় দিয়ে নয়, অপরাধের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকা এবং দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের ক্ষেত্রেও আইনের একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত। অভিযোগের তদন্ত হবে, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হবে। রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে অপরাধ থেকে মুক্তি দিতে পারে না; আবার রাজনৈতিক পরিচয় নিজেই অপরাধের প্রমাণও নয়। বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রেও একই ভারসাম্য জরুরি।
রাষ্ট্রের সমালোচনার অধিকার যেমন সুরক্ষিত থাকতে হবে, তেমনি সহিংসতার উসকানি, ব্যক্তিগত হুমকি, হামলা কিংবা সম্পত্তি ধ্বংসকে বাকস্বাধীনতার নামে বৈধতা দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রের কাজ মতকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; অপরাধকে নিয়ন্ত্রণ করা। মতপ্রকাশের আড়ালে যখন অন্যের জীবন, সম্পদ বা নিরাপত্তার ওপর আক্রমণ আসে, তখন সেটি আর নিছক মতপ্রকাশের প্রশ্ন থাকে না। অপরাধ সংশ্লিষ্ট বিষয় হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রকে তাই একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিকের নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। একটিকে রক্ষা করতে গিয়ে অন্যটিকে ধ্বংস করা যাবে না। বাকস্বাধীনতার নামে সহিংসতা প্রশ্রয় পেলে স্বাধীনতার প্রতি আস্থা ক্ষয়ে যায়; আবার সহিংসতা ঠেকানোর অজুহাতে বৈধ মতপ্রকাশ দমন করলেও গণতন্ত্র দুর্বল হয়। এই দুই বিপদের মাঝখানে আইনের স্পষ্ট, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রয়োগই টেকসই পথ।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের বড় শিক্ষা এখানেই—শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রের আচরণের পরিবর্তনও প্রয়োজন। যে রাষ্ট্রে ক্ষমতার সঙ্গে আইনের চরিত্র বদলায়, সেখানে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনই স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় না। আর যে রাষ্ট্রে আইন ব্যক্তি, দল ও ক্ষমতার ঊর্ধ্বে থাকে, সেখানেই গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে।
একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য মেনে নিতে হবে—রাজনীতি কোনো অপরাধের ঢাল নয়। বাকস্বাধীনতা কোনো সহিংসতার অনুমতিপত্র নয়। প্রতিবাদ কোনো সম্পত্তি ধ্বংসের অধিকার নয়। দখলের নামে ক্ষমতার প্রদর্শনও আইনসম্মত নয়। আর জনতার সমর্থন কাউকে বিচারকের আসনে বসায় না। বিচার হবে আইনের ভিত্তিতে, আদালতের মাধ্যমে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায়। রাষ্ট্র অনুমোদিত ও স্বীকৃত পন্থায়।
এই জায়গায় রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে আনতে হবে রাষ্ট্রের জায়গায়, আইনকে আইনের জায়গায় এবং রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গায়। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রে শেষ কথা কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা জনতার নয়—শেষ কথা হবে আইন। আর সেই আইনের প্রয়োগ হতে হবে সবার জন্য সমান, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রকৃত পরীক্ষা ক্ষমতা কার হাতে, সেটি নয়; বরং ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার বা প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেটি। রাষ্ট্র কতটা স্বাধীন মতকে সুরক্ষা দিতে পারে, কতটা দৃঢ়ভাবে অপরাধ দমন করতে পারে এবং কতটা নিরপেক্ষভাবে নিজের ক্ষমতাকেও আইনের সীমায় রাখতে পারে—সেটিই হবে সেই পরীক্ষার প্রধান মাপকাঠি। সেখানেই গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, আইনের শাসনের প্রকৃত অর্থ এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার প্রকৃত পরীক্ষা।
লেখক : অধ্যাপক ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









