বার্ধক্য জীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা। একসময় যিনি পরিবারের সবার দায়িত্ব পালন করেছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, বয়সের ভারে তিনিই একদিন অন্যের সহযোগিতার অপেক্ষায় থাকেন। তাঁর প্রয়োজন খুব বেশি নয়, সময়মতো ওষুধ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার, একটু সঙ্গ এবং পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ও পরিবর্তিত পারিবারিক কাঠামোয় এসব প্রয়োজনও অনেক প্রবীণের কাছে দুর্লভ হয়ে উঠছে। মানুষ আগের তুলনায় বেশি দিন বাঁচলেও দীর্ঘ জীবন সবসময় সুস্থ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হচ্ছে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পূর্বাভাস অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রতি ছয়জন মানুষের মধ্যে একজনের বয়স হবে ৬০ বছর বা তার বেশি। ২০২৩ সালে বিশ্বে ৬০ বছরের বেশি মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১০ কোটি, যা ২০৫০ সালে বেড়ে ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ফলে, প্রবীণদের পরিচর্যা এখন আর শুধু পারিবারিক বিষয় নয়, এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।
বাংলাদেশেও প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাঁদের পরিচর্যা ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রয়োজন বাড়ছে। একসময় যৌথ পরিবারে কয়েক প্রজন্মের সহাবস্থানের কারণে প্রবীণদের দেখাশোনা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণ করা সহজ ছিল। কিন্তু নগরায়ণ, আবাসনসংকট, কর্মসংস্থানের জন্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন, ছোট পরিবারের বিস্তার এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টা সেই পারিবারিক কাঠামো বদলে দিয়েছে। অনেক প্রবীণের সন্তান অন্য শহরে বা বিদেশে থাকেন। আবার কেউ চাকরি ও সংসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে বাবা-মায়ের নিয়মিত পরিচর্যার সময় পান না। ফলে, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থাকা সত্ত্বেও তাঁদের প্রয়োজনীয় যত্ন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই প্রবীণদের পরিচর্যার সংকটকে শুধু সন্তানদের অবহেলা কিংবা পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, কর্মজীবনের চাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যা ব্যবস্থার ঘাটতি।
প্রবীণদের পরিচর্যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত যত্নের অর্থনীতি, যার মধ্যে শিশু, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ মানুষের সেবার পাশাপাশি গৃহস্থালির কাজও অন্তর্ভুক্ত। এই শ্রমের বড় অংশ বিনা পারিশ্রমিকে সম্পন্ন হয় এবং অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থেকে যায়। বিশেষ করে, নারীরা পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সেবা ও দৈনন্দিন পরিচর্যার বড় দায়িত্ব পালন করেন, যার জন্য তাঁদের নির্ধারিত বেতন, কর্মঘণ্টা কিংবা ছুটি নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে, বিশ্বব্যাপী অবৈতনিক যত্নশ্রমের প্রায় ৭৬ শতাংশ নারীরা করেন। ২০২৩ সালে যত্নের দায়িত্বের কারণে শ্রমবাজারের বাইরে থাকা ৭৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মধ্যে ৭০ কোটি ৮০ লাখই নারী। বাংলাদেশেও নারীরা পুরুষের তুলনায় সাত গুণেরও বেশি অবৈতনিক যত্ন ও গৃহস্থালি কাজ করেন।
ফলে, প্রবীণদের পরিচর্যার দায়িত্বও নারীদের ওপর পড়ে। অথচ এই শ্রমের ওপর নির্ভর করেই পরিবারের অন্য সদস্যরা কর্মজীবনে যুক্ত থাকতে পারেন এবং প্রবীণরা প্রয়োজনীয় সেবা পান। তাই যত্নশ্রমকে নিছক পারিবারিক কর্তব্য না ভেবে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বীকৃতি এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পরিচর্যার দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রবীণদের যত্নের আরেকটি বড় সংকট দক্ষ পরিচর্যাকারী ও সাশ্রয়ী সেবার অভাব। বাংলাদেশে মানসম্মত দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যাকেন্দ্র সীমিত, প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভারের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং জেরিয়াট্রিক চিকিৎসাসেবাও পর্যাপ্ত নয়।
ব্যক্তিগত পরিচর্যার ব্যয় অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। অথচ প্রবীণের শারীরিক অবস্থা বোঝা, চলাফেরা ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় সহায়তা, ওষুধ ব্যবস্থাপনা এবং মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার মতো দক্ষতা পরিচর্যাকারীর থাকা জরুরি। কিন্তু এই পেশায় নিয়োজিত কর্মীদের অনেকেই কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও সীমিত সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে কাজ করেন। তাই প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকারী তৈরির পাশাপাশি তাঁদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, মর্যাদা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যত্নশ্রমকে দক্ষতাভিত্তিক পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে প্রবীণদের সেবার মান বাড়বে, পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
প্রবীণদের যত্ন শুধু খাবার, ওষুধ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানসিক সুস্থতা, সামাজিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা। অনেক প্রবীণ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একই বাড়িতে থেকেও নিঃসঙ্গ জীবন কাটান। সন্তানদের ব্যস্ততা, প্রজন্মগত দূরত্ব ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপনের কারণে তাঁরা প্রায়ই পারিবারিক কথোপকথন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বকে প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থার তথ্য অনুসারে, প্রতি ছয়জন প্রবীণের একজন কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হন, যার অনেক ক্ষেত্রেই পরিচর্যাকারীর সংশ্লিষ্টতা থাকে।
অবহেলা, অপমান, অর্থনৈতিক শোষণ কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করাও নির্যাতন। তাই প্রবীণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের মতামত, স্বাধীনতা ও পারিবারিক সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকারকে সম্মান করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করাও পরিচর্যার অপরিহার্য অংশ।
প্রবীণদের পরিচর্যার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর কতটা বর্তাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পরিবার মানুষের সবচেয়ে কাছের আশ্রয় হলেও সব ধরনের পরিচর্যার দায়িত্ব এককভাবে পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। একইভাবে রাষ্ট্রীয় ভাতা বা প্রাতিষ্ঠানিক সেবা চালু করলেই পরিবারের দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন পরিবার ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ। এ লক্ষ্যে প্রবীণ, শিশু, প্রতিবন্ধী ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থ ব্যক্তিদের পরিচর্যা বিবেচনায় একটি সমন্বিত জাতীয়ভিত্তিক যত্ন ও পরিচর্যা নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, শ্রম ও কর্মসংস্থান, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকর্মীর মাধ্যমে বাড়িভিত্তিক সেবা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ ব্যবস্থাপনা ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি দিবাকালীন পরিচর্যাকেন্দ্র, সামাজিক মিলনকেন্দ্র এবং হাসপাতালগুলোতে প্রবীণবান্ধব চিকিৎসা, জেরিয়াট্রিক বিভাগ ও পুনর্বাসনসেবা সম্প্রসারণ করা দরকার। এতে পরিবারের সদস্যরা কর্মস্থলে থাকলেও প্রবীণরা প্রয়োজনীয় সেবা পাবেন।
বিশেষ করে, স্বল্প আয়ের প্রবীণদের জন্য সরকারি বরাদ্দ বাড়াতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যাসেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি যত্নের অর্থনীতিকে কর্মসংস্থান ও সামাজিক বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবেও গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য কারিগরি ও পেশাগত শিক্ষার মাধ্যমে প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকারী বা দক্ষ কেয়ারগিভার তৈরি এবং সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক উদ্যোক্তাদের সাশ্রয়ী পরিচর্যাসেবা চালু করতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে, সর্বজনীন শিশু ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা সেবায় বিনিয়োগ ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩০ কোটি শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের জন্যও এ খাত নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে, পরিচর্যাকর্মীদের ন্যায্য বেতন, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ছুটি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কর্মজীবী সন্তানদের জন্য নমনীয় কর্মঘণ্টা ও পারিবারিক পরিচর্যার ছুটির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে বাবা-মায়ের সেবা করতে গিয়ে তাঁদের কর্মজীবন বাধাগ্রস্ত না হয়। পরিবারের মধ্যেও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পরিচর্যার দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।
সন্তানদের কর্তব্য শুধু অর্থ পাঠানো বা ব্যয় বহন করা নয়, প্রবীণদের সময় দেওয়া এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে পাশে থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধকে সম্মান করে সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রবীণদের যত্ন নেবে পরিবার, নাকি রাষ্ট্র? পরিবার দেবে ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগত সান্নিধ্য; রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যা; আর সমাজ গড়ে তুলবে সহমর্মিতা ও মর্যাদার পরিবেশ। এই তিন পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগেই প্রবীণদের নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব।
আজ যাঁদের যত্নের প্রয়োজন, আগামীকাল তাঁদের জায়গায় আমরাও দাঁড়াতে পারি। তাই প্রবীণের যত্নকে দয়া বা অনুগ্রহ হিসেবে নয়, মানুষের অধিকার, পরিবারের নৈতিক দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রের সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি সমাজের মানবিক উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং তার সবচেয়ে নির্ভরশীল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতাই সেই উন্নয়নের প্রকৃত পরিচয়।
লেখক : সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









