একটি সভ্য রাষ্ট্রে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা নিজের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা। অথচ বাংলাদেশে সেই নিরাপত্তাবোধ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, বাড়িতে ঢুকে হামলা, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম কিংবা ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এখন উদ্বেগজনক বাস্তবতা। আধিপত্য বিস্তার, জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- নিজের দেশে নিজের জীবন কি আদৌ নিরাপদ?
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদন পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম নয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ১ হাজার ১৩টি ঘটনায় ৭৩ জন নিহত এবং ৬ হাজার ৪৭৩ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৭ জন। আরো উদ্বেগজনক হলো, ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ ২১ জেলায় ১৩৮টি গুলির ঘটনায় ৬৭ জন নিহত ও অন্তত ১৪৫ জন আহত হয়েছেন। এসব পরিসংখ্যান কেবল অপরাধের সংখ্যা নয়, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নাগরিক নিরাপত্তার সামনে বড় সতর্কবার্তা।
এই সহিংসতার অন্যতম কারণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুণ্ঠিত ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্রের বেশির ভাগ অপরাধীদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখনো ১ হাজার ৩০০টির বেশি অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশও বন্ধ করা যায়নি। এসব অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে অপরাধী চক্রের হাতে। বিশেষ করে,- কিশোর-তরুণদের অর্থের বিনিময়ে অপরাধে ব্যবহার করার প্রবণতা সমাজের ভবিষ্যতের জন্যও ভয়াবহ সংকেত।
পুলিশের অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান থাকলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সাফল্য কতটুকু, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার এবং ৪৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের তথ্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অস্ত্র উদ্ধার ও গ্রেপ্তারই চূড়ান্ত সাফল্য নয়। অপরাধের মূল হোতারা যদি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, অস্ত্রের উৎস বন্ধ না হয় এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে অভিযান সাময়িক ফল দিলেও পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন হবে না।
রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ক্ষমতার প্রভাব যেন অপরাধীদের রক্ষাকবচ হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্যের দ্বন্দ্ব এবং প্রতিপক্ষকে দমনে অপরাধী গোষ্ঠী ব্যবহারের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে হত্যাসহ গুরুতর অপরাধের মামলায় তদন্তের দুর্বলতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করা প্রয়োজন। জামিনের বিধান আইনের অংশ হলেও তা যেন অপরাধের গুরুত্ব ও আইনগত শর্ত বিবেচনা না করে প্রয়োগ না হয়।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান জোরদার, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, অস্ত্র চোরাচালানের নেটওয়ার্ক শনাক্ত এবং অপরাধীদের অর্থের উৎস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচার নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অপরাধের তথ্য দিতে আগ্রহী নাগরিক ও সাক্ষীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কেবল পুলিশের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক দায়িত্ব। রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় বন্ধ করতে হবে। মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে, কর্মস্থলে গিয়ে কিংবা নিজ বাড়িতে থেকেও যদি নিরাপত্তা অনুভব না করে, তবে উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার সুফল অর্থবহ হয়ে উঠবে না।
খুন-খারাবিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হতে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। তাই আশ্বাস নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং অপরাধের দ্রুত বিচার। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই যেন বিচারের একমাত্র মাপকাঠি হয়। নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে- এখনই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









