বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বিশ্ববাজারে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সাফল্যের অন্যতম প্রতীক। টানা পঞ্চমবারের মতো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের অবস্থান ধরে রাখা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। ২০২৫ সালে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এ দেশের শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে রয়েছে এক নির্মম বাস্তবতা। যে শ্রমিকদের ঘাম ও শ্রমে দেশের রপ্তানি আয় বাড়ছে, সেই শ্রমিকরাই মজুরির দিক থেকে বিশ্বের প্রায় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছেন। রপ্তানিতে দ্বিতীয় আর শ্রমিকের মজুরিতে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন- এই বৈপরীত্য কোনোভাবেই একটি দায়িত্বশীল অর্থনীতির জন্য গৌরবজনক হতে পারে না।
বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই অর্থে একটি পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই কঠিন। ফলে, শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি অযৌক্তিক নয়। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ৩২ হাজার থেকে ৩৭ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরির প্রস্তাবও এসেছে। এসব দাবির পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার বাস্তব প্রয়োজন। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তাঁর শ্রমের অধিকার।
সরকার নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করে সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ নিয়েছে। এখন এই বোর্ডের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় একটি যৌক্তিক ও সম্মানজনক মজুরি কাঠামো প্রণয়ন করা। শুধু মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মতামত নয়, নিরপেক্ষ গবেষণা, মূল্যস্ফীতির হার, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করা জরুরি। শ্রমিকদের বছরের পর বছর অপেক্ষায় রেখে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
অন্যদিকে, মালিকপক্ষের উদ্বেগও উপেক্ষা করা যায় না। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ অনেক কারখানার জন্য বাস্তব চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোর সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে মজুরি বাস্তবায়নের কার্যকর পরিকল্পনা করতে হবে। তবে, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার অজুহাতে শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আটকে রাখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও পণ্যের ন্যায্যমূল্য দিতে অনীহা দেখিয়ে কম দামে পণ্য সংগ্রহের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক দেশ নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা ও সমন্বয় করে। বাংলাদেশেও তিন বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিধান থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় তা যথাসময়ে কার্যকর হয় না। এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত মজুরি সমন্বয়ের একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, শ্রমিক অসন্তোষ শুধু মজুরি বৃদ্ধির দাবি নয়; এটি দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও জীবনযাত্রার সংকটের বহিঃপ্রকাশ। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হলে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। তাই নতুন মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে।
মালিক, শ্রমিক ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে এমন একটি মজুরি কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে, যাতে শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত হয় এবং শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও বজায় থাকে। রপ্তানিতে দ্বিতীয় হওয়ার গৌরব তখনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে, যখন সেই সাফল্যের সুফল শ্রমিকের ঘরেও পৌঁছাবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









