এক : বিশ্বকাপের দিন। দুই পিস! তিন পিস!! চার পিস!!! সবাই যেন খিদে লেগেছে! তর সইছে না কারো। চোখের সামনে খাবার। অথচ কেউ খেতে পারছে না। অনেকে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ জগ থেকে পানি ঢেলে খাচ্ছে। চরম উত্তেজনা চলছে। টানটান অবস্থা! চোখের সামনে টিভি। টিভির সামনে বড় একটা কেক। দশ পাউন্ডের। কেক-এর সামনে মোখলেস ভাই। তাকে টপকে কেক-এ হাত দেওয়ার সাহস কারো নেই।
খেলা চলছে টিভিতে। আর্জেন্টিনা বনাম মিশর। বরাবরের মতো আমাদের মেসের সদস্যরা দুই দলে ভাগ হয়ে গেছে। বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে ব্রাজিল। তাই ব্রাজিলের সাপোর্টাররা আজ মিশরের সাপোর্ট করছে। এই দলে আছে রোহিত, সুদেব, নবীর, সাদেক, সঞ্জীবরা। আর্জেন্টিনার সাপোর্টার হিসেবে উপস্থিত মনে টিভির সামনে বসেছে ইমন, কাওছার, নাজমুল, শাকিল, রেজা, উল্লাসরা। আমি সপ্রভ আছি মোখলেস ভাইয়ের দলে।
‘আদুভাই’ মোখলেস ভাই আছেন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মাঝামাঝি। সেজন্যই আজকের বিশাল কেকটির সামনে পাহারাদার হিসেবে তাকেই বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশাল এই কেকের নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিশ্বকেক’। মেসের সবার কাছ থেকে চাঁদা তুলে কেক খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। যে দল জিতবে সেই দলের সমর্থকরা কেক অবশ্যই খুশিমনে নিজেরা খাবে। পরাজিত দলের সমর্থকদেরও খাওয়াবে। কারো প্রতি কেউ কটাক্ষ করবে না। দুই দলের সমর্থকরা এই জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্টে রাজি হয়েছে।
দুই : সেদিনও রাজি হয়েছিলাম। নিলু আমাকে রাজি করিয়েছিল।
ব্রাজিলের খেলা ছিল। নরওয়ের সাথে।
—তুই কি আমার সাথে বাজি ধরবি? নিলু ফোনে বলেছিল।
—ধরব। কোন বিষয়ের উপর? নিতু বললে আমি সারাদিন বিজয় স্মরণীতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি।
—আজ রাতে ব্রাজিল আর নরওয়ের ফুটবল ম্যাচ। তুই নরওয়ের পক্ষে পাঁচশত টাকা বাজি ধর।
—নরওয়ে!
থমকে গেলাম। আজকের খেলায় ব্রাজিলই তো ফেভারিট।
—ধরবি কি না বল।
জেলি গলায় বলেছিল নিলু।
অগত্যা হার মেনেছিলাম। পাঁচশ টাকা বিকাশ করেছিলাম ওর নাম্বারে।
—থ্যাংকস। আসলেই তুই খুব ভালো রে।
ফোন কেটে দিয়েছিল।
সে রাতে খেলা দেখার পর আমার আর ঘুম হয়নি। পাঁচশ টাকা হারানোর শোকে নয়। ব্রাজিল নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে গিয়েছিল—সেই চিন্তায়। ভয়ে আমি নিলুকে ফোনও করিনি। টেক্সটও করিনি।
এক হাজার টাকা।
বেচারি!
পরদিন দুপুর বেলা মেসেজ এল।
ক্যাশ ইন।
এক হাজার টাকা।
একটু পরেই নিলুর ফোন।
—তোর পাঁচশ ফিরিয়ে দিলাম। লাভসহ।
—মানে?
—আরে বোকা! তোর কাছে টাকা নিয়ে আমি আমাদের মেসের নরওয়ের পক্ষে বাজি ধরেছিলাম। নরওয়ের পক্ষে এক টাকা ধরলে যদি জিতে তাহলে পাঁচ টাকা দেবে—এই ছিল শর্ত। তোর কাছ থেকে পাঁচশ আর আমার পাঁচশ এই মিলিয়ে এক হাজার টাকা বাজি ধরেছিলাম। পাঁচ হাজার পেয়েছি।
খুশিতে গদগদ হয়ে বলেছিল নিলু।
—এক হাজারে পাঁচ হাজার!
আমার ভেতরটা শুকিয়ে গিয়েছিল।
তিন : আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মুখ-চোখ শুকিয়ে গেছে। প্রথমার্ধের খেলা শেষ হয়েছে একটু আগে। দুই গোল খেয়েছে আর্জেন্টিনা।
—মনে হয় শোধ করতে পারবে না, কী বলিস সুদেব?
রোহিত জোরে জোরে বলল।
—শোধ! আরও গোল খাবে মামা। এটা যে সে দল না। এর নাম মিশর।
—খেলার এখনো অর্ধেক বাকি আছে।
প্রতিবাদ করল ইমন।
—মিশর খেলা এখনো দেখিস নাই মামু।
নাজমুল বলল।
—আরে রাখ তোর মেসি। তোদের বিশ্বকাপ আজই শেষ।
রোহিত বলল।
—তোরা কি শুধু তর্কই করবি, না কি আমাকে চা-বিস্কুট কিছু খাওয়াবি?
মাথা বাদল দিলেন মোখলেস ভাই।
সবার মনে হুঁশ ফিরল। দুই প্যাকেট টোস্ট আর এক প্যাকেট টি-ব্যাগ আনাই হয়েছে খেলার ফাঁকে ফাঁকে খাওয়ার জন্য। কাজেই চা-বিস্কুট খাওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লাম সবাই।
বিরতির পর আবার খেলা শুরু হয়েছে। আমরা সবাই আবার খেলা দেখায় বুঁদ হয়ে গেলাম।
—গো...ল!
চিৎকার করে উঠল আর্জেন্টিনার সমর্থকরা। মুহূর্তে সবাই প্রাণ্ড নাচানাচি শুরু করে দিল। মোখলেস ভাই ধমক দিয়ে সবাইকে বসিয়ে দিলেন।
—তারপরও মিশরই জিতবে!
চিৎকার করে বলল ব্রাজিলিয়ানরা।
—এখনো এক গোলে পিছিয়ে আছে মেসিরা।
নবীর গর্জন।
বলতে বলতেই ঘরের সবাই দলমত শেষে চিৎকার করে উঠল,
—গো...ল!
খেলার ফলাফল এবার সমান সমান। আর্জেন্টিনা ২, মিশর ২।
—মিশরের ঐ গোলটা বাতিল না হলে তিন গোলেই জিতত যেত মিশর।
রোহিত বলল।
—সবাই থাম।
চিৎকার করে উঠলেন মোখলেস ভাই।
চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে রুমে।
দেখতে দেখতে দ্বিতীয় গোলের দেখা পেল আর্জেন্টিনা। মুখচোখ শুকিয়ে গেল রোহিতদের।
—রেফারি তো এক নম্বরের চিটার।
রোহিত বলল।
—ব্যাটা ফিফার কাছ টাকা খেয়েছে।
সুদেব বলল।
—কে কার কাছ থেকে টাকা খেয়েছে তা সময় হলেই জানা যাবে। আপাতত আজ আমরা বিজয়ী হয়েছি। তাই আমরা পেট ভরে কেক খাব আর তোরা চেয়ে চেয়ে দেখবি।
বাঁকা হাসি হেসে বলল নাজমুল।
—খবরদার, কেউ এখন কেক খাবি না। আগে চূড়ান্ত ফয়সালা হোক। তারপর কেক খাবি।
সুদেব বলল।
ওর পেছনে সব এপ্ত ব্রাজিলিয়ানরা।
—কীসের ফয়সালা? আমরাই জিতেছি।
ইমনরাও এখন একবিন্দে।
—না। তোরা রেফারিকে পয়সা দিয়ে কিনে নিয়েছিস। এটার তদন্ত আগে হোক।
সাদেক বলল।
—কে তদন্ত করবে?
কাওছার খিকখিক করে হাসল।
—আমরা করব। ফিফা করবে।
রোহিত বলল।
—তোরা করতে থাক, আমরা কেক খেতে থাকি।
নাজমুল কেক-এর দিকে এগিয়ে গেল।
রোহিতও তাকে বাধা দিতে এগিয়ে গেল। দুজন দুজনের কলার চেপে ধরল। ধস্তাধস্তি চলছে।
কী মনে করে মোখলেস ভাই হাই তুললেন। পায়ের জড়তা কাটাতে পা দুটো লম্বা করলেন। তার পায়ে ধাক্কা লেগে রোহিত আর নাজমুল একসাথে পড়ল কেকের উপর।
অমনি ঘরের মধ্যে যেন ঘূর্ণিঝড় নেমে এল।
নাজমুল এক থাবা ভর্তি কেক নিয়ে ছুড়ে মারল রোহিতের দিকে। রোহিত মাথা সরিয়ে নিল। ক্রিমভর্তি সেই কেক গিয়ে লাগল সুদেবের মুখে। সুদেব মুখ থেকে ক্রিম নিয়ে ছুড়ে মারল ইমনের দিকে। ইমন মারল আরেকজনকে। সে আবার একথাবলা কেক নিয়ে আরেকজনের গালে মাখিয়ে দিল। গোটা ঘরে হুলস্থুল শুরু হয়ে গেল।
আমার গালেও কে যেন কেকের ক্রিম মাখিয়ে দিল। তাড়াতাড়ি ঐ রুম থেকে বের হয়ে নিজের রুমে চলে এলাম। এই রুমেই আমি আর মোখলেস ভাই একসাথে থাকি।
চুক্কি দেখি মোখলেস ভাই নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন।
যেন কিছু ঘটেইনি!
লেখক : বিশ্বাজৎ দাস


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









