দাদু তখন অনেক অসুস্থ। দিনের বেশির ভাগ সময়ই বিছানায় শুয়ে থাকতেন। একদিন চুপিচুপি রাতুলকে কাছে ডাকলেন। কাঁপা হাত রাতুলের মাথায় বুলিয়ে মৃদু হাসলেন।
— দাদুভাই, আমার যদি কিছু হয়ে যায়, আলমারির নিচের ড্রয়ারটা খুলবে। ওখানে তোমার জন্য একটা আশ্চর্য উপহার রাখা আছে।"
উপহার কী, সে কৌতূহলও হলো না রাতুলের। কথাগুলো শুনেই তার গলা ধরে এল, চোখ ভিজে উঠল। দাদুর কিছু হতে পারে—এমন কথা ভাবতেই পারছিল না সে। এই কথা দাদুর মুখে মানায়ই না।
দাদুই তো তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে গল্প শোনাতেন, বিকেলে হাত ধরে হাঁটতে নিয়ে যেতেন। কোথাও বেড়াতে গেলে নিজের জন্য না হোক, রাতুলের জন্য ঠিকই একটা ছোট্ট উপহার নিয়ে ফিরতেন। দাদুর সঙ্গে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত ছিল ছোট ছোট আনন্দে ঠাসা।
তারপর একদিন ভোরে, সবাইকে কাঁদিয়ে দাদু সত্যিই চলে গেলেন। বাড়িটা এক নিমেষে ফাঁকা হয়ে গেল। দাদুর খালি
চেয়ারটা চোখে পড়লেই বুকটা হুহু করে উঠত রাতুলের। বিকেলে ছাদে যেতে আর ইচ্ছে করত না।
রাতে গল্পের বই খুললেও মনে হতো, আজ আর কেউ গল্পটা শেষ করে দেবে না। দিন গড়াল। স্কুল, পড়াশোনা, বন্ধুদের হইচইয়ের মধ্যে রাতুল আস্তে আস্তে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে শিখল। আর সেই সঙ্গে দাদুর রেখে যাওয়া আশ্চর্য উপহারের কথাও প্রায় ভুলে গেল।
একদিন হঠাৎ মা আলমারি গোছাতে গিয়ে বললেন, "আলমারিটা একদিন পরিষ্কার করতে হবে।"
আলমারি' শব্দটা কানে যেতেই রাতুলের বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে উঠল। মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল দাদুর শেষ কথাগুলো। সে ছুটে গেল দাদুর ঘরে। আলমারির দরজা খুলে টেনে বের করল নিচের ড্রয়ারটা। ভেতরে একটা পুরোনো হাতঘড়ি আর ভাঁজ করা একটা চিঠি। কাঁপা হাতে চিঠি খুলে পড়তে শুরু করল।
দাদুভাই,
এই চিঠি যখন পড়ছ, তখন হয়তো আমি তোমার পাশে নেই। কিন্তু মনে রেখো—ভালোবাসার মানুষ সত্যিই কখনো হারিয়ে যায় না। তারা থেকে যায় স্মৃতিতে, গল্পে, ভালোবাসায়।
এবার ঘড়ির কথা শোনো।
এ কোনো সাধারণ ঘড়ি নয়। ঘণ্টা, মিনিট আর সেকেন্ডের কাঁটার পাশে একটা তারিখের ঘরও আছে এতে। তারিখ বসিয়ে দিলে, সেই দিনের পাঁচ মিনিটের জন্য ফিরে যাওয়া যাবে।
শর্ত একটাই—কখনো ভবিষ্যতের তারিখ বসাবে না। বসালেই ঘড়ি তার সব জাদু হারাবে চিরতরে।
আর মনে রেখো, মাসে মাত্র একবার, তাও পাঁচ মিনিটের জন্যই এটা কাজ করবে।
ভালো থেকো, দাদুভাই।
দাদু
চিঠি ভাঁজ করে রাখল রাতুল, ঘড়িটা তুলে নিল হাতে। সোনালি চেইনে জায়গায় জায়গায় মরিচা, কাচে কয়েকটা আঁচড়—তবু রূপালি কাঁটাগুলো টিকটিক করে ঘুরেই চলেছে। তারিখের ছোট্ট ঘরে জ্বলছে লাল আলো। আজকের তারিখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
দুটো চাবি—একটা সময়ের, একটা তারিখের। হাতে নিতেই বুক ধুকপুক করে উঠল রাতুলের। সে বারবার ঘড়িটার দিকে তাকাল।
সত্যিই সম্ভব এসব?
দাদু কখনো মিথ্যা বলতেন না। তবু নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে সিদ্ধান্ত নিল—আজই পরীক্ষা করবে।
কিন্তু কোন দিনে?
ভাবতে ভাবতেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল একচিলতে। কোনো বিশেষ দিনের কথা মনে পড়ে গেছে যেন। ধীরে ধীরে ঘড়ি পরল হাতে, তারিখের চাবি ঘুরিয়ে থামাল একটা তারিখে।
সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ ঘুরতে শুরু করল। দেয়াল, জানালা, আলমারি—সব ঝাপসা হয়ে মিশে গেল একাকার। ঘড়ির কাঁটাগুলো ছুটল উল্টো দিকে। কানে ঝনঝন শব্দ, বুকে ধড়ফড়, মাথা ভারী হয়ে এল। তারপর সব অন্ধকার।
চোখ খুলতেই রাতুল দেখল, সে দাঁড়িয়ে আছে তাদের বাড়ির ছাদে। বিকেলের নরম রোদ চারদিকে। হালকা বাতাসে দুলছে দাদুর পাঞ্জাবি।
সামনে দাদু, হাসিমুখে একটা বড় প্যাকেট তুলে দিলেন তার হাতে। কৌতূহলে প্যাকেট খুলতেই চোখ ঝলমল করে উঠল রাতুলের। ভেতরে সারি সারি নতুন গল্পের বই।
তখনই মনে পড়ল—এ তো সেই বিকেল! তার জন্মদিনের বিকেল, যেদিন দাদু এই বইগুলো দিয়েছিলেন। খুশিতে ছুটে গিয়ে দাদুকে জড়িয়ে ধরল সে।
আর ঠিক তখনই বর্তমানের রাতুল থমকে গেল একটা জিনিস দেখে। দাদুর ঠোঁটে হাসি, কিন্তু দু'চোখ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ছে জল। আশ্চর্য! সেদিন তো এই কান্না চোখেই পড়েনি তার।
বুকটা কেঁপে উঠল রাতুলের। আজ বুঝল—দাদু শুধু গল্পের বই দেননি সেদিন, হয়তো সেই মুহূর্তেই নীরবে বিদায়ও জানিয়ে রেখেছিলেন। সেই চোখের জল দেখে রাতুলের মনে হলো, ভালোবাসা বোধহয় সময়েরও আগে অনেক কিছু জেনে ফেলে।
ঠিক তখনই পাঁচ মিনিট পূর্ণ হওয়ার সংকেত দিল ঘড়ি। দ্রুত হাতে আজকের তারিখে ঘুরিয়ে দিল রাতুল। আবার ঘুরতে লাগল চারপাশ। কাঁটাগুলো ছুটল বিদ্যুতের গতিতে সামনের দিকে। কয়েক মুহূর্ত পর সব শান্ত।
চোখ খুলে রাতুল দেখল, সে আবার সেই ঘরেই দাঁড়িয়ে। সবকিছু আগের মতোই—শুধু তার বুকের ভেতরটা আর আগের মতো নেই।
ঘড়িটার ওপর আলতো করে একবার হাত বুলিয়ে দিল সে। তারপর খুলে আবার রেখে দিল দাদুর আলমারির সেই ড্রয়ারে।
কিছু উপহার ব্যবহার করার জন্য নয়, সারাজীবন বুকে আগলে রাখার জন্য।
আর কিছু রহস্য... রহস্যই থাকুক।
সব রহস্যের উত্তর জেনে ফেললে, জাদুর সৌন্দর্যটুকুও হারিয়ে যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









