২০১২ সালে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গাজা হয়তো ২০২০ সালের মধ্যে আর ‘বাসযোগ্য’ থাকবে না। তখন কথাটির অর্থ ছিল পানি, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল, রাস্তা, ঘরবাড়ি—একটি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া।
কিন্তু বাসযোগ্যতা কি শুধু এগুলো দিয়ে তৈরি?
একটি শহর বাসযোগ্য হয় মানুষের হাসিতে, শিশুর খেলায়, গান গাওয়ার শব্দে, ফুটবল মাঠে, বইয়ের পাতায়, বিয়ের অনুষ্ঠানে, সমুদ্রের ধারে বসে থাকা দুজন মানুষের নীরবতায়। একটি শহর বেঁচে থাকে তার স্মৃতিতে। তার মৃতদের নামের মধ্যে। তার ভবিষ্যতের স্বপ্নে।
গাজায় যুদ্ধ সেই জীবনটিকেও ধ্বংস করতে চেয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে মোহাম্মদ আল-ওয়াহিদি নিহত হন। তিনি গাজায় মানুষের জন্য বিশ্বকাপের খেলা দেখার আয়োজন করতেন। যে মানুষটি যুদ্ধের মধ্যে মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য ফুটবলের কাছে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন, তিনি মিসর-আর্জেন্টিনা ম্যাচ দেখতে যাওয়ার পথে নিহত হন বলে জানা যায়। একই যুদ্ধে আট ও দশ বছরের দুই ভাই ফারি ও হামজা আল-দেরিও নিহত হয়—ফুটবল দেখে বাড়ি ফেরার পথে।
যুদ্ধের হিসাব কখনো কখনো শুধু সংখ্যা হয়ে যায়। কিন্তু একটি শিশুর হাতে ফুটবল থাকলে সংখ্যাটি আর সংখ্যা থাকে না।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফিলিস্তিনি অলিম্পিক কমিটি জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদ নিহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে ২৬৫টি ক্রীড়া স্থাপনা। মাঠগুলো শুধু ইট-কাঠের জায়গা ছিল না। সেখানে শিশুরা দৌড়াত। তরুণেরা খেলত। মানুষ যুদ্ধের কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও নিজেদের অন্য একটি পৃথিবীতে নিয়ে যেতে পারত।
সেই পৃথিবীটিই ছিল আক্রমণের লক্ষ্যগুলোর একটি।
শিল্পীদেরও রেহাই মেলেনি। নিহত হয়েছেন চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ সামি কারিকা, হেবা জাকুত, আমনা আল-সালমি, চলচ্চিত্র নির্মাতা ইসমাইল আবু হাতাব, চিত্রশিল্পী দোরঘাম কুরাইকি ও দিনা খালেদ জারাব। কবি ও লেখকদের মধ্যে নিহত হয়েছেন রেফাত আল-আরির, হিবা আবু নাদা, নূর হাজ্জাজ, ইনাস আল-সাকা ও রাশাদ আবু সাখিলা। রেফাত আল-আরিরের নাম এখন কেবল একজন কবির নাম নয়। যুদ্ধের মধ্যে লিখতে থাকা একটি মানুষের নাম। তাঁর কবিতা ছিল ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর চেষ্টা। মৃত্যু সেই ভবিষ্যৎকে থামিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কবিতাকে নয়।
গাজার ৮৪ বছর বয়সী সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক এলহাম ফারাহও নিহত হন। গিটারবাদক শাবান আল-দালু ও ইউসুফ দাওয়াস, পারকাশনবাদক আকরাম আল-আজল, র্যাপার সারি ইব্রাহিম—তাদের জীবনও থেমে গেছে। ১৪ বছরের বেহালা শিক্ষার্থী লুবনা আলিয়ান, কিশোর গায়ক হাসান আইয়াদ—তাঁদের কণ্ঠও আর শোনা যায় না।
যুদ্ধ কখনো শুধু মানুষকে হত্যা করে না। সে মানুষের সম্ভাবনাকেও হত্যা করে।
পদার্থবিদ সুফিয়ান তাইয়েহ, ইতিহাসবিদ নাসের ইসমাইল আল-ইয়াফাওয়ি, ভিজ্যুয়াল আর্টসের শিক্ষক নেসমা আবু শাইরা, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক সিরিন আল-আত্তার—গাজার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছেন। গাজার প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ইউনিসেফের হিসাবে, ৯৭ শতাংশের বেশি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। নিহত হয়েছেন শত শত শিক্ষক।
একটি স্কুল ধ্বংস হলে শুধু একটি ভবন হারায় না। হারায় একটি ব্ল্যাকবোর্ড, কয়েকটি বেঞ্চ, একটি লাইব্রেরি, শিক্ষকের কণ্ঠ, শিশুর প্রশ্ন—আর একটি ভবিষ্যৎ। সংস্কৃতির স্মৃতিও একইভাবে আঘাত পেয়েছে। গাজার কেন্দ্রীয় আর্কাইভ, গাজা মিউনিসিপ্যাল পাবলিক লাইব্রেরি, আল-ওমারি মসজিদের গ্রন্থাগার ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। আল-কারারা জাদুঘরে ছিল প্রায় তিন হাজার প্রত্নবস্তু—কিছু যার ইতিহাস কানানীয় যুগ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। প্রায় আটশ বছরের পুরোনো পাশা প্রাসাদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে সমকালীন শিল্পের নানা স্থান, রাশাদ আল-শাওয়া সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
যে জাতির ঘর ভেঙে দেওয়া হয়, তার স্মৃতিও যদি মুছে ফেলা যায়, তবে তাকে নিজের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা সহজ হয়। কিন্তু স্মৃতি কোনো ভবনের ভেতর বন্দী থাকে না। গাজার মানুষ সেটা জানে।

আল-বাকা ক্যাফে নেই। থাই রেস্তোরাঁ নেই। আল-মাথাফ হোটেলের বাগান নেই। ওল্ড টাউন অ্যান্টিক স্টোর নেই। সামারিটান হাম্মাম নেই। যে সমুদ্র একসময় মানুষের বিশ্রামের জায়গা ছিল, সেই সমুদ্রতীরও এখন অনেকের কাছে মৃত্যুর স্মৃতি বহন করে। খান ইউনিসের শস্যবাজার, আল-কায়সারিয়্যা বাজার—যেখানে মানুষ দরদাম করত, কেনাকাটা করত, পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হতো—সেগুলোরও অনেকটাই ধ্বংস হয়েছে। বেকারি, গ্রিনহাউস, বাগানও রক্ষা পায়নি।
যুদ্ধের মধ্যে মানুষের ছোট ছোট জিনিসও যেন অপরাধ হয়ে উঠেছিল—নারীদের পোশাকের দোকানের পুতুল, সাইকেল, খেলনা, মিষ্টি, শিশুদের খেলার মাঠ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত বা লুট হয়েছে।
কেন? কারণ এগুলো জীবনের চিহ্ন। আর জীবনের চিহ্ন যতদিন থাকে, ততদিন ধ্বংস সম্পূর্ণ হয় না। তাই গাজার মানুষ আবার গান গায়। ছবি আঁকে। নাটক করে। ফুটবল খেলে। বই বাঁচিয়ে রাখে। ধ্বংস হওয়া উপাসনালয় মেরামত করে। শিশুদের পড়ায়। কবিতা লেখে। চলচ্চিত্র বানায়। কেউ দবকা নাচে, কেউ ব্রেকড্যান্স করে। এগুলো যুদ্ধের বাইরে কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলোই জীবনের দাবি।
২০২৬ সালের এপ্রিলে দেইর আল-বালাহে প্রায় ৩০০ যুগল একসঙ্গে বিয়ে করেন। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, অনিশ্চয়তা, শোক—তার মধ্যেও মানুষ বিয়ে করে। কারণ ভবিষ্যৎকে কেবল যুদ্ধের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। একটি শিশুর জন্ম, একটি বিয়ের আয়োজন, একটি গান, একটি ফুটবল ম্যাচ—সবই তখন ভবিষ্যতের দিকে ছোট ছোট পদক্ষেপ। গাজাকে ‘বাসযোগ্য’ রাখা যাবে কি না—এই প্রশ্নের একটি উত্তর পানি, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল ও ঘরবাড়ির পুনর্গঠনে আছে। কিন্তু আরেকটি উত্তর আছে মানুষের ভেতরে।
একটি মানুষ যখন ধ্বংসস্তূপ থেকে তার বাবার বইটি তুলে নেয়, তখন সে শুধু একটি বই বাঁচায় না। একটি ইতিহাস বাঁচায়। একজন তরুণ যখন ভাঙা মাঠে ফুটবল নিয়ে দাঁড়ায়, সে শুধু খেলতে চায় না। সে জানিয়ে দেয়, মাঠটি এখনও তার। একজন কবি যখন যুদ্ধের মধ্যেও কবিতা লেখেন, তিনি শুধু শব্দ সাজান না। তিনি ভবিষ্যতের জন্য একটি দরজা খোলা রাখেন। এই কারণেই গাজাকে ধ্বংস করা আর গাজার জীবনকে শেষ করে দেওয়া এক কথা নয়।
ঘর ভেঙে ফেলা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করা যায়। গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেওয়া যায়। বাজার মুছে ফেলা যায়। শিল্পী, শিক্ষক, কবি, ক্রীড়াবিদকে হত্যা করা যায়। কিন্তু মানুষের মনে যে শহরটি থাকে, তাকে ধ্বংস করার জন্য আরও কিছু দরকার। স্মৃতি যতদিন আছে, গাজা ততদিন আছে।
আর যতদিন মানুষ ভালোবাসে, গান গায়, সন্তান জন্ম দেয়, গল্প বলে এবং আগামী দিনের কথা ভাবে—ততদিন ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও একটি শহর বেঁচে থাকে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









