ইসরাইলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানে এক পাইলট অন্য পাইলটকে ছুরিকাঘাত করে বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে দাবি করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ইসরাইলের তেল আবিবে যাওয়ার পথে ঘটনাটি ঘটে বলে তিনি জানান। পরে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। বিমানে থাকা সব যাত্রী নিরাপদে আছেন বলে জানিয়েছে ফ্লাইদুবাই।
বুধবার এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, বিমানের যাত্রীরা ‘বড় ধরনের দুর্ঘটনা’ ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তিনি বলেন, “দেশের (ইসরাইলের) কাছে পৌঁছানোর সময় একজন পাইলট অন্য পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন এবং সবাইকে নিয়ে বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।”
ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর বিমানটি জরুরি সংকেত পাঠায়। এরপর বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। সব যাত্রী নিরাপদে রয়েছেন এবং তাদের হিসাব নেওয়া হয়েছে।
তাবুক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, পাইলট ও সহকারী পাইলট দুজনকেই আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ফ্লাইদুবাইয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে যাত্রীদের জন্য বিকল্প বিমানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি ছিল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য বলছে, গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) ভোর ৫টা ২১ মিনিটে বিমানটি প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় ছিল। এক মিনিটের মধ্যে সেটি নেমে আসে ১৭ হাজার ফুটের নিচে। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যে বিমানটি প্রায় ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়।
ইসরাইল জানিয়েছে, সৌদি আরব থেকে ইসরাইলি যাত্রীদের নিরাপদে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
‘সস্তা রাজনীতি’র অভিযোগ
বিমানটির ঘটনা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ‘সস্তা রাজনীতি’র অভিযোগ তুলেছেন ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তার একটি নিরাপত্তাবিষয়ক বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকের সঙ্গে বিমানটির ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন লাপিদ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এমন কোনো ঘটনার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি।
তার ভাষায়, “এ ধরনের কিছুই বলা হয়নি—এমনকি সামান্য ইঙ্গিতও ছিল না।”
লাপিদের অভিযোগ, সরকারপন্থী কিছু ব্যক্তি ঘটনাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তার বিষয়কে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ।
বিমানে আতঙ্ক
বিমানের কয়েকজন যাত্রী ইসরাইলের চ্যানেল ১২-কে ফোনে জানান, তারা বিমানের সামনের দিক থেকে চিৎকারের শব্দ শুনেছিলেন। পাইলটদের মধ্যে ধস্তাধস্তির শব্দও শুনতে পান তারা। একই সময়ে বিমানটি হঠাৎ তীব্রভাবে নিচে নেমে যায়।
যাত্রী মিরিয়াম শিরা ওহায়নকে উদ্ধৃত করে এএফপি জানায়, জর্ডানের আকাশসীমার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় বিমানটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
তার দাবি, এক পাইলট অন্য পাইলটকে ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্লাইট থেকে দুটি জরুরি সংকেত পাঠানো হয়েছিল। প্রথমটি ছিল সাধারণ জরুরি সংকেত। কয়েক মিনিট পর পাঠানো দ্বিতীয় সংকেতটি বিমানে কোনো ধরনের বেআইনি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় মাত্র ৩০ সেকেন্ডে বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়।
পরে বুধবার ফ্লাইটরাডার২৪-এ দুবাই থেকে তেল আবিবগামী আরেকটি ফ্লাইদুবাই বিমানকে কিছু সময়ের জন্য দুবাইয়ের দিকে ফিরে যেতে দেখা যায়। তবে পরে সেটিকে নির্ধারিত পথেই ইসরায়েলের দিকে যেতে দেখা যায়।
ইসরাইল-আমিরাতের স্বাভাবিক সম্পর্ক
ফ্লাইদুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা এমিরেটসের সহযোগী কম খরচের বিমান সংস্থা। ২০২০ সালে ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর ইসরাইলি পর্যটকদের কাছে দুবাই একটি জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
ফ্লাইদুবাইয়ের পুরো বহরই বোয়িং ৭৩৭ সিরিজের বিভিন্ন মডেলের বিমান নিয়ে গঠিত। সংস্থাটির প্রায় ১০০টি বিমান রয়েছে, যার মধ্যে ৬৯টি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮।
বিমানটি দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা করেছিল। আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনের দিক থেকে এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর।
এর আগে ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে চলাচলকারী একটি ফ্লাইদুবাই বিমানকে জরুরি পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে অবতরণ করতে হয়েছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চিকিৎসাজনিত কারণে ওই বিমানটি রিয়াদে অবতরণ করে বলে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল।
উড়োজাহাজ চলাচলে ‘ভেতরের হুমকি’
ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ফিলিপ বাউম মনে করেন, ঘটনাটি উড়োজাহাজের ভেতর থেকে আসা নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে।
বিমানের নিরাপত্তা, ছিনতাই ও যাত্রী নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান গ্রিন লাইট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাউম আল জাজিরাকে বলেন, এটি সন্ত্রাসী হামলা, পাইলটদের মধ্যে তীব্র বিরোধ, নাকি অন্য কোনো কারণ—তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
তার মতে, যেই কারণেই ঘটনাটি ঘটে থাকুক, বাণিজ্যিক বিমানের নিরাপত্তায় ‘ভেতরের হুমকি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিমানের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যক্তিদের মানসিক ও আচরণগত পরিস্থিতি এবং তারা কোনো ঝুঁকি তৈরি করছেন কি না, তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









