ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ হামলা চালানো হতে পারে বলে গতকাল বুধবার জানিয়েছে একটি সূত্র। এমন পরিস্থিতিতে পাল্টা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। যেকোনো আগ্রাসন প্রতিরোধে ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুত’ বলে ঘোষণা দিয়েছে তারা।
এমন উত্তেজনার মধ্যে ইরানে বিক্ষোভের সময় সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে আড়াই হাজার ছাড়িয়েছে। বিক্ষোভের মাত্রা বেশ কমে আসার পর এবার গ্রেপ্তার করা বিক্ষোভকারীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে তেহরান। বিচার শেষে গতকাল এরফান সোলতানি নামের একজন তরুণ বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা থাকলেও এ বিষয়ে আর কিছু জানা যায়নি।
এই মৃত্যুদণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়, তাহলে ‘খুব শক্তিশালী পদক্ষেপ’ নেবেন তিনি। এ নিয়ে গতকাল রয়টার্সকে ইউরোপের সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলা চালাবে বলেই মনে হচ্ছে তাঁদের। তাঁদের একজন এ-ও বলেছেন, এ হামলা ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যদি আগ্রাসনের পথে হাঁটে, তাহলে তা প্রতিরোধ করতে ইরানের সামরিক বাহিনী ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুত’ আছে বলে জানিয়েছেন দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কর্মকর্তা সরদার মৌসুভি। আর ওয়াশিংটনের হুমকির মুখে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ‘পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বালিয়ে দেবে’ তেহরান।
অন্যদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো সময় হামলা চালাতে পারে এমন শঙ্কায় উচ্চসতর্কতা অবলম্বন করছে দখলদার ইসরায়েল। এই হামলার পর ইরান পাল্টা হামলা চালাতে পারে এমনটি বিবেচনায় রেখে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রেখেছে তারা।
বার্তাসংস্থা টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, ইসরায়েলি গোয়েন্দারা এখন বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র কি হামলা চালাবে এই জায়গা থেকে সরে এসে তারা অপেক্ষা করছেন কখন ইরানে হামলা হবে। অর্থাৎ তারা মনে করেছেন যে কোনো সময় ইরানে হামলা চালাবে মার্কিন যুদ্ধবিমান।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের বিশ্বাস যে কোনো হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবহিত করবে। কারণ ইরানের পাল্টা হামলা ঠেকানোর জন্য তাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।
এদিকে যে বিক্ষোভের জেরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই নতুন সংকট, তা বেশ কমে এসেছে। ইরান থেকে সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার সংবাদদাতা জানিয়েছেন, গত সোমবার থেকে খুবই সামান্য পরিসরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। সরকারপন্থী সমাবেশ বেড়েছে। এ ছাড়া গতকাল তেহরানে বিক্ষোভে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজায় অংশ নিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।
অন্যদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে ফোনকলে তিনি এ আহ্বান জানান। আর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেছেন, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে বেইজিং।
ইরানে মার্কিন হামলা হলে তা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের আন্তর্জাতিক কমিটির প্রধান লিওনিদ সলুৎস্কি। তিনি বলেছেন, হোয়াইট হাউস যদি ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের সিদ্ধান্ত নেয়, তা হবে বড় ভুল। আর ট্রাম্পের হুমকির পর তেহরানের সঙ্গে মস্কো ব্যবসা চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ।
চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা মার্ক কিমিট মনে করেন, ট্রাম্প ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ করবেন। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে ট্রাম্পকে খুবই দৃঢ়সংকল্প বলে মনে হচ্ছে। তবে তিনি হয়তো স্থল হামলার কথা ভাবছেন না। যতটা মনে হয়, ইরানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করতে পারেন তিনি; ২০২০ সালে ঠিক যেভাবে হামলা চালিয়ে ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করা হয়েছিল।



সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









